সেবার মান যাচাইয়ে নতুন মেথডোলজি
কলড্রপ-ইন্টারনেটের গতিতে আর ছাড় নয়
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কলড্রপ, ধীরগতির ইন্টারনেট ও দুর্বল নেটওয়ার্ক নিয়ে আর কোনো ছাড় নয়। বছরের পর বছর গ্রাহকদের ভোগান্তির পর এবার মোবাইল অপারেটরদের সেবার মান নিশ্চিতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। প্রণয়ন করা হচ্ছে নতুন কোয়ালিটি অব সার্ভিস (কিউওএস) নীতিমালা। প্রথমবারের মতো চালু হচ্ছে-উপজেলা পর্যন্ত নেটওয়ার্কের মান পর্যবেক্ষণ। বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে মাসিক প্রতিবেদন ও আকস্মিক ড্রাইভ টেস্ট। এতে নির্ধারিত বেঞ্চমার্ক পূরণে ব্যর্থ অপারেটরদের বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানাসহ আইনগত ব্যবস্থার বিধান রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমপিসিএ) সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে শুধু নীতিমালা করলেই হবে না, এর কার্যকর বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, নিয়ম ভঙ্গ করলে অপারেটরদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিটিআরসির মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শফিউল আজম পারভেজ যুগান্তরকে বলেন, সম্প্রতি জারি করা কোয়ালিটি অব সার্ভিস (কিউওএস) ডাইরেক্টিভস অ্যান্ড মেথডোলজি অনুযায়ী মোবাইল অপারেটরদের গ্রাহকসেবার মান নির্ধারিত সূচকের ভিত্তিতে যাচাই করা হবে। যথাযথ কারণ ছাড়া সেবার মানে ব্যত্যয় ঘটলে সংশ্লিষ্ট অপারেটরের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, নতুন এ নীতিমালা অনুযায়ী, মোবাইল সেবার মান মূল্যায়নে চারটি পদ্ধতি ব্যবহার করবে বিটিআরসি-নেটওয়ার্ক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এনএমএস), টেলিকম মনিটরিং সিস্টেম (টিএমএস), নির্ধারিত রুটে ড্রাইভ টেস্ট এবং অভিযোগভিত্তিক স্পট ড্রাইভ টেস্ট। প্রতিটি অপারেটরকে প্রতি মাস শেষ হওয়ার ১০ দিনের মধ্যে নেটওয়ার্কভিত্তিক, বিভাগীয় ও উপজেলা পর্যায়ের এনএমএস রিপোর্ট জমা দিতে হবে। পরে বিটিআরসি নিজস্ব টিএমএসের তথ্যের সঙ্গে তা যাচাই করে প্রতি মাসের ৩০ তারিখের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।
জানা গেছে, ড্রাইভ টেস্টের মাধ্যমে বিটিআরসির প্রকৌশলীরা বিশেষ সরঞ্জামসংবলিত যানবাহন ব্যবহার করে গ্রাহকদের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কলড্রপ, ডেটার গতি, সিগন্যালের শক্তি, নেটওয়ার্ক কভারেজ এবং লেটেন্সি (বিলম্ব) পরীক্ষা করবেন। নীতিমালা অনুযায়ী, ডাউনলোডের প্রকৃত ও ধারাবাহিক গতি নির্ভুলভাবে পরিমাপ করতে পরীক্ষার ফাইলের আকার ৩০ মেগাবাইট থেকে বাড়িয়ে ৫০ মেগাবাইট করা হয়েছে। তবে আপলোডের গতি পরীক্ষার জন্য ফাইলের আকার আগের মতোই ১০ মেগাবাইট থাকবে।
এক্সপ্রেসওয়ে ও মহাসড়কে চলাচলের সময় গ্রাহকরা কী ধরনের নেটওয়ার্ক সেবা পাচ্ছেন, তা মূল্যায়নের জন্য ড্রাইভ টেস্টের গাড়ির সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ৫০ কিমি. থেকে বাড়িয়ে ৮০ কিমি. করা হয়েছে। তবে সাধারণ সড়কে পরীক্ষার গতি আগের মতোই ঘণ্টায় ৩০ কিমি. থাকবে।
পরীক্ষার ফল আরও নির্ভুল করতে কি পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর (কেপিআই) অনুযায়ী ন্যূনতম ডেটা স্যাম্পলের সংখ্যা ৩০০ থেকে বাড়িয়ে ৫০০ করা হয়েছে। ফলে একটি সাধারণ ড্রাইভ টেস্টের প্রতিবেদনের জন্য অন্তত ৫০০টি কল সম্পন্ন করতে হবে অথবা ৫০০ কিমি. পথজুড়ে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। একইভাবে প্রতিটি ডেটা কেপিআইর জন্যও ন্যূনতম ৫০০টি স্যাম্পল সংগ্রহ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
ভয়েস কলের মান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে প্রতিটি কলের স্থায়িত্ব হবে ৯০ সেকেন্ড। এর সঙ্গে থাকবে ২০ সেকেন্ড ওয়েটিং টাইম এবং ১২০ সেকেন্ডের কল উইন্ডো। ভয়েস কল ও নেটওয়ার্কের গুণগত মান যাচাইয়ে আন্তর্জাতিক ও আধুনিক মানদণ্ড ‘পলকা’ অনুসারে ভয়েস কোয়ালিটি বা গড় মতামত স্কোর (এমওএস) হিসাব করে পরিমাপ করা হবে।
নতুন পদ্ধতিতে কারিগরি ত্রুটির কারণে কলড্রপ বা সার্ভারজনিত কারণে ডেটা সেশন বিচ্ছিন্ন হলে সংশ্লিষ্ট অপারেটরকে সুনির্দিষ্ট ‘কজ কোড’ ও যৌক্তিক ব্যাখ্যাসহ তা বিটিআরসির কাছে জমা দিতে হবে। কমিশন এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করার পরই চূড়ান্ত মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রস্তুত করবে।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, টেলিকম মনিটরিং সিস্টেমে (টিএমএস) পূর্ণাঙ্গ নেটওয়ার্ক মনিটরিং তথ্য সরবরাহ না করলে বা গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া সেবার মান নির্ধারিত বেঞ্চমার্কের নিচে নেমে গেলে লাইসেন্সের শর্ত এবং কোয়ালিটি অব সার্ভিস (কিউওএস) নির্দেশিকার আওতায় সংশ্লিষ্ট অপারেটরের বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানাসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিটিআরসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ৪জি ও ৫জি নেটওয়ার্কের বিস্তার, দ্রুতগতির এক্সপ্রেসওয়ে এবং মোবাইল ডেটা ব্যবহারের পরিবর্তিত বাস্তবতায় আগের পদ্ধতি আর যথেষ্ট কার্যকর ছিল না। এজন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে নতুন পদ্ধতি প্রণয়ন করা হয়েছে। যে প্রক্রিয়ায় দেশের সব মোবাইল অপারেটরের মতামত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জার্মান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান রোহডে অ্যান্ড শোয়ার্জর কারিগরি পরামর্শও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। নতুন মেথডোলজিটি আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের টেলিযোগাযোগ মানদণ্ড (স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন) অনুসরণ করে করা হয়েছে। এর ফলে দেশের সাড়ে ১৮ কোটির বেশি মোবাইল সংযোগ ব্যবহারকারী উন্নত ও নির্ভরযোগ্য সেবা পাবেন।

