প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর
তিস্তা নিয়ে সুখবরের আশায় উত্তরের মানুষ
মাহবুব রহমান, রংপুর
প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
উত্তরের রংপুর বিভাগের ৮ জেলার মানুষের সঙ্গে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশের পর কোনো সরকারের আমলে তা বাস্তবায়ন হয়নি। বিগত সরকারের আমল থেকে তিস্তা নিয়ে প্রতিশ্রুতি আর আন্তর্জাতিক টানাপোড়েন চলছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে নানা ফোরামে আন্দোলন চলমান। এরই মাঝে সোমবার চীন সফরে গেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাই এবার সরকারপ্রধানের চীন সফর নিয়ে আশায় বুক বেঁধেছে উত্তরের মানুষ।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ‘চায়না পাওয়ার প্রাইভেট লিমিটেড’-এর সঙ্গে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে চুক্তি নবায়ন করলেও কাজের কোনো অগ্রগতি হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠক হবে। ওই বৈঠকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনার আভাস পাওয়া গেছে।
সরকার ৭ জুন তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করেছে। ৯ সদস্যের কমিটির আহ্বায়ক ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং-এর নির্বাহী পরিচালক আমিরুল ইসলাম। কমিটির প্রথম সভায় ৬টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে আশায় বুক বেঁধেছেন উত্তরের তিস্তাপারের মানুষ।
বিগত সরকারের আমলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে চীনের বেসরকারি সংস্থা ‘পাওয়ার চায়না প্রাইভেট লিমিটেড’ আগ্রহ দেখায়। ২০১৬ সালে ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এমওইউ (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যাডিং) বা পাস্পরিক সমঝোতা দলিল স্বাক্ষরও হয়। এরপর দুই বছর স্টাডি করার পর ‘চায়না পাওয়ার প্রাইভেট লিমিটেড’ ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকারকে একটি প্রাথমিক আংশিক ধারণাপত্র দেয়। সেখানে কোনো পূর্ণাঙ্গ স্টাডি ছিল না। এতে ব্যয় ধরা হয় তৎকালীন ডলারের মূল্যমান অনুসারে বাংলাদেশি টাকা ৮ হাজার কোটি ২৪০ টাকা, যা বর্তমান ডলারের মূল্যমানে ১০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। শতকরা ৩ ভাগ সুদের (হার্ড ঋণ) বিপরীতে ওই ঋণের টাকায় উচ্চাভিলাষী এই প্রকল্প নিয়ে সেসময় সরকারের কারিগরি টিম আপত্তি জানায় এবং আন্তর্জাতিক কারণে এ নিয়ে সেসময় কোনো অগ্রগতি হয়নি। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার এ চুক্তি ‘পাওয়ার চায়না প্রাইভেট লিমিটেড’-এর সঙ্গে নবায়ন করে। এর বেশি কোনো অগ্রগতি হয়নি। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন সম্প্রতি অবসরে যাওয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত পরিচালক মাহবুবুর রহমান। পাওয়ার চায়না প্রাইভেট লিমিটেডের প্রকল্পের আওয়তায় আংশিক স্টাডি রিপোর্টে তিস্তার দুই পারে সড়ক নির্মাণ, স্মার্ট সিটি ও অ্যাগ্রিকালচার ফিল্ড, ড্রেজিং, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জমি উদ্ধারসহ নানা বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। এটি নিশ্চিত করেছেন কারিগরি কমিটির আহ্বায়ক আমিরুল ইসলাম।
বাংলাদেশের কারিগরি টিম তিস্তার দুই পারে সড়ক নির্মাণ, স্মার্ট সিটির বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিল। কারণ, বাংলাদেশের যেখানে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহর এখনো স্মার্ট সিটি গড়ে ওঠেনি, তিস্তাপারের গ্রামীণ অবকাঠামো বিদ্যমান রয়েছে; সেখানে স্মার্ট সিটি গড়ে তোলা ও নদীর দুই পারে সড়ক নির্মাণ উচ্চাভিলাষী প্রকল্প মনে করে শুধু তিস্তার তলদেশ খনন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ভাটিতে দ্বিতীয় বাঁধ নির্মাণ করে জলের রিজার্ভ ধরে রাখা এবং তিস্তার একদিকে সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছিল। একই সঙ্গে বিদেশি উচ্চঋণে নয়, দেশীয় টাকায় এই প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
কমিটির সভায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে এর তীরবর্তী অঞ্চলে প্রতিবছর খরা, বন্যা ও ভাঙনে যে ফসল হানি হচ্ছে, আবাদি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে, বিভিন্ন অবকাঠামো ধ্বংস হচ্ছে, জীবন-জীবিকার কারণে স্থানীয়রা দেশান্তরী হচ্ছে, মানুষ ফসলি জমি হারিয়ে কর্মহীন হচ্ছে, জীববৈচিত্র্যে বিরূপ প্রভাব পড়ছে-এসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে এসব সংকট থেকে উত্তরের ৮ জেলার মানুষ মুক্তি পাবে।
সরকারের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, উচ্চঋণের টাকায় উচ্চাভিলাষী প্রকল্প না নিয়ে দেশীয় বাস্তবতায় দেশের অর্থে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়টিও সরকারের পক্ষ থেকে আলোচিত হচ্ছে।
