Logo
Logo
×
   

সম্পাদকীয়

নিরাময়কেন্দ্র যখন নির্যাতনশালা

চিকিৎসার নামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করা জরুরি

Icon

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নিরাময়কেন্দ্র যখন নির্যাতনশালা

মাদকাসক্তি কোনো অপরাধ নয়, এটি একটি ব্যাধি। একজন ব্যাধিগ্রস্ত মানুষকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার শেষ ভরসাস্থল হওয়ার কথা মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রগুলো। তবে গতকাল যুগান্তরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে যে ভয়াবহ ও চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে, তা দেখে স্তম্ভিত না হয়ে উপায় নেই। নিরাময়কেন্দ্রের নাম ভাঙিয়ে রাজধানীসহ দেশজুড়ে গড়ে উঠেছে পাঁচ শতাধিক বাণিজ্যকেন্দ্র, যেগুলোর বেশির ভাগই সাইনবোর্ডসর্বস্ব ও অবৈধ। সেবা দেওয়ার নামে সেখানে চলছে নির্যাতন, অর্থ লুটপাট, এমনকি মাদক ব্যবসাও! মানবিক চিকিৎসার পরিবর্তে এসব প্রতিষ্ঠান রূপ নিয়েছে একেকটি নির্যাতনকেন্দ্রে। এদের এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করা জরুরি।

প্রতিবেদনে উঠে আসা রাজধানীর অভিজাত এলাকার ‘বীকন পয়েন্ট’-এর চিত্রটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি দেশের অধিকাংশ বেসরকারি নিরাময়কেন্দ্রের সার্বিক নৈরাজ্যেরই একটি উদাহরণ। কোনোরকম চিকিৎসাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই রোগী ভর্তি করা, নামহীন ওষুধ খাইয়ে অবচেতনে রাখা, স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে অমানবিক বদ্ধ পরিবেশে আটকে রাখা এবং মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া-এ যেন সেবার নামে প্রকাশ্য প্রতারণা। আরও ভয়াবহ তথ্য হলো, ‘ক্যাচিং পার্টি’ নামের বিশেষ দল ভাড়া করে পারিবারিক বা সম্পত্তিগত বিরোধের জেরে সুস্থ মানুষকেও মাদকাসক্ত বানিয়ে আটকে রাখা হচ্ছে। অর্থাৎ, টাকার বিনিময়ে যে কাউকেই এই গোপন কারাগারে বন্দি করা সম্ভব হচ্ছে। চিকিৎসার এমন বিকৃতি ও ভয়াবহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কোনো সভ্য সমাজে চলতে পারে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকাসক্তি নিরাময়ে প্রয়োজন সঠিক ওষুধ, মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন এবং বৈজ্ঞানিক কাউন্সেলিং। বন্দিত্ব বা শারীরিক নির্যাতন কখনো চিকিৎসার অংশ হতে পারে না; বরং এতে রোগী মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে আরও গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। বিশেষ করে দেশে ইয়াবা ও আইসের মতো ভয়াবহ মাদকের বিস্তারে কিশোর ও তরুণরা যখন হৃদরোগ ও মানসিক বৈকল্যের মতো মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে, তখন নিরাময়কেন্দ্রগুলোর এমন অপচিকিৎসা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাচ্ছে।

আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতিতে মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’-এর কথা বলা হলেও বাস্তবে এ ক্ষেত্রে তদারকির অভাব স্পষ্ট। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির শিথিলতার কারণেই এসব প্রতিষ্ঠান দিনদিন ‘টাকার মেশিন’ ও অপরাধচক্রে পরিণত হয়েছে। নিরাময়কেন্দ্র পরিচালনা করার জন্য যে নির্দিষ্ট নিয়মকানুন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের উপস্থিতি এবং মানবিক পরিবেশের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কীভাবে তারা বছরের পর বছর ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে, তার জবাব কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে।

দেশজুড়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা এ ধরনের নামসর্বস্ব ও অবৈধ নিরাময়কেন্দ্রে অবিলম্বে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা দরকার। যেসব কেন্দ্রে অপচিকিৎসা, নির্যাতন ও প্রতারণার প্রমাণ মিলছে, তাদের লাইসেন্স বাতিল করে জড়িতদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে আধুনিক নিরাময়কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো এবং বৈধ বেসরকারি কেন্দ্রগুলোয় নিয়মিত সারপ্রাইজ অডিট নিশ্চিত করা জরুরি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্বাস্থ্য বিভাগ ও সুশীল সমাজের সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া মাদকের এই গ্রাস ও নিরাময়কেন্দ্রগুলোর নৈরাজ্য বন্ধ করা সম্ভব নয়। সেবার নামে গড়ে ওঠা এই গোপন কারাগারগুলোর অস্তিত্ব চিরতরে মুছে ফেলা হোক।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .