Logo
Logo
×
   

সম্পাদকীয়

মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ

শক্তিশালী কমিশন গঠনের পথ যেন রুদ্ধ না হয়

Icon

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ

মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা হারিয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। উল্লেখ্য, জাতীয় সংসদে উত্থাপিত না হওয়ায় স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাতিল হয়ে গেছে বা কার্যকারিতা হারিয়েছে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারিকৃত এ অধ্যাদেশ। কী কারণে অধ্যাদেশটি বাতিল করা হলো, তা আমাদের বোধগম্য নয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আরও যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী সময়ে এ সংক্রান্ত সংশোধিত শক্তিশালী বিল আনা হবে। তবে সমালোচকরা বলছেন, মূলত গুমের নির্দেশদাতা হিসাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দায়মুক্তি দিতে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় সরকারের অনুমোদন ছাড়া কমিশনের তদন্ত ও গ্রেফতার করার ক্ষমতা রহিত করতেই অধ্যাদেশটি সরকার সংসদে উত্থাপন করেনি।

আমরা আশা করতে চাই, এ অভিযোগ সত্য নয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মানবাধিকার কমিশন হলো সাধারণ মানুষের বিশেষ আশ্রয়স্থল, যা রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন একটি সাংবিধানিক সংস্থা হিসাবে গঠিত হয়েছিল এই লক্ষ্য নিয়ে যে, এটি সরকারের প্রভাবমুক্ত থেকে নাগরিক অধিকার রক্ষায় শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে। অধ্যাদেশ বাতিলের ফলে কমিশন এখন কার্যত একটি সরকারি দপ্তরের স্তরে নেমে আসার ঝুঁকিতে রয়েছে। কমিশনের নিজস্ব নিয়োগ প্রক্রিয়া, তদন্তের ক্ষমতা এবং আর্থিক স্বায়ত্তশাসন যদি খর্ব হয়, তবে সেটি কেবল কাগুজে বাঘে পরিণত হবে। উল্লেখ্য, একটি কমিশন তখনই সফল হয়, যখন সেটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তির বিরুদ্ধেও অভিযোগ নেওয়ার সাহস রাখে। কিন্তু নিয়োগ এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে যদি কমিশনের হাত-পা বেঁধে দেওয়া হয়, তবে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও প্রকট হবে।

বাংলাদেশ বর্তমানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে মানবাধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা সবসময় একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর গুরুত্বারোপ করে। এই অধ্যাদেশ বাতিলের খবর আন্তর্জাতিক মহলে নেতিবাচক বার্তা দেবে। যদি কমিশন স্বাধীনভাবে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা সাধারণ মানুষের ওপর রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের তদন্ত করতে না পারে, তাহলে বহির্বিশ্বে দেশের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে।

অতীতে অভিযোগ ছিল, মানবাধিকার কমিশন কেবল ছোটখাটো সমস্যা নিয়ে সরব থাকে, কিন্তু বড় বড় রাষ্ট্রীয় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে তারা নীরব ভূমিকা পালন করে। আইনি ভিত্তি দুর্বল হলে এই নীরবতা আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। আমরা মনে করি, মানবাধিকার কমিশনকে পাশ কাটিয়ে কোনো টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। সরকারের উচিত এ কমিশনকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া, বিশেষ করে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং অপরাধীদের শাস্তির সুপারিশ বাস্তবায়নে কমিশনের ক্ষমতায়ন দরকার।

বস্তুত মানবাধিকার হলো নাগরিকের জীবন ও সম্পদ রক্ষার সেভগার্ড। সরকারের উচিত হবে অতিদ্রুত এই অধ্যাদেশ সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন করে কমিশনকে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও শক্তিশালী সংস্থা হিসাবে পুনর্গঠিত করা। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের বিচার পাওয়ার পথ সংকুচিত হবে এবং রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব বাড়বে। আমরা আশা করি, সরকার জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা ও মর্যাদা বৃদ্ধিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম