টার্মিনাল থাকলেও এলএনজি নেই
জ্বালানি খাতে সুশাসন ও পেশাদারি জরুরি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ। ২৭ দিন সারা দেশে যে ভয়াবহ গ্যাস সংকট চলছে, তা জনজীবন থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদন-সবকিছুকেই মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। সোমবার যুগান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, এ সংকটের মূল কারণ বিশ্ববাজারে গ্যাসের দুষ্প্রাপ্যতা নয়, বরং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অপরিণামদর্শিতা, অস্বচ্ছতা ও তদবির। এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল গ্যাস সরবরাহের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত থাকলেও সেখানে খালাস করার মতো কোনো কার্গো নেই। এ পরিস্থিতি কেবল হতাশাজনক নয়, বরং উদ্বেগজনক।
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নিয়মতান্ত্রিক ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) ৬টি এলএনজি কার্গো আমদানির যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা ছিল সম্পূর্ণ ভুল এবং বিশেষ মহলের স্বার্থান্বেষী তদবিরের ফসল। আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটের দামের তুলনায় অতিরিক্ত কম মূল্যে সন্দেহজনক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কেনার তদবির রক্ষা করার ফলস্বরূপ নির্ধারিত সময়ে কার্গো না আসায় পুরো দেশ আজও গ্যাস সংকটে ধুঁকছে। এ সংকট সামাল দিতে তড়িঘড়ি করে আবার স্পট মার্কেট থেকে জরুরি ভিত্তিতে ৫টি কার্গো কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের তাৎক্ষণিক ও অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়। জরুরি ভিত্তিতে স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কিনতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই বেশি মূল্য পরিশোধ করতে হয়, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট এড়াতে তাই দ্রুত, গঠনমূলক ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করি আমরা। এজন্য প্রথমেই এ ভয়াবহ গ্যাস সংকটের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে গ্রহণ করতে হবে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি (ডিপিএম) কেবল বিশেষ জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য; কিন্তু একে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে নিজস্ব লোক বা প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক এবং আন্তর্জাতিক মানের দরপত্র প্রক্রিয়া (ওপেন টেন্ডারিং মেথড) বাধ্যতামূলক করতে হবে। ভবিষ্যৎ দরপত্রের ক্ষেত্রে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পূর্ব অভিজ্ঞতা, আর্থিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের সুনাম কঠোরভাবে যাচাই করতে হবে। অস্বাভাবিক কম মূল্যের প্রস্তাব পেলেই তা লুফে নেওয়ার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবসম্মত বাজারদর এবং সরবরাহের নিশ্চয়তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা যে কোনো সময় অভ্যন্তরীণ সংকট তৈরি করতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে গ্যাস আমদানি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দেশের ভেতরে স্থল ও সমুদ্রভাগে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান এবং উত্তোলনের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে।
বর্তমান সরকার দেশকে এগিয়ে নিতে যে নিরলস প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, মুষ্টিমেয় কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের কারণে তা যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে। জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে স্থান দিয়ে জ্বালানি খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও পেশাদারত্ব বজায় রাখতে হবে যে কোনো উপায়ে।
