রক্তাক্ত জুলাই
এক জোবাইরের শরীরেই বিদ্ধ আড়াইশ গুলি
ব্যাংককে চিকিৎসা নিলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন না
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জুলাই আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জে জোবাইর হোসেনের ছোট্ট শরীরেই বিদ্ধ হয়েছিল ২৫০টি ছররা গুলি। পুলিশ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা তাকে লক্ষ্য করে এসব গুলি করেছিল। তবে সেই নৃশংস ও বর্বর হামলার পর প্রাণে বেঁচে গেলেও স্বাভাবিক জীবনে আর ফিরে আসতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন চিকিৎসকরা।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের আইসিইউতে দেড় মাস ছিলেন চিকিৎসাধীন। এরপর বাসায় নিয়ে এলেও সংক্রমণ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে নেওয়া হয় থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অবস্থিত ভেজতানি ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে। সরকারি খরচে তার চিকিৎসা চলছে। হুইল চেয়ারেই কাটছে তার সময়। তবে তার চিকিৎসা চললেও এখন আর অর্থ সংকটে তাদের পরিবার চলছে না। গাড়িচালক বাবা তার একমাত্র সন্তানকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর আশায় প্রাণপণ যুদ্ধ করে যাচ্ছেন। ছেলের সেবায় নিয়োজিত গাড়িচালক বাবা জাহাঙ্গীর হোসেনের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে। তার পরিবার এখন মানবেতর জীবনযাপন করছে। কেবল এই জোবাইর হোসেনই নন; থাইল্যান্ডের ওই হাসপাতালে জুলাই আন্দোলনে আহত আরও অন্তত ৪০ থেকে ৫০ জন চিকিৎসাধীন আছেন। কারও হাত, কারও পা ভেঙে গেছে। কারও ভোকাল কর্ড নষ্ট হয়ে গেছে। প্রায় সবাই গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন। সেই হামলার ভয়াবহ ক্ষত নিয়ে হাসপাতালের বেডে কাতরাচ্ছেন তারা। আক্রান্ত হওয়ার দুবছর পরও তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছেন না। তাদের মধ্যে অনেকেই আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন না বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
জোবাইর হোসেনের বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দিতে। তিনি তেজগাঁওস্থ ঢাকা পলিটিকেনিক্যাল কলেজে একাদশ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন।
থাইল্যান্ডের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জোবাইরের সঙ্গে হোয়াটস্যঅ্যাপে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। জোবাইর জানান, সরকার পতনের একদিন আগে যখন আন্দোলন একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে সেদিনই ৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখে তিনি নারায়াণগঞ্জে আন্দোলনে অংশ নেন। ওইদিন সকাল ১০টায় চাষাঢ়ায় ডিসি অফিসের অদূরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়।
এ সময় অনেক আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। লাশ হয়ে যান কেউ কেউ। পুলিশ লাশ দেওয়ার কথা বলে তাদের কয়েকজনকে ডেকে নিয়ে গিয়ে এলাপাতাড়ি গুলি করে। মাত্র ২০ ফিট দূরত্ব থেকে দুই শুটার তার শরীরের বাম দিকে গুলি করে। এর পর বৃষ্টির মতো তাদের ওপর গুলিবর্ষণ করে পুলিশ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। সহকর্মীরা প্রথমে তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে, পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করায়। প্রথমে ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসকরা তাকে চিকিৎসা দেননি।
জোবাইর বলেন, ছাত্র পরিচয় দিলে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না-এটি জেনে তিনি নিজে গার্মেন্ট শ্রমিক পরিচয়ে চিকিৎসা নেন। ঢাকা মেডিকেল থেকে পরে নেওয়া হয় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে। সেখানে আইসিইউতে দেড় মাস থাকার পর ফিরেছিলেন বাসায়। কিন্তু সংক্রমণ হওয়ায় চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি তাকে থাইল্যান্ডের ভেজতানি হাসপাতালে পাঠানো হয় সরকারিভাবে। ৫ মাসেরও বেশি সময় ধরে সেখানেই চিকিৎসাধীন আছেন। থাইল্যান্ডস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস তাদের চিকিৎসার তদারকি করছে।
জোবাইর জানান, তার শরীরে ২০০ থেকে ২৫০টি ছররা গুলি বিদ্ধ হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১৮টি গুলি বের করা হয়েছে। অনেক গুলি হাড়ের ভেতর ঢুকে যাওয়ায় সেগুলো বের করা যাচ্ছে না। তাই রোবটিক সার্জারি করে গুলি বের করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। রাইফেলের গুলিতে তার বাম কোমরের হাড় গুঁড়ো হয়ে গেছে। তাই কৃত্রিম হাড় লাগানো হয়েছে। স্নায়ুর সংবেদনশীলতা ফেরাতে লাগাতে হবে স্টিমুলেটর। আরও তিনটা অপারেশন করাতে হবে। জোবাইর এখনো হুইল চেয়ারে চলাফেরা করেন। উঠে দাঁড়াতে পারেন না। হাসপাতালের বেডেই সারেন প্রশ্রাব-পায়খানা। চিকিৎসা শেষেও তিনি আর স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবেন কি না, সে ব্যাপারেও নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না চিকিৎসকরা। আগামী শনিবার আরও একটি অপারেশন হবে গুলি বের করার জন্য।
তবে আক্ষেপ করে জোবাইর বলেন, ‘আমার আহত হওয়া সম্পর্কে নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম জানেন। তারা প্রথম প্রথম খোঁজখবর নিতেন ঢাকা মেডিকেলে। কিন্তু দল (এনসিপি) গঠনের পর তাদের কেউ আর আমার খোঁজখবর নেননি।’ তিনি এ ক্যাটাগরির জুলাই যোদ্ধা হিসাবে গেজেটভুক্ত বলে জানিয়েছেন।
জোবাইরের বাবা জাহাঙ্গীর হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ‘অনেক স্বপ্ন ছিল আমার একমাত্র ছেলেকে নিয়ে। সে লেখাপড়া করে বড় হবে। একদিন পরিবারের দায়িত্ব নেবে। তাকে মানুষের মতো মানুষ করব। চেয়ারকোচ চালিয়ে পরিবার চালাতাম। কিন্তু ছেলে আহত হওয়ার পর গত দুবছরেরও বেশি সময় ধরে তার চিকিৎসাসেবার পেছনেই আমার দিন কাটছে। গাড়ি চালাতে পারছি না। ৫ মাসেরও বেশি সময় ধরে আছি থাইল্যান্ডের হাসপাতালে। সরকার কেবল চিকিৎসা খরচ দিচ্ছে। কিন্তু পরিবার খুব অর্থকষ্টে আছে। স্বজনদের কাছ থেকে ধার-কর্য করে কষ্টের জীবন পার করছি। কিন্তু এভাবে আর কতদিন চলবে-সেই চিন্তায় ঘুম আসে না।’
ভেজতানি হাসপাতালে বাবার চিকিৎসার জন্য যান চট্টগ্রাম চেম্বারের পরিচালক ও চট্টগ্রাম নগর বিএনপির সাবেক শিল্পবিষয়ক সম্পাদক মো. শহীদুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘৪০ থেকে ৫০ জন জুলাই যোদ্ধা ভেজতানি হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের সবার ইনজুরি গুরুতর। জুলাই আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের গুলিতে জীবন ছারখার হয়ে যাওয়া এসব স্বপ্নবাজ তরুণের বিমর্ষ চেহারা দেখে খুব কষ্ট লেগেছে। তারও পা কেটে ফেলা হয়েছে। চট্টগ্রামের হালিশহরের এক ছেলের ভোকাল কর্ড গুলি লেগে নষ্ট হয়ে গেছে। কেউ হুইল চেয়ারে, কেউ হাসপাতালের বেডে শুয়ে অনিশ্চিত কিংবা পঙ্গু জীবনের হাতছানি নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। সরকার তাদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেবে এটাই আশা করি।’

