Logo
Logo
×

সম্পাদকীয়

ইসলামাবাদে বিশেষ বৈঠক, ধ্বংসের কিনারে দাঁড়িয়ে শান্তির শেষ সুযোগ

Icon

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ইসলামাবাদে বিশেষ বৈঠক, ধ্বংসের কিনারে দাঁড়িয়ে শান্তির শেষ সুযোগ

ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হঠকারী যুদ্ধের ফলে মানবসভ্যতা যখন ধ্বংসের কিনারে দাঁড়িয়ে, ঠিক তখনই পাকিস্তানের নিবিড় মধ্যস্থতায় অর্জিত ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতি বিশ্ববাসীকে কিছু সময়ের জন্য হলেও স্বস্তি এনে দিয়েছে। দীর্ঘ ৪০ দিনের প্রলয়ংকরী যুদ্ধে পাঁচ হাজার তিনশ’রও বেশি মানুষের প্রাণহানি এবং অসংখ্য স্থাপনা ধ্বংসের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এ সমঝোতা এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় থেকে ফেরার চেষ্টা। আজ পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে যে সরাসরি বৈঠক হতে যাচ্ছে, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র রক্তে রঞ্জিত হবে, নাকি শান্তির কপোত উড়বে।

এ বৈঠকটি নানাদিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এই শান্তির পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়। একদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যেমন তাদের শর্তে অটল, অন্যদিকে ইরানের ১০ দফা দাবিতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং বিপুল ক্ষতিপূরণের বিষয়টি অমীমাংসিত। বিশেষ করে লেবানন ফ্রন্টে ইসরাইলের হামলা অব্যাহত রাখার একতরফা ঘোষণা এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে যে কোনো মুহূর্তে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে। হিজবুল্লাহও হুঁশিয়ারি দিয়েছে, লেবাননকে বাদ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ শান্তি আলোচনা সফল হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

আমরাও এই যুদ্ধবিরতি এবং ইসলামাবাদের আলোচনার ফলাফল অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। যদিও ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ এই সংঘাত থেকে দূরে; কিন্তু এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অভিঘাত আমাদের জাতীয় জীবনে অনস্বীকার্য। প্রথমত, জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালি হলো বিশ্ব তেল বাণিজ্যের ফুসফুস। যুদ্ধের কারণে এই পথ অবরুদ্ধ হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম যে হারে বাড়ছিল, তাতে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা ছিল। যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী প্রণালিটি উন্মুক্ত হলে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও পরিবহণ খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের বিশাল শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স প্রবাহ এই সংঘাতের সরাসরি ঝুঁকিতে রয়েছে। সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে কর্মরত লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশির নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান এ যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে রেমিট্যান্স প্রবাহে ধস নামার আশঙ্কা প্রবল, যা আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে বিপর্যয় ডেকে আনবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার কারণে খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর গভীর চাপ সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।

বলতেই হবে, ট্রাম্পের সামরিক আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষা আর পারস্যবাসীর অটল প্রতিরোধ-এ দুইয়ের মধ্যবর্তী অবস্থানে দাঁড়িয়ে বিশ্ব আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে। ইসলামাবাদের শান্তি আলোচনা যদি কেবল রাজনৈতিক চাতুর্যে সীমাবদ্ধ থাকে এবং কোনো টেকসই সমাধানে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ১৪ দিন পর মধ্যপ্রাচ্য আবার এক প্রলয়ংকরী নরককুণ্ডে পরিণত হবে। তাই বিশ্ব নেতৃত্বকে কেবল নিজেদের রাজনৈতিক জয়-পরাজয় নিয়ে মত্ত না থেকে সাধারণ মানুষের স্বার্থে শান্তিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ইসলামাবাদ বৈঠক যেন স্থায়ী স্থিতিশীলতার পথে প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে চিহ্নিত হয়, এটাই প্রত্যাশা।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম