মেঘনায় দুই লঞ্চের সংঘর্ষে নিহত ৪ আহত ২০
যুগান্তর প্রতিবেদন ও চাঁদপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চাঁদপুরের মেঘনা নদীতে যাত্রীবাহী দুই লঞ্চের সংঘর্ষে চারজন নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছেন। ঘন কুয়াশার কারণে বৃহস্পতিবার রাত ২টায় ঢাকাগামী এমভি জাকির সম্রাট-৩ ও বরিশালগামী অ্যাডভেঞ্চার-৯-এর মাঝে এ সংঘর্ষ হয়। শুক্রবার বেলা ১১টায় চাঁদপুর নৌ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এএসএম ইকবাল ও সদরঘাট নৌ থানার ইনচার্জ সোহাগ রানা এ তথ্য জানিয়েছেন।
এ ঘটনায় ঘন কুয়াশার মধ্যে লঞ্চ না চালানোর নির্দেশনা দিয়েছেন নৌপরিবহণ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম. সাখাওয়াত হোসেন। এছাড়া দুর্ঘটনা তদন্তে মন্ত্রণালয় থেকে ৮ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চাঁদপুর নৌ অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, হতাহতরা সবাই এমভি জাকির সম্রাট-৩ লঞ্চের যাত্রী। নিহতরা হলেন-ভোলার লালমোহন উপজেলার কাজিরাবাদ এলাকার সিরাজুল ব্যাপারীর ছেলে আবদুল গনি (৩৮), একই এলাকার কালু খাঁর ছেলে মো. সাজু (৪৫), কচুখালী গজারিয়া এলাকার মো. মিলনের স্ত্রী মোসা. রিনা (৩৫) এবং চরফ্যাশন উপজেলার আহমদপুর এলাকার আমির হোসেনের ছেলে মো. হানিফ (৬০)।
লঞ্চের যাত্রীরা জানান, ভোলার ঘোষেরহাট থেকে ছেড়ে আসা ঢাকা অভিমুখী এমভি জাকির সম্রাট-৩ লঞ্চটি রাত ২টার পর হাইমচর নৌ এলাকা অতিক্রম করছিল। ওই সময় ঢাকা থেকে বিএনপির সম্মেলনের যাত্রী নিয়ে যাচ্ছিল বরিশালগামী এমভি অ্যাডভেঞ্চার-৯। এ সময় নদীতে প্রচণ্ড ঘন কুয়াশা থাকায় দিক নির্ণয় করতে না পেরে অ্যাডভেঞ্চার-৯ লঞ্চটি জাকির সম্রাট-৩ কে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমভি জাকির সম্রাট-৩। এটি যখন মাঝ নদীতে ডুবোডুবো অবস্থায় ভাসছিল, তখন ভোলা থেকে ঢাকাগামী লঞ্চ এমভি কর্ণফুলী-৯ দ্রুত এগিয়ে আসে। তারা অনেক যাত্রীকে উদ্ধার করে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়।
শুক্রবার সকাল আনুমানিক ৯টা ৪৫ মিনিটে এমভি জাকির সম্রাট-৩ লঞ্চটিও ঢাকা সদরঘাট নৌ টার্মিনালে পৌঁছায়। সদরঘাট নৌ থানা পুলিশ লাশগুলো উদ্ধার করে এবং আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়। অন্যদিকে এমভি অ্যাডভেঞ্চার-৯ লঞ্চটি সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে ঝালকাঠি নৌঘাটে পৌঁছায়। সেখানে লঞ্চটির চারজন কর্মীকে আটক করা হয়।
ঝালকাঠি প্রতিনিধি জানান, ঝালকাঠি সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইমতিয়াজ মাহমুদ জানিয়েছেন, লঞ্চটি ঝালকাঠিতে নোঙর করার পর এর সারেং, সুকানি, সুপারভাইজার ও ইঞ্জিনচালক পালিয়ে যান। তবে চারজন কেবিন বয়কে আটক করে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। এরা হলেন-মো. মিন্টু, মো. সোহেল, মহিন হাওলাদার ও মনিরুজ্জামান।
চাঁদপুর বন্দর কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান বলেন, চাঁদপুরের হাইমচর সীমান্তবর্তী নীলকমল বাংলাবাজার এলাকায় ঘন কুয়াশার কারণে দুই লঞ্চের সংঘর্ষ হয়।
চাঁদপুর নৌ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এএসএম ইকবাল বলেন, রাত আনুমানিক পৌনে ৩টার দিকে চাঁদপুর নৌ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। সেখানে দুর্ঘটনা কবলিত কোনো লঞ্চ পাওয়া যায়নি। ততক্ষণে লঞ্চগুলো ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
হাইমচরের ব্যবসায়ী শামীম বলেন, রাত ২টার দিকে নদীতে বিকট শব্দ হয়। সকালে নদী পাড়ে গিয়ে কোনো কিছুই পাওয়া যায়নি।
পরিবারকে অর্থ সহায়তা : নৌপরিবহণ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম. সাখাওয়াত হোসেন শুক্রবার সকালে রাজধানীর সদরঘাটে দুর্ঘটনা কবলিত এমভি জাকির সম্রাট-৩ পরিদর্শন করেন। তিনি নিহত ও আহত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে তাৎক্ষণিকভাবে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং আহতদের চিকিৎসায় ৫০ হাজার টাকা প্রদান করা হচ্ছে বলে জানান। এছাড়াও লঞ্চ দুটির মালিকপক্ষকে ডাকার নির্দেশ দেন। দায়ী মালিকপক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হবে বলেও জানান। এ সময় উপদেষ্টা ঘন কুয়াশার মধ্যে লঞ্চ না চালানোর নির্দেশনা দেন। প্রত্যেক লঞ্চে ফগ লাইট ও সাইড লাইট নিশ্চিত করতে বলেন।
তদন্ত কমিটি গঠন : সংঘর্ষের কারণ উদ্ঘাটন এবং দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্তের জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শুক্রবার নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব ছন্দা পাল স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। কমিটির আহ্বায়ক নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মুহিদুল ইসলাম, এছাড়া সদস্য হিসাবে রয়েছেন যুগ্মসচিব মোহাম্মদ এমরান হোসেন, নৌপরিবহণ অধিদপ্তরের একজন প্রতিনিধি (পরিচালক পদমর্যাদার), বিআইডব্লিউটিএর একজন প্রতিনিধি (পরিচালক পদমর্যাদার), ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের একজন প্রতিনিধি, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের একজন প্রতিনিধি, নৌ পুলিশের একজন প্রতিনিধি। এছাড়া সদস্য সচিব হিসাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব এটিএম মোর্শেদকে।
আরও আট লঞ্চে সংঘর্ষ : বরিশাল ব্যুরো জানায়, বরিশালগামী এম খান-৭ লঞ্চটির সঙ্গে ঢাকাগামী ঈগল-৪ যাত্রীবাহী লঞ্চটির সংঘর্ষ হয়েছে। এতে এম খান-৭ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে চাঁদপুরের মেঘনা নদীর আমিরাবাদ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে দুই যাত্রী সামান্য আহত হয়েছেন। এছাড়াও সুরভি ৭, ফারহান ৪, রাজহংস ৮, মানিক ১১, সুন্দরবন ৭ ও বন্ধন ৫ লঞ্চে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তবে এসব লঞ্চে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
