Logo
Logo
×
   

সম্পাদকীয়

মুক্তিযুদ্ধে শহীদের তালিকা, রাষ্ট্রের দায়মুক্তির এ উদ্যোগ সাধুবাদযোগ্য

Icon

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মুক্তিযুদ্ধে শহীদের তালিকা, রাষ্ট্রের দায়মুক্তির এ উদ্যোগ সাধুবাদযোগ্য

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম অর্জন। কিন্তু পরিতাপের বিষয়-স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক অতিক্রান্ত হলেও মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত শহীদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং নির্যাতিত বীরাঙ্গনাদের একটি পূর্ণাঙ্গ, সর্বজনগ্রাহ্য, প্রামাণ্য ও নির্ভুল জাতীয় তালিকা প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি।

এই ঐতিহাসিক শূন্যতার অবসান ঘটিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নির্মোহ, তথ্যনির্ভর, প্রামাণ্য ও সর্বজনগ্রাহ্য ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় যে কৌশল ও করণীয় নির্ধারণের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী। রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতিকে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক দায় ও বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত করার গুরুত্ব অনুধাবন করে এ যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার জন্য আমরা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে ধন্যবাদ জানাই।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্কের অন্যতম প্রধান কারণ হলো বস্তুনিষ্ঠ প্রামাণ্য তথ্যের ঘাটতি এবং আবেগ বা অনুমানভিত্তিক তথ্যের প্রাধান্য। স্বাধীনতার পরপরই দেশের প্রশাসনিক অবকাঠামো পুনর্গঠন প্রক্রিয়া স্বাভাবিক না থাকায় এবং পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তথ্য ধারাবাহিকভাবে নথিবদ্ধ করা হয়নি। বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত গবেষণায় শহীদের সংখ্যা নিয়ে স্পষ্ট মতভেদ ও তারতম্য পরিলক্ষিত হয়েছে। ইতঃপূর্বে পরিচালিত এক উল্লেখযোগ্য গবেষণায় দেখা যায়-নথিপত্র ও গবেষণায় সরাসরি প্রাপ্ত শহীদের সংখ্যা ৪৬,১৩৫; ধারণাগত বা অনুমাননির্ভর শহীদের সংখ্যা ২,১৩,০৪৩ এবং বিভিন্ন তালিকায় প্রাপ্ত শহীদের সংখ্যা ৩০,৭৫৫। অন্যদিকে শেখ মুজিবুর রহমানের দাবি ছিল, মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা ৩০ লাখ। তথ্যের এই ব্যাপক ব্যবধান স্পষ্ট করে দেয়, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা কতটা জরুরি।

সুখবর যে, এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্প্রতি বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এতে দেশের শীর্ষস্থানীয় গবেষক, শিক্ষাবিদ, ইতিহাসবিদ, সামরিক ব্যক্তিত্ব ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। বলা বাহুল্য, তাদের অংশগ্রহণ এ কাজের গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। বৃহস্পতিবার যুগান্তরের খবরে প্রকাশ, বুধবার এ সম্পর্কিত এক বিশেষ সভায় বিশিষ্টজনরা একমত হয়েছেন যে, অনুমান বা বিচ্ছিন্ন উপাত্তের বদলে প্রাতিষ্ঠানিক নথি, সামরিক রেকর্ড, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং স্থানীয় গবেষণার সমন্বয়ে একটি নিরপেক্ষ জাতীয় ডেটাবেজ তৈরি করা প্রয়োজন। বিশেষ করে, প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিদের সাক্ষ্য ও অভিজ্ঞতার তথ্য বিলম্ব না করে দ্রুত রেকর্ড ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক, যা যথার্থ বলেই মনে করি আমরা।

পাশাপাশি এই বিশাল ও সংবেদনশীল উদ্যোগকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রেখে সফল করতে মাঠপর্যায়ে তথা ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করে তথ্য সংগ্রহের টেকসই কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ উদ্যোগকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে নিরপেক্ষ ইতিহাসবিদ, গবেষক ও আর্কাইভ বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি জাতীয় যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করাও জরুরি। শহীদ ও বীরাঙ্গনাদের তথ্য ডিজিটাল আর্কাইভে সংরক্ষণ করতে হবে। প্রাথমিক তালিকা প্রকাশের পর সুনির্দিষ্ট মেয়াদে উন্মুক্ত সংশোধনের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সমগ্র বাঙালি জাতির আমানত। সব পক্ষের সহযোগিতার মাধ্যমে সরকারের এই ঐতিহাসিক উদ্যোগ সফল হবে, এটাই প্রত্যাশা।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .