Logo
Logo
×
   

নগর-মহানগর

বিএনপিকর্মীকে অপহরণ, হত্যা ও লাশ গুম

টাকা নিয়ে পাঁচ আ.লীগ নেতাকে অব্যাহতি!

আদালতে বাদীর নারাজি পিটিশন * আসামিদের বাঁচাতে ভাই-চাচাকে করা হয়েছে সাক্ষী * অভিযোগপত্রে বাদীর স্বাক্ষর জালের অভিযোগ

আনু মোস্তফা

আনু মোস্তফা

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

টাকা নিয়ে পাঁচ আ.লীগ নেতাকে অব্যাহতি!

সালিশের কথা বলে ডেকে নেওয়া হয়েছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিএনপিকর্মী আহাদ আলী ওরফে গোলকাজুল কাজলকে (৩৬)। এর ১৯ দিন পর পদ্মা নদী থেকে তার গলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। অপহরণ, হত্যা ও লাশ গুমের সেই ঘটনায় দায়ের মামলার মূল আসামি পাঁচ আওয়ামী লীগ নেতাকে বাদ দিয়ে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। বিপুল টাকার বিনিময়ে জড়িতদের অব্যাহতির সুপারিশের অভিযোগ উঠেছে। বাদী নিহতের স্ত্রী লিমা বেগমের দাবি-পুলিশ মূল অভিযুক্তদের বাঁচাতে তাদের ভাই-চাচা-ভাতিজাদের সাক্ষী করেছে। অথচ এজাহারে এসব সাক্ষীর নাম ছিল না। তিনি ইতোমধ্যে এই অভিযোগপত্র প্রত্যাখ্যান করে আদালতে নারাজি আবেদন করেছেন। নিহত কাজল গরু ব্যবসা করতেন। তিনি বিএনপির সক্রিয়কর্মী ছিলেন। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের চাকপাড়া গ্রামের আলতাফ হোসেন ফিরোজের ছেলে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১ জানুয়ারি চরবাগডাঙ্গা বাজারে স্থানীয় আলমগীর আলমের সঙ্গে কাজলের কথা কাটাকাটি হয়। এর একদিন পর ২ জানুয়ারি রাতে হাসেম আলী কাজলকে ফোন করে বিষয়টি সমাধানের কথা বলে আলমের বাড়িতে সালিশের জন্য ডাকেন। সেখানে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান ওমর আলী, জেলা তাঁতী লীগের সভাপতি ও ইউপি সদস্য (মেম্বার) নুরুল ইসলাম, আওয়ামী লীগ কর্মী আতাবুর রহমান সেন্টু রয়েছেন বলে জানান। প্রথমে যেতে অস্বীকৃতি জানালেও পরে হাসেমের মোটরসাইকেলে কাজল বের হন। লিমা বেগমের অভিযোগ, এর আধাঘণ্টা পর থেকে কাজলের মোবাইল ফোন বন্ধ যাওয়া যায়। পরে আলম ও হাসেমের মোবাইল নম্বরও বন্ধ যাওয়া যায়। পরদিন স্বজনদের নিয়ে বাড়িতে গেলে আলম জানান, রাতেই ঝামেলার মীমাংসা শেষে ওমর আলী, নুরুল মেম্বার ও কাজলসহ সবাই চলে গেছেন। সম্ভাব্য সব জায়গায় খুঁজে না পেয়ে ৪ জানুয়ারি সদর থানায় অভিযোগ দিতে গেলে পুলিশ মামলা নেয়নি। একপর্যায়ে স্থানীয়দের চাপে ৮ জানুয়ারি পুলিশ আওয়ামী লীগ নেতা ওমর আলী, নুরুল মেম্বার, জোহাক, নাজমুল গুদা, নেজাম উদ্দিন, আলমগীর আলম, হাসেম আলীসহ ৮ জনের নাম উল্লেখসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে অপহরণ ও গুমের মামলা নেয়। তবে পুলিশ তার স্বামীকে উদ্ধারে কোনো চেষ্টা করেনি। কেবল একজনকে আটক করে ৫৪ ধারায় চালান দিলে পরদিন তিনি জামিনে বেরিয়ে যান। আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও তাদের গ্রেফতার করেনি পুলিশ।

ঘটনার ১৯ দিন পর ২০ জানুয়ারি আলাতুলির মধ্যচরে পদ্মা নদী থেকে কাজলের গলিত লাশ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কাজলের দুই পাটি দাঁত ভাঙা ছিল। শরীরের নিচের অংশে বেশ কয়েকটি বড় ক্ষত এবং মুখ ও মাথা থেতলানো ছিল। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনেও শক্ত বস্তুর আঘাত ও শ্বাসরোধে তার মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। পরে অপহরণ ও গুমের মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তর হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাদীকে না জানিয়েই এজাহারভুক্ত আসামি আওয়ামী লীগ নেতা ওমর আলী, নুরুল মেম্বার, নাজমুল হক, নেজাম উদ্দিন ও আতাবুর সেন্টুকে অব্যাহতির সুপারিশ দিয়ে গত ২৫ জুলাই অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) আব্দুর রাজ্জাক। অন্যদিকে অভিযুক্ত করা আলমগীর আলম, হাসেম আলী, জোহাক আলী, ফরিদ উদ্দিন ও কামরুল বাচ্চুদের সবাই পলাতক।

বাদী লিমা বেগম বলেন, অভিযোগপত্রে জবানবন্দি রেকর্ড করার উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে পুলিশ আমার সঙ্গে কথাই বলেনি। আমার স্বাক্ষরও জাল করা হয়েছে। বিপুল টাকার বিনিময়ে মূল অভিযুক্তদের অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্র থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত নুরুল মেম্বারের ভাই আমিনুল, চাচা বাবলু ও চাচাতো ভাই কামালকে সাক্ষী করেছেন। অব্যাহতিপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগ নেতা ওমর আলীর চাচাতো ভাই মফিজুল ও সহকারী শরিফুলকে এবং প্রধান আসামি আলমের চাচাতো ভাই কামরুজ্জামান টুটুল ও সিরাজকে সাক্ষী করা হয়েছে। একই ঘটনা ঘটেছে অন্য আসামিদের ক্ষেত্রেও।

বাদীর আইনজীবী এমদাদুল হক লুটু বলেন, কাজলকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে প্রথমে অপহরণ ও পরে হত্যা করে লাশ গুম করা হয়। এজাহারের কোনো আসামিকে এখনো গ্রেফতার করেনি পুলিশ। দায়সারা তদন্ত করে মনগড়া অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে, যেখানে মূল অভিযুক্তদের অব্যাহতি দেওয়া হয়। আমরা নারাজি আবেদন দিয়েছি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমি তদন্তে যা পেয়েছি, সেভাবেই অভিযোগপত্র দিয়েছি। তবে অব্যাহতিপ্রাপ্ত আসামিদের ভাইসহ স্বজনদের সাক্ষী করার বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তোর দিতে পারেননি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, তদন্তের ক্ষেত্রে কর্মকর্তা পুরোপুরি স্বাধীন। তবে কাজল হত্যা মামলার তদন্তে অসঙ্গতি থাকলে খতিয়ে দেখা হবে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম