১০ বছর বয়সে পাকিস্তান হয়ে তুরস্কে
২৫ বছরের অপেক্ষা ফুরাল মায়ের কাছে ফরিদ
জসিম উদ্দিন, কক্সবাজার
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মাত্র ১০ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে সীমান্ত পারি দিয়ে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন মোহাম্মদ ফরিদ। এরপর ট্রেন দুর্ঘটনায় হারান দুই পা। পরে মানব পাচারকারী চক্রের পাল্লায় পরে চলে যান তুরস্কে। সেখানে সমুদ্র তীরে পানি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন। তুরস্ক পুলিশ তাকে একাধিকবার আটকও করেছিল। শেষ দফায় ব্র্যাকের সহযোগিতায় দেশে ফেরেন তিনি। ইতোমধ্যেই কেটে গেছে ২৫ বছর। পরিবারের কাছে ফিরেই যেন উচ্ছ্বাসের সীমা নেই ফরিদের। হুইলচেয়ারে বসে ঘুরে বেড়াচ্ছেন পুরো বাড়ি।
বৃহস্পতিবার ঢাকার আশকোনায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। হস্তান্তরের সময় ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের পরিচালক ও রেইজ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক যুগ্ম সচিব এটিএম মাহবুবুল করিম, ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ফরিদের বৃদ্ধ মা নুরজাহান বেগম ছেলেকে কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে যে ছেলের ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন, অবশেষে সেই ছেলেকেই নিজের কাছে ফিরে পেয়েছেন তিনি। নুরজাহান বেগম বলেন, ২৫ বছর ধরে ছেলের কোনো খবর ছিল না। কতদিন যে মনে হয়েছে, আমার ছেলে হয়তো আর বেঁচে নেই। আল্লাহর কাছে কত কান্নাকাটি করেছি, ছেলেকে যেন একবার দেখতে পারি। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ ফরিদকে আবার আমার কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ছোটবেলায় আমার ছেলে বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিল। ছেলেকে হারানোর কষ্ট নিয়ে এতগুলো বছর কাটিয়েছি। এখন আমার চোখের সামনে তাকে দেখে মনে হচ্ছে, আমি যেন আবার আমার ছেলেকে নতুন করে ফিরে পেয়েছি। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের দুই পা নেই, অনেক কষ্ট করেছে। কিন্তু সে বাড়িতে ফিরে এসেছে, এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় কথা। এখন আমি চাই, আমার ছেলে আমার কাছেই থাকুক। জীবনের বাকি দিনগুলো যেন মা-ছেলে একসঙ্গে কাটাতে পারি।
ফরিদের ছোট ভাই সৈয়দ আলম উখিয়ার স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম। তিনি বলেন, ‘আমরা ধরে নিয়েছিলাম, ফরিদ ভাই আর বেঁচে নেই। এত বছর পর তাকে ফিরে পাব, এটা কখনো ভাবিনি। এখন তাকে নিজের বাড়িতে, মায়ের কাছে দেখতে পারছি, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ। তিনি বলেন, এত কষ্টের পরও বাড়িতে ফিরে ভাইয়ের মুখে যে হাসি দেখছি, সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া।
ফরিদের বাল্যবন্ধু শাহজাহান বলেন, ছোটবেলায় আমরা একসঙ্গে খেলাধুলা করেছি, একসঙ্গে বড় হয়েছি। এরপর ফরিদ হারিয়ে গেল। আমরা ধরে নিয়েছিলাম, সে হয়তো আর বেঁচে নেই। এত বছর পর বন্ধুকে আবার চোখের সামনে দেখতে পারব, এটা কখনো ভাবিনি।
১০ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে পাকিস্তানে : প্রায় ২৫ বছর আগে মাত্র ১০ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে সীমান্ত পেরিয়ে ভারত হয়ে পাকিস্তানে যান ফরিদ। সেখানে বাবা-ছেলে জীবিকার সন্ধানে ছিলেন। একপর্যায়ে ট্রেন দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন ফরিদ। চিকিৎসক তার দুই পা কেটে ফেলে। পরে মানব পাচারকারী চক্র তাকে তুরস্কে নিয়ে যায়। তার বাবা থেকে যান পাকিস্তানে। ফরিদ দীর্ঘদিন তুরস্কে অনিয়মিত অভিবাসী হিসাবে বসবাস করছিলেন। সমুদ্রতীরে পানি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন। সম্প্রতি তুরস্কের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে আটক করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়। গত ১৮ আগস্ট ভোর সোয়া ৫টার দিকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান ফরিদ। তিনি ঠিকমতো নিজের পরিচয়ও দিতে পারছিলেন না। শুধু নিজের ও মা-বাবার নাম এবং ‘উখিয়া, কক্সবাজার’ ঠিকানাটুকু বলতে পারছিলেন। পরে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মীরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীদের সহায়তায় মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে উখিয়ার মরিচ্যাপালং নাছিরপাড়ায় ফরিদের পরিবারের সন্ধান পান।
ছয় আঙুলে মিলল হারানো পরিচয় : পরিবারের সন্ধান পাওয়ার পর গত বুধবার বিকালে ভিডিও কলে ফরিদের সঙ্গে তার ছোট ভাই সৈয়দ আলমের কথা বলিয়ে দেওয়া হয়। দীর্ঘ ২৫ বছর পর ভাইয়ের কণ্ঠ শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। পরে ফরিদের একটি হাতে পাঁচটির পরিবর্তে ছয়টি আঙুল থাকার বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের নজরে আসে। বাড়তি ওই আঙুল দেখে তারা ফরিদের পরিচয় নিশ্চিত করেন। পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ছোটবেলা থেকেই তার এক হাতে ছয়টি আঙুল ছিল। ফরিদের বাবা আয়ুব আলী এখনো পাকিস্তানে রয়েছেন বলে জানিয়েছে পরিবার। ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, গত আট বছরে বিমানবন্দরে ৪১ হাজার প্রবাসীকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ফরিদের মতো ১৬৪ জন প্রবাসীকে তাদের পরিবারের কাছে নিরাপদে হস্তান্তর করা হয়েছে। তিনি বলেন, ১৭ কোটি মানুষের দেশে কাউকে খুঁজে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া কঠিন কাজ। কিন্তু সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ, প্রবাসীকল্যাণ ডেস্ক ও ব্র্যাকের সমন্বিত উদ্যোগে এমন অসম্ভবকেও সম্ভব করা গেছে। তিনি জানান, ফরিদ যাতে নতুন করে জীবন গুছিয়ে নিতে পারেন, সেজন্য দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে। ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের রেইজ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও যুগ্ম সচিব এটিএম মাহবুবুল করিমও ফরিদকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
