সিলেট পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়
ব্যাচমেটকে বাঁচাতে ‘হ্যাঁ-না’ তদন্ত
নিয়াজ-তুলি দম্পতির অনিয়ম আড়াল করতে মরিয়া চেষ্টা * ভুক্তভোগীদের বাদ দিয়ে সাক্ষী করা হয়েছে অন্যদের
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সিলেট জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. নিয়াজুর রহমান ও তার স্ত্রী মেডিকেল অফিসার সুবর্ণা রায় তুলির বিরুদ্ধে ওঠা নানা অনিয়মের তদন্ত ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এতে সংশ্লিষ্টদের বাদ দিয়ে অধীনস্থ নন, এমন কর্মকর্তাদের সাক্ষী করা হয়েছে। অথচ ভুক্তভোগীদের বক্তব্য শোনা হয়নি। অভিযোগ যাচাই না করে নির্ধারিত ১২টি হ্যাঁ-না প্রশ্নোত্তরে সাক্ষ্য সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। গত বুধবার সিলেট বিভাগীয় পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ে ১২টি প্রশ্নের চেকলিস্ট দিয়ে ‘হ্যা/না’ প্রশ্নোত্তর দেওয়ার জন্য ১০ থেকে ১২ জনকে ডাকা হয়। তবে অভিযোগকারীরা জানান, তদন্তকারী কর্মকর্তা ঢাকা বিভাগীয় পরিচালক দেওয়ান মোর্শেদ কামালই অভিযুক্ত ডা. নিয়াজুর রহমানের ব্যাচমেট। তিনি কেবল অভিযুক্তদের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নোটিশ দিয়ে সাক্ষ্য নিয়েছেন। নিয়াজ-তুলি দম্পতির বিরুদ্ধে অভিযোগকারীদের বক্তব্য শোনেননি। কাউকে স্বাধীনভাবে বক্তব্য দিতে দেওয়া হয়নি। ৯ আগস্ট দৈনিক যুগান্তরে ‘স্বামী উপপরিচালক ক্ষমতার কেন্দ্রে স্ত্রী’ শিরোনামে তাদের অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর দিন মোর্শেদ কামালকে সরেজমিন তদন্তের নির্দেশ দেয় পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর। গত বুধবার সেই তদন্তে যান ওই কর্মকর্তা।
ভুক্তভোগীদের বাদ দেওয়া : প্রকৃত ভুক্তভোগীদের বাদ দেওয়ার পাশাপাশি গোপনে সাক্ষ্য দিতে চাওয়া ব্যক্তিদের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তদন্ত কর্মকর্তার কক্ষে প্রবেশের আগেই সাক্ষীদের অভিযুক্ত কর্মকর্তার পক্ষে বক্তব্য দিতে প্রভাবিত করা হয়। বিপক্ষে বক্তব্য দিলে কর্মক্ষেত্রে সমস্যার ভয় দেখানো হয়। ফেঞ্চুগঞ্জের ১৯ কর্মকর্তা-কর্মচারী ডা. তুলির বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করলেও তাদের কারও সাক্ষ্য নেওয়া হয়নি। তাদের দাবি, নিয়াজুর রহমানের স্ত্রীকে সুবিধা দিতে তদন্তে গড়িমসি ও অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
তদন্তে হস্তক্ষেপ : তদন্ত কর্মকর্তার নোটিশ উপেক্ষা করে নিয়াজুর রহমান চিঠি দিয়ে ৪৬ সাক্ষীকে এবং ডা. সুবর্ণা রায় তুলি চিঠি দিয়ে উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তদন্তে উপস্থিত থাকতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে তদন্তে হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে।
ডিজিটাল হাজিরা ও সিডিআর যাচাই হয়নি : ডা. তুলির বিরুদ্ধে অন্যতম অভিযোগ অফিসে অনুপস্থিতি। অথচ এটি যাচাই করতে ডিজিটাল হাজিরা বা মোবাইল ফোনের কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) পরীক্ষা করা হয়নি। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে অন্যতম অভিযোগ ছিল ভুয়া টিএ বিল দেওয়া। এ ক্ষেত্রেও কেন্দ্র পরিদর্শন বহি ও সংশ্লিষ্টদের সিডিআর পর্যালোচনা করা হয়নি। এ ছাড়া গোয়াইনঘাটের দুই পরিবার কল্যাণ সহকারীকে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে বদলির অভিযোগের বিষয় যথাযথভাবে যাচাই না করে অন্য উপজেলার কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এক চালকের হাতে তিন গাড়ি, ভুয়া জ্বালানি ভাউচার : নিয়াজুর রহমানের গাড়িচালক অর্জুন সূত্রধর একই সময়ে তিনটি সরকারি গাড়ির দায়িত্ব পালন করছেন। এগুলো হলো-ঢাকা মেট্রো ঘ-১৩-৮৩৭৬, ঢাকা মেট্রো ঘ-১৫-০৭৬৪ এবং সিলেট মেট্রো ঘ-১১-০০৩৩। এ ছাড়া তিনি বন্ধ ফিলিং স্টেশন থেকে গ্যাস নেওয়ার নামে ভুয়া ভাউচার দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন করেছেন।
গোপনে রেকর্ডিং, ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ : তদন্তের সময় অভিযুক্ত ডা. তুলির নিকটাত্মীয় এফডব্লিউভি চায়না তালুকদার তদন্ত কর্মকর্তার কক্ষে গোপনে মোবাইল ফোনে রেকর্ডিং চালু করে টেবিলের নিচে রেখে দেন। তবে বিষয়টি জানাজানি হলেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। এতে তদন্তের নিরপেক্ষতা ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রশিক্ষণেও পছন্দের লোকদের প্রাধান্য : সিলেটের বিভিন্ন প্রশিক্ষণে প্রার্থী বাছাইয়েও নিয়াজ-তুলি দম্পতি অনিয়ম করেছেন। তাদের পছন্দের কয়েকজনকে বারবার প্রশিক্ষণে পাঠানো হলেও যোগ্য অন্যদের বঞ্চিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা মোর্শেদ কামাল বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, নিয়াজুর রহমান ও ডা. তুলির বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগগুলোর প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট নিয়ে এসেছি। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নিয়াজ বন্ধু হোক আর যাই হোক তদন্ত নিজ গতিতেই চলবে। আমি সত্য উদঘাটন করব।
