রাজধানীর গণপরিবহণে বিশৃঙ্খলা
রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সমন্বিত সংস্কার জরুরি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানী ঢাকার গণপরিবহণব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরেই ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা লক্ষ করা যাচ্ছে। সড়কে প্রতিনিয়ত যে অনিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা ও তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে, তা কেবল নগরবাসীর দৈনন্দিন মূল্যবান সময় ও শ্রম নষ্ট করছে না, কেড়ে নিচ্ছে বহু তাজা প্রাণ। শত শত মানুষ পঙ্গুত্ববরণ করে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। ঢাকা পরিবহণ সমন্বয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় চার কোটি ট্রিপ হলেও বাসে যাত্রী পরিবহণের হার ২০০৯ সালের ২৮ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে মাত্র ৭ শতাংশে ঠেকেছে। একই সময়ে শহরের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষকে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে। মেগাসিটি ঢাকার অর্থনৈতিক গতিশীলতা, পরিবেশের ভারসাম্য এবং নগরবাসীর স্বস্তিদায়ক জীবনযাত্রার মান বিবেচনায় এ পরিসংখ্যান কেবল হতাশাজনক নয়, প্রশাসনিক ব্যর্থতারও প্রকাশ।
গণপরিবহণের এ অচলাবস্থার নেপথ্যে কারিগরি জটিলতার চেয়েও বড় কারণ সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনার অভাব এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার মারাত্মক ঘাটতি। সোমবার যুগান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পরিবহণ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপকরা যেসব অভিমত ব্যক্ত করেছেন, তা অত্যন্ত স্পষ্ট-‘বাস রুট রেশনালাইজেশন’ বা কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা কোনো জটিল প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, এটি মূলত একটি নিয়মানুগ প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা। বর্তমানে রাজধানীতে বাস পরিচালনায় মালিকদের দৈনিক চুক্তিভিত্তিক টাকা আদায়ের প্রথা চালু রয়েছে। ফলে মালিকের চাহিদা পূরণ এবং চালকের নিজের আয়ের তাগিদে সড়কে ওভারটেকিং ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে যাত্রী তোলার অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলে। এতে বাসচালকদের মধ্যে মারাত্মক অস্থিরতা তৈরি হয়। কাজেই চালকদের নির্দিষ্ট বেতন, সম্মানজনক কর্মঘণ্টা এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত না করে কেবল ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এ বিশৃঙ্খলা কমানো যাবে না।
বিগত এক দশকে ঢাকার বাস রুট রেশনালাইজেশন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও গবেষণা হলেও তা বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের আমলে ১৭৪টি রুটকে ২২টিতে আনা, হাজারো খুচরা কোম্পানিকে ছয়টি সুনির্দিষ্ট ফ্র্যাঞ্চাইজিতে যুক্ত করা এবং লক্কড়-ঝক্কড় বাস তুলে নিয়ে চার হাজার আধুনিক বাস নামানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং কায়েমি স্বার্থান্বেষী পরিবহণ গোষ্ঠীর অসহযোগিতার কারণে সেই রূপরেখা থমকে যায়। আমরা মনে করি, বিচ্ছিন্ন বা পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ নয়, সমগ্র রাজধানীতে একযোগে রুট রেশনালাইজেশন চালু করা না হলে এ ব্যবস্থাপনার কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে গণপরিবহণে টেকসই শৃঙ্খলা ফেরানো, অনিয়ন্ত্রিত যানজট কমানো এবং সড়কে চাঁদাবাজি পুরোপুরি বন্ধ করা সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। বাস রুট রেশনালাইজেশনের এতদিন ধরে স্থগিত থাকা দীর্ঘায়িত প্রক্রিয়া সংশোধন করে বুয়েট ও নগর পরিকল্পনাবিদদের সমন্বয়ে একটি গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন বা মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন যেমন জরুরি, তেমনই বাসের মতো মৌলিক গণপরিবহণকে শৃঙ্খলায় আনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাস যেন নগরীর বাসিন্দাদের জন্য স্বস্তিদায়ক সেবার বাহন হয়, সেজন্য দরকার সুদৃঢ় প্রশাসনিক মানসিকতা। সরকার এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে-এটাই কাম্য।
