Logo
Logo
×
   

নগর-মহানগর

কুটির শিল্প

কেশবপুরে বদলে গেছে হাজারো মানুষের জীবন

ইন্দ্রজিৎ রায়

ইন্দ্রজিৎ রায়

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কেশবপুরে বদলে গেছে হাজারো মানুষের জীবন

যশোরের কেশবপুর উপজেলার আলতাপোল গ্রামের মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে টুকরো কাঠের শিল্প। ঘরে ঘরে গড়ে উঠেছে কাঠের কুটির শিল্প। প্রতিটি বাড়িই যেন একেকটি কারখানা। এসব কারখানায় তৈরি হচ্ছে অন্তত ৪০ ধরনের বাহারি শোপিস, খেলনা ও তৈজসপত্র। শ্রমিকদের হাতে টুকরো কাঠ পাচ্ছে নান্দনিক রূপ। তৈরি হচ্ছে ফুলদানি, মোমদানি, কলমদানি, পাউডার কেস, খুন্তি, হামানদিস্তা, রুটি বেলার বেলন, খেলনা সেট, চরকা, হাঁড়ি-পাতিল, থালা ও অ্যাশট্রে। শুধু আলতাপোল নয়, কন্দর্পপুর, বড়েঙ্গা ও মঙ্গলকোট গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে কাঠ শিল্প।

এ চার গ্রামের হাজারো পরিবার এ শিল্পের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছে। কর্মসংস্থান হয়েছে কয়েক হাজার মানুষের। বছরে এ শিল্পে প্রায় ১২০ কোটি টাকার লেনদেন হয়। তবে সম্ভাবনাময় এ শিল্পে রয়েছে নানা সংকট। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বিদেশে রপ্তানি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরেজমিন আলতাপোল গ্রামে দেখা যায়, রাস্তার ধারে, বাড়ির উঠানে ও খুপরি ঘরে গড়ে উঠেছে একেকটি কারখানা। মোটরের সাহায্যে টুকরো কাঠে নানা ধরনের পণ্য তৈরি করছেন শ্রমিকরা।


কারখানার শ্রমিক তরিকুল ইসলাম বলেন, দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা বেশি। ১৬ বছর ধরে কাঠের খেলনা ও শৌখিন জিনিসপত্র তৈরি করছেন তিনি। এ কাজেই তার সংসার চলে।

দক্ষতা ভালো হওয়ায় কারখানা মালিকরা তাকে লাখ টাকায় বুকিং দেন। কারখানা মালিক আবদুর রাজ্জাক বলেন, ৩০ বছর ধরে কাঠ শিল্পের সঙ্গে জড়িত তিনি। এ কাজের আয়েই বাড়ি করেছেন। বছরে আট মাস কাজ থাকে, বাকি চার মাস বসে থাকতে হয়। কাঠ, রং, শিরিস কাগজ, শ্রমিকের মজুরি ও বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে। তবে কাঠের জিনিসের চাহিদা বাড়ছে।

অজিয়র রহমান বলেন, ২৫ বছর ধরে কাঠের জিনিস তৈরি করছেন। তার কারখানায় ২২ ধরনের পণ্য তৈরি হয়। কাজ করেন ১২ জন কর্মচারী। কাঠ ব্যবসায়ী লুৎফর রহমান বলেন, মেহগনি, ইপিল-ইপিল, সফেদা ও নিমভূত গাছের কাঠ বেশি ব্যবহার হয়। খুলনা ও সাতক্ষীরা থেকেও কাঠ কিনে আনেন তিনি। প্রতিদিন ২০ থেকে ১০০ সিএফটি কাঠ বিক্রি করেন।


ইনসার শেখের হাত ধরে শুরু : নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে আলতাপোল গ্রামের ইনসার আলী শেখের হাত ধরে শুরু হয় এ কাজ। প্রায় চার দশক আগে বাঁশ ও কাঠের কুটির শিল্প ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের গ্রামগুলোতে। ঘরে ঘরে গড়ে ওঠে কারখানা। কর্মসংস্থান হয় হাজারো মানুষের। দুই বছর আগে মারা যান ইনসার। তবে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা এখনো তার অবদান স্বীকার করেন।

ইনসারের স্ত্রী সখিনা বেগম বলেন, বড় ছেলে বাড়ি থেকে পালিয়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে যায়। তাকে খুঁজতে ভারতে গিয়ে বাঁশ দিয়ে বিভিন্ন জিনিস তৈরির কাজ শেখেন ইনসার। দেশে ফিরে বাঁশের জিনিস তৈরি শুরু করেন। পরে টুকরো কাঠ দিয়ে জিনিস তৈরি করেন। তাকে দেখে গ্রামের অন্যরাও এ কাজ শুরু করেন। এভাবেই কয়েকটি গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে শিল্পটি। বাবার কাজের হাল ধরেছেন ছোট ছেলে বখতিয়ার রহমান। তিনি বলেন, তখন গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। হাতে কাঠের কাজ করতে হতো। ২০০০ সালের দিকে বিদ্যুৎ আসার পর মোটরের সাহায্যে কাজ শুরু হয়।

সরকারি সহায়তার অপেক্ষা : ২০২২ সালে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) পল্লী জীবিকায়ন প্রকল্পের আওতায় চার গ্রামকে ‘শিল্পপল্লি’ ঘোষণা করা হয়। দেওয়া হয় প্রশিক্ষণ ও স্বল্প সুদের ঋণ। তবে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় এখন তেমন তৎপরতা নেই। নিজস্ব অর্থায়নে পণ্য তৈরি করছেন মালিক ও শ্রমিকরা।


কুটির শিল্প ব্যবসায়ী বাবুল আক্তার বলেন, সরকারি ঋণ না পাওয়ায় বেশির ভাগ মালিক এনজিও থেকে ঋণ নিচ্ছেন। এতে চড়া সুদ দিতে হচ্ছে। সরকারি আর্থিক সহযোগিতা পেলে কাঠ শিল্প আরও এগিয়ে যাবে। কারখানা মালিক রাশেদ বিশ্বাস বলেন, বিদেশে রপ্তানির উদ্যোগ নিলে পণ্যের মান বাড়বে এবং তারা বেশি দাম পাবেন।

বিআরডিবি যশোরের উপপরিচালক বিএম কামরুজ্জামান বলেন, কাঠ শিল্পে জড়িতদের প্রশিক্ষণ ও দেড় থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত স্বল্প সুদের ঋণ দেওয়া হয়েছে। কাঠ শিল্পকে রপ্তানি পণ্য হিসাবে গড়ে তুলতে কাজ চলছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ‘এক পল্লী, এক পণ্য’ প্রকল্পের পাইলট প্রকল্পে যশোর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এর আওতায় কেশবপুরের কাঠ কুটির শিল্পের বিকাশে কাজ করা হবে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম