দলিল নিবন্ধন ফি যাবে সরকারি কোষাগারে
সাবরেজিস্ট্রি অফিসে চালু হচ্ছে এ-চালান
সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় নতুন অধ্যায়
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দুর্নীতি কমাতে সাবরেজিস্ট্রি অফিসে এবার এ-চালান চালু করা হচ্ছে। ভূমি অফিসের সেবা গ্রহণকারীদের ভোগান্তি লাঘব, রাজস্ব ফাঁকি নিয়ন্ত্রণ, জাল চালান এবং নগদ লেনদেনজনিত অনিয়মের সুযোগ দূর করতে সরকার এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আগামী ৯ আগস্ট থেকে মানিকগঞ্জ সদর সাবরেজিস্ট্রি অফিসে পরীক্ষামূলকভাবে (পাইলট) এই কার্যক্রম শুরু হবে। পাইলট প্রকল্পটি সফল হলে পর্যায়ক্রমে দেশের সব সাবরেজিস্ট্রি অফিসে চালু করা হবে নতুন এই ডিজিটাল ব্যবস্থা। এতে জমির দলিল নিবন্ধন করতে গিয়ে নগদ অর্থ পরিশোধ, দীর্ঘ অপেক্ষা কিংবা অর্থ জমার প্রক্রিয়ায় জটিলতার দিন শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট অনুবিভাগ থেকে অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক সার-সংক্ষেপে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, নিবন্ধন অধিদপ্তরের অনলাইন সাবরেজিস্ট্রার কার্যক্রমের সঙ্গে অর্থ বিভাগের এ-চালান সিস্টেম সফলভাবে সংযুক্ত করতে প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার উন্নয়ন ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষ হয়েছে। এখন কেবল আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পালা। অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, সরকারি রাজস্ব আদায় ব্যবস্থার আধুনিকায়নের অংশ হিসাবে ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ-চালান ব্যবস্থা চালু করা হয়। বিশ্বব্যাংকের ‘এসপিএফএমএস’ প্রকল্পের আওতায় ই-চালান প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছে। এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএসিএস এবং আইবাস প্লাস প্লাস এর সঙ্গে সমন্বিত হওয়ায় রাজস্ব সরাসরি সরকারের ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্টে (টিএসএ) জমা হয়।
বর্তমানে আয়কর, ভ্যাট, কাস্টমস, বিআরটিএ, পরিবেশ অধিদপ্তর, আরজেএসসি, ই-পাসপোর্ট, জন্ম-নিবন্ধন, সিসিআইঅ্যান্ডই, স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সেবা ফি ও সরকারি রাজস্ব এ-চালানের মাধ্যমে জমা দেওয়া যাচ্ছে। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হচ্ছে দলিল নিবন্ধন ফি। এ চালান সিস্টেম চালু হওয়ার পূর্বে ট্রেজারি চালানের অর্থ দীর্ঘ সময় পর সরকারি কোষাগারে জমা হতো। এ প্রসঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, জমি নিবন্ধন সেবা দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়ম, দালালচক্র ও নগদ লেনদেনের অভিযোগে আলোচিত। অনলাইনে ফি জমা এবং তাৎক্ষণিক যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হলে এসব অনিয়ম কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা আরও সুশৃঙ্খলভাবে কার্যকর হবে। তিনি জানান, পাইলট কার্যক্রম সফল হলে আইন ও বিচার বিভাগের সহযোগিতায় খুব দ্রুত সারা দেশের সাবরেজিস্ট্রি অফিসে এটি চালুর পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।
অর্থ বিভাগের সার-সংক্ষেপে বলা হয়েছে, বর্তমানে সরকারের রাজস্ব ও সেবা ফি বাবদ প্রায় ২৮৬টি অর্থনৈতিক কোড এ-চালান ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে এ-চালানে আদায় হয়েছিল ১ লাখ ১০১ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৪ হাজার ৪১৮ কোটি টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ লাখ ২৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২ লাখ ২৫ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ লাখ ৬৫ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৪ লাখ ১৪ হাজার ২০৫ কোটি টাকা, যা মোট সরকারি রাজস্বের প্রায় ৯০ শতাংশ। এ প্রসঙ্গে সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, এ-চালান সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ। রাজস্ব আদায় থেকে শুরু করে হিসাব সমন্বয় পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাল হওয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। সাবরেজিস্ট্রি অফিসে এটি চালু হলে সরকারের রাজস্ব সংগ্রহ আরও শক্তিশালী হবে এবং নগদ লেনদেননির্ভর ব্যবস্থার ঝুঁকি কমবে। তিনি বলেন, তবে প্রযুক্তি চালু করাই শেষ কথা নয়। এজন্য মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ, নিরবচ্ছিন্ন সার্ভার, শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা এবং নাগরিকবান্ধব সেবা নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এসব দিকে নজর দিলেই এই উদ্যোগের পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে।

