দ্বৈত করের খড়গ
বিপর্যস্ত হবে আবাসন খাত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রস্তাবিত বাজেটে আবাসন খাতে নীতি-সহায়তার বদলে নতুন করে করের বোঝা চাপানো হয়েছে। যৌথ অংশীদারত্বের ভিত্তিতে নির্মিত ভবনে জমির মালিকের প্রাপ্ত অংশের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। আগে থেকেই সাইনিং মানির ওপর একই হারে কর বিদ্যমান থাকায় একে ‘দ্বৈত কর’ বলছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে ফ্ল্যাটের দাম ও বাসাভাড়া বাড়বে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে এমন সিদ্ধান্ত শুধু নাগরিকদের জীবনযাত্রাই দুর্বিষহ করবে না, বরং ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানে জড়িত এই বৃহৎ খাতটিকে চরম বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেবে। তাই এই দ্বৈত কর প্রত্যাহারের জোর দাবি জানিয়েছে রিহ্যাব ও নগর পরিকল্পনাবিদরা। এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান যুগান্তরকে বলেন, খাদ্য, বস্ত্রের পর আবাসন মানুষের মৌলিক অধিকার। এ খাতে সরকার অতিরিক্ত করারোপ নীতি থেকে সরে না এলে আবাসন মানুষের কাছে আরও দুষ্প্রাপ্য হয়ে যাবে। তিনি বলেন, মানুষের আয়ের ৩০ শতাংশ আবাসন বাবদ খরচ হওয়ার কথা থাকলেও ঢাকার বাস্তবতায় তা হচ্ছে ৪০ শতাংশের বেশি। প্রস্তাবিত বাজেটে আবাসন খাতে করারোপ যদি আরও বাড়ানো হয় একদিকে ফ্ল্যাটের দাম বাড়বে, অন্যদিকে বাসাভাড়াও বাড়বে। সরকারকে এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নইলে মানুষের জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে পড়বে।
প্রস্তাবিত বাজেটে আবাসন খাতের নীতি-সহায়তা বাড়ানো এবং দ্বৈত করারোপ বাতিলের দাবিতে গত ১৫ জুন সংবাদ সম্মেলন করে সরকারের কাছে দাবি জানানো হয়েছে। আবাসন খাতসংশ্লিষ্টদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) রাজধানীর সিরডাপে এ সংবাদ সম্মেলন করে। এছাড়া রিহ্যাবের পক্ষ থেকে মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী এবং গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রীকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
রিহ্যাবের চিঠিতে বলা হয়েছে, আবাসন খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। এ খাত সরাসরি ও পরোক্ষভাবে ২৫০টির বেশি শিল্প খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। জিডিপিতে এ খাত ও সংশ্লিষ্ট শিল্পের অবদান ১২ শতাংশের বেশি। এছাড়া প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এবং ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি রেমিট্যান্স প্রবাহের সঙ্গে এ খাত জড়িত। অতিরিক্ত করারোপের সিদ্ধান্ত থেকে সরকার সরে না এলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে, দেশের সম্ভাবনাময় এই খাতটি।
রিহ্যাবের মতে, নির্মাণসামগ্রীর মূল্য ১০ থেকে ১২ শতাংশ বৃদ্ধি, উচ্চ রেজিস্ট্রেশন ব্যয় এবং বিক্রি প্রায় ৬০ শতাংশ কমে যাওয়ার কারণে আবাসন খাত বর্তমানে সংকটের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে জমির মালিকদের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের ওপর ১৫ শতাংশ মূলধনি মুনাফা কর আরোপ করা হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। সংগঠনটি দাবি করেছে, যৌথ উন্নয়ন চুক্তিতে জমির মালিক জমি বিক্রি করেন না এবং তাৎক্ষণিক কোনো নগদ আয়ও পান না। তিনি ভবিষ্যতে কিছু ফ্ল্যাট পাওয়ার অধিকার অর্জন করেন মাত্র। তাই ভবিষ্যতে প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের সম্ভাব্য মূল্যের ওপর কর আরোপ বাস্তবসম্মত নয়। এতে প্রকৃত আয় অর্জনের আগেই করের বোঝা বহন করতে হবে, যা করনীতির মৌলিক নীতির সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।
রিহ্যাব আরও জানিয়েছে, প্রস্তাবিত কর প্রত্যাহারের পাশাপাশি আবাসন খাতের চলমান সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ১০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনেরও দাবি জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে ঢাকা সিটি ল্যান্ড ওনার অ্যাসোসিয়েশনের সমন্বয়ক তানভীরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বিধি আরোপ করে সরকার রাজধানীর ভবনের উচ্চতা কমিয়ে দিয়েছে। এরপর আবার ভবন মালিকদের ওপর করারোপ করার সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক। সরকারকে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানাব। নইলে মালিকরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আবাসন ব্যবসায়ী ও ভাড়াটিয়ারাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সব মিলিয়ে এটা দেশের আবাসন খাতের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল বলেন, আবাসন খাত দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং মৌলিক অধিকার বাসস্থান নিশ্চিতে কাজ করছে। এ খাতের সঙ্গে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ও রুটি-রুজি জড়িত। সরকারের কোনো সিদ্ধান্তে এ খাত যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। তিনি বলেন, সরকারকে রিহ্যাব সামগ্রিক বিষয় অবহিত করেছে। সরকার বিষয়গুলো বিবেচনা করলে আবাসন খাত বাঁচবে, ফ্ল্যাটের সহনীয় দাম থাকবে। বাসাভাড়াও বাড়বে না। আবাসন খাত ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

