Logo
Logo
×
   

নগর-মহানগর

যাত্রীদের জিম্মি করে আদায় করছে মুক্তিপণ

কুমিল্লায় মহাসড়কে অপহরণচক্র

ফাঁদ পাতা হয় নিষিদ্ধ লেগুনা-মাইক্রোবাস সিএনজি অটোতে

Icon

আবুল খায়ের, কুমিল্লা

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কুমিল্লায় মহাসড়কে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে অপহরণচক্র। ছিনতাই-ডাকাতির পাশাপাশি যাত্রীদের জিম্মি করে আদায় করা হচ্ছে মুক্তিপণ। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নিষিদ্ধ লেগুনা, লক্কড়-ঝক্কড় মাইক্রোবাস এবং রেজিস্ট্রেশনবিহীন সিএনজি অটোতে ফাঁদ পাতা হয়। ফাঁদে আটকা যাত্রীকে নির্জন স্থানে নিয়ে জিম্মি করে। পরে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা এনে ছেড়ে দেয়। মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে প্রায়ই এসব চক্রের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন যাত্রীরা। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর মহাসড়কে ক্ষুদ্র যানবাহনগুলো ভয়ংকর ফাঁদে পরিণত হচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নতুন আতঙ্ক অপহরণচক্র। ছিনতাই, ডাকাতির পাশাপাশি একই চক্র এখন অপহরণ এবং জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ে জড়িয়ে পড়ছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নিষিদ্ধ লেগুনা, ফিটনেসহীন মাইক্রোবাস এবং সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে চালক এবং যাত্রীবেশে ফাঁদ পেতে বসে থাকে চক্রের সদস্যরা। বিভিন্ন স্টেশন থেকে টার্গেট করে যাত্রী উঠানো হয়। এতে যাত্রীবেশে বসে থাকা চক্রের ৪-৫ সদস্য মিলে একজনকে জিম্মি করে। এ সময় চলন্ত গাড়িতেই ভিকটিমের সঙ্গে থাকা টাকা ও মোবাইল ফোন লুটে নেওয়া হয়। পরে মোবাইল ব্যাংকিং চেক করে অর্থ হাতিয়ে নেয়। এরপর সুযোগ বুঝে কোনো কোনো যাত্রীকে জিম্মি করে অন্য গ্রুপের হাতে তুলে দেয়। এসব যাত্রীকে জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জিম্মি যাত্রীদের পাহাড়, সীমান্ত, বিলের মাঝখানে এবং নির্জন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। যাত্রী পরিবহণের আড়ালে ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণের বড় ফাঁদে পরিণত হয়েছে এসব পরিবহণ।

একাধিক ভাগে বিভক্ত হয়ে এসব চক্র মিশন পরিচালনা করছে। প্রাণের ভয়, মামলা মোকদ্দমার হয়রানি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঝামেলা এড়াতে এসব বিষয় নিয়ে মুখ খুলছেন না ভুক্তভোগীরা।

স্থানীয়রা জানান, সন্ধ্যার পর থেকে সারারাত মহাসড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এসব চক্রের সদস্যরা। গভীর রাতে বাস থেকে নেমে ফিডার রোডে চলাচলকারী যাত্রীদের বেশি টার্গেট করা হয়। পাশাপাশি সন্ধ্যার পর বিভিন্ন স্টেশন থেকে যাত্রী তুলে সর্বস্ব লুটে নেয়। সূত্র জানায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঢিলেঢালা নজরদারির সুযোগ নিয়ে চালক এবং যাত্রী সেজে অপরাধীচক্র এসব যানবাহন ব্যবহার করে যাত্রীদের সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে দিন দিন বাড়ছে রেজিস্ট্রেশনবিহীন নিষিদ্ধ লেগুনা ও লক্কড়-ঝক্কড় মাইক্রোবাসের সংখ্যা। নিষিদ্ধ এসব যানবাহনের হিসাব-নিকাশ এবং নিয়ন্ত্রণ নেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। নিষিদ্ধ এসব যানবাহন ঘিরে গড়ে উঠেছে ডাকাত এবং অপহরণকারীচক্র। সম্প্রতি অপহরণচক্র কর্তৃক কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী প্রাণ হারান। গভীর রাতে চট্টগ্রাম থেকে এসে মহাসড়কের কোটবাড়ী এলাকায় বাস থেকে নেমে সিএনজি অটোতে উঠেই চক্রের খপ্পরে পড়েন ওই কর্মকর্তা। এ সময় ছিনতাইয়ে বাধা দেওয়ায় শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় তাকে।

জেলার লাইমাই এলাকার বাসিন্দা নাইমুল ইসলাম নামের এক প্রবাসী বলেন, ‘গত ৩ আগস্ট চান্দিনায় এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে ফেরার পথে রাতে গাড়ি না পেয়ে একটি লেগুনায় ওঠি। একটু সামনে যাওয়ার পর যাত্রীবেশে থাকা পাশের ৪ জন আমার হাত-পা বেঁধে মুখে স্কচট্যাপ লাগিয়ে দেয়। পরে দুটি মোবাইল, ১৫-১৬ হাজার টাকা নিয়ে যায়। চলন্ত গাড়িতে আমাকে নিয়ে মহাসড়কে ঘুরতে থাকে। তাদের খপ্পর থেকে বাঁচতে বিকাশে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা এনে দিয়ে মুক্তি পাই।’

জেলার দেবিদ্বার উপজেলার রাজামেহার এলাকার বাসিন্দা আব্দুল লতিফ বলেন, ‘গত ২৭ জুলাই মহাসড়কের দাউদকান্দি উপজেলার হাসানপুর থেকে মাধাইয়া আসার জন্য একটি মাইক্রোবাসে উঠি। পুঠিয়া নির্জন এলাকায় আসার পর পাশের চার-পাঁচজন আমার হাত এবং চোখ বেঁধে ফেলে। এ সময় সঙ্গে থাকা ৩৩ হাজার টাকা এবং একটি মোবাইল ছিনিয়ে নেয় তারা। পরে বিকাশে টাকা আনার জন্য আমাকে মারধর করা হয়। আমি স্ত্রীর অসুস্থতা এবং বাড়িতে আমার কেউ নেই বলে আকুতিমিনতি করে রক্ষা পাই। আমি কার বিরুদ্ধে মামলা করব?ইলিয়টগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী একরাম হোসেন বলেন, ‘প্রায়ই এসব ভুক্তভোগীর আর্তনাদ এবং চিৎকার শুনি। রাতে নিষিদ্ধ লেগুনা, লক্কড়-ঝক্কড় মাইক্রোবাস এবং সিএনজি অটো এখন ভয়ংকর ফাঁদে পরিণত হয়েছে।’

কুমিল্লা ডিবির ওসি মোহাম্মদ শামসুল আলম শাহ বলেন, মহাসড়কে ছিনতাইকারী, ডাকাত এবং অপহরণকারীচক্রের সদস্যদের গ্রেফতার করতে ডিবি পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। এরই মাঝে বেশকিছু চিহ্নিত আন্তঃজেলা ডাকাত সর্দারকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এসব ডাকাতচক্র মহাসড়কে ছিনতাই, ডাকাতির পাশাপাশি যাত্রীসাধারণকে অপহরণ ও জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করত। কুমিল্লা রিজিয়নের হাইওয়ে পুলিশ সুপার শাহিনুর ইসলাম বলেন, মহাসড়কে ছিনতাইকারী, ডাকাত এবং অপহরণচক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। এরই মাঝে মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমাদের আইনগত ব্যবস্থা নিতে সহজ হয়।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .