পানিতে ডুবে বছরে ১৪ হাজার শিশুর মৃত্যু
সাঁতার হোক ‘সপ্তম টিকা’
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নরসিংদীর রায়পুরায় বৃহস্পতিবার দুপুরে খালে পড়ে আয়েশা আক্তার, তাবিয়া আক্তার, জান্নাত ও সুমাইয়া নামের চার শিশুর মৃত্যু হয়। এই শোক না কাটতেই শুক্রবার একই উপজেলায় জান্নাতি ও নিপা আক্তার নামের আরও দুই শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। বৃষ্টি, বন্যা কিংবা অসতর্কতার কারণে পুকুর-জলাশয়ে ডুবে প্রতিদিন অর্ধশতাধিক মানুষের মৃত্যু হচ্ছে; যার ৭৫ শতাংশই শিশু। এমন প্রাণহানি প্রতিরোধে সাঁতার শেখানোর মতো কার্যকর প্রকল্প ‘আইসিবিসি’ প্রথম পর্ব শেষে ৭ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, অরক্ষিত জলাশয়ে বেড়া দেওয়া এবং সাঁতার শিক্ষাকে ‘সপ্তম টিকা’ হিসাবে বাধ্যতামূলক করা গেলে বছরে হাজারো অমূল্য প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।
ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে বাংলাদেশের তথ্যমতে, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৫১ জনের বেশি মানুষ পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে। বছরে এই সংখ্যা ১৮ হাজার ৬১৫ জন। এর মধ্যে ৭৫ শতাংশ বা প্রায় ১৪ হাজারই শিশু। অতিবৃষ্টি বা বন্যার পর অন্তত পাঁচ সপ্তাহ পর্যন্ত এই মৃত্যুহার সর্বোচ্চ থাকে। এদিকে গত কয়েকদিনে সারা দেশে পানিতে ডুবে অন্তত ৫৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু রোধে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি ইন্টিগ্রেটেড কমিউনিটি বেজড সেন্টার ফর চাইল্ড কেয়ার, প্রটেকশন অ্যান্ড সুইম-সেফ ফ্যাসিলিটিজ (আইসিবিসি) নামের একটি প্রকল্প পরিচালনা করে। ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রথম পর্যায়ে ১৬ জেলার ৪৫ উপজেলায় ৬ থেকে ১০ বছর বয়সি শিশুদের সাঁতার শেখানো হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব এলাকায় এই প্রকল্প চলেছে সেখানে শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। কিন্তু গত বছরের ডিসেম্বরে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রকল্পটি আর চালু হয়নি।
এ বিষয়ে শিশু একাডেমির প্রোগ্রাম অফিসার শামীমা আরেফিন যুগান্তরকে জানান, প্রথম পর্বের সফলতা পাওয়ার পর দ্বিতীয় পর্ব শুরুর জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) জমা দেওয়া হয়েছে। এটি পাশ হলে দ্রুত কাজ শুরু হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশের (সিআইপিআরবি) গবেষণায় দেখা যায়, পানিতে ডুবে মৃত্যুর হারে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। সিআইপিআরবির কর্মকর্তা নাহিদ আখতার যুগান্তরকে বলেন, পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের সার্বক্ষণিক নজরে রাখা এবং ৬ থেকে ১০ বছর বয়সিদের সাঁতার শেখানোর মাধ্যমে এই মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব। শিশুদের বাঁচাতে সাঁতারকে ‘সপ্তম টিকা’ হিসাবে বিবেচনা করতে হবে। এছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় পাশ করার ক্ষেত্রে এটি বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী গ্রামীণ জীবনে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সময়টি শিশুদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। অভিভাবকরা এ সময় কাজে ব্যস্ত থাকায় শিশুরা অরক্ষিত থাকে এবং বাড়ির পাশের জলাশয়ে ডুবে দুর্ঘটনার শিকার হয়।
সাঁতার না জেনেও ডুবন্ত মানুষকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। বৃহস্পতিবার ময়মনসিংহের নান্দাইলে পুকুরে পড়ে যাওয়া ছোট ভাই হাসানকে বাঁচাতে গিয়ে সাঁতার না জানা বড় বোন শরীফা খাতুনও পানিতে ডুবে মারা যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডুবন্ত মানুষকে উদ্ধারের সঠিক কৌশল না জেনে শুধু আবেগের বশে পানিতে ঝাঁপ দেওয়া প্রাণঘাতী হতে পারে। এছাড়া দেশে প্রায় ২০ লাখ মৃগীরোগী রয়েছেন যাদের অল্প পানিতে পড়ে গেলেও ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে পুকুরপাড়ে বেড়া দেওয়া, শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং সাঁতার শেখানো এই তিনটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও বাংলাদেশ এক্ষেত্রে এখনো পিছিয়ে আছে।
এ বিষয়ে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, পানিতে ডুবে মৃত্যু খুবই মর্মান্তিক। আইসিবিসি প্রকল্পের গুরুত্ব বিবেচনায় দ্বিতীয় পর্যায় এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিগত সময়ের স্বচ্ছতা পর্যালোচনা করে নতুন পরিকল্পনা আরও সমৃদ্ধ করা হবে। তিনি বলেন, শিশুদের সাঁতার শেখানোর বিকল্প নেই। প্রতিটি শিশুর সাঁতার শেখা বাধ্যতামূলক করা জরুরি।

