ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক
পরিচালনা পর্ষদে অচলাবস্থা বহাল
ছবি: যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশের প্রথম প্রজন্মের বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর একটি ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি (ইউসিবি)। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকটি কার্যকর পরিচালনা পর্ষদহীন অবস্থায় রয়েছে। ৬ মাস আগে আবেদন জানানো হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমলে নেয়নি। ফলে ব্যাংকটির নীতিনির্ধারণ, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। প্রশ্নের মুখে পড়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা। নানা রকম শঙ্কায় রয়েছেন ব্যাংকটি আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীরা। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ইচ্ছাকৃত বিলম্ব ও অদৃশ্য প্রভাবের কারণে এই সংকট দীর্ঘায়িত হচ্ছে, যা ব্যাংকিং খাতের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ও ব্যাংকিং বিশ্লেষক ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘পরিচালনা পর্ষদ ছাড়া একটি ব্যাংক কার্যত দিশাহীন হয়ে পড়ে। নীতিনির্ধারণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত সবকিছুই স্থবির হয়ে যায়। এটি শুধু একটি ব্যাংকের সমস্যা নয়, পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।’ তিনি আরও বলেন, ‘নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত ছিল নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন নিশ্চিত করা। দীর্ঘসূত্রতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করে।’
জানা গেছে, এক সময় ইউসিবি নিয়মিতভাবে শেয়ার হোল্ডারদের প্রায় ২০ শতাংশ হারে লভ্যাংশ প্রদান করত। কিন্তু পতিত স্বৈরাচারী সরকারের সময়ে প্রশাসনিক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী আক্তারুজ্জামান এবং এস আলমের হাতে। যারা সম্পর্কে মামা-ভাগনে। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে ব্যাংকটির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে নেন সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার স্ত্রী রুখমিলা জামান। অভিযোগ রয়েছে, এই সময় থেকেই ব্যাংকটিতে পরিকল্পিত লুটপাট, ব্যাপক অর্থ পাচার এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনার চরম অভাব দেখা দেয়। এর ফলে ব্যাংকটির আর্থিক স্বাস্থ্য দ্রুত অবনতির দিকে ধাবিত হয়। এ কারণে ব্যাংকটির উন্নয়নমূলক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে, ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে লভ্যাংশ। ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের মতে, এই অবস্থা ইউসিবির মতো একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকের জন্য হতাশাগ্রস্ত ও নজিরবিহীন।
সূত্র জানায়, স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন পর্ষদ গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে ব্যাংকটিতে স্বতন্ত্র পরিচালকও নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই সময় পর্ষদের পরিচালক নিযুক্ত হন ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের শেয়ার হোল্ডার শরীফ জহীর ও শেয়ার হোল্ডার মো. তানভীর খান। এই ২ জনকে যথাক্রমে ন্যাশনাল ফাইন্যান্স লিমিটেড এবং ইস্টল্যান্ড ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদ হতে পদত্যাগের শর্তে নিয়োগ দেওয়া হয়। এছাড়া স্বতন্ত্র পরিচালক হিসাবে নিয়োগ পান বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মো. সাজ্জাদ হোসেন, অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইউসুফ আলী এবং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ওবায়দুর রহমান।
ওই সময় বলা হয়, অল্প সময়ের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ গঠনের কোনো অগ্রগতি নেই। বর্তমানে পাঁচ সদস্যের বোর্ডে একজন সদস্য অনুপস্থিত থাকলেই সভা বসানো যায় না। ফলে নির্বাহী কমিটিসহ গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ কার্যত বন্ধ। এই অচলাবস্থার মধ্যেই সম্প্রতি ইউসিবি রাইট শেয়ার ইস্যুর ঘোষণা দিয়েছে। অথচ ব্যাংকটির শেয়ারমূল্য ফেস ভ্যালুর নিচে অবস্থান করছে। প্রশ্ন উঠেছে এই পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে ব্যাংকটি আদৌ লভ্যাংশ দিতে পারবে কিনা। ব্যাংকসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, রাইট শেয়ারের আড়ালে আবারও শেয়ার ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে ব্যাংকটিকে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। সাধারণত রাইট শেয়ারে বিনিয়োগ তখনই যৌক্তিক হয়, যখন ব্যাংকটি মার্জার বা অধিগ্রহণের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী ও লাভজনক হওয়ার সক্ষমতা রাখে, কিন্তু ইউসিবির বিদ্যমান বাস্তবতায় তা সম্ভব নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা যায়, গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর পারটেক্স পরিবারের অন্যতম শেয়ার হোল্ডার ও ইউসিবির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শওকত আজিজ রাসেল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের প্রাথমিক শর্ত বাস্তবায়নের দাবি জানান। পরে গভর্নরের কাছে লিখিত আবেদনও জমা দেওয়া হয়।
এতে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে অস্থায়ী সদস্য অন্তর্ভুক্ত করে যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তার জন্য কৃতজ্ঞতা থাকলেও এরপর আর কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় গভর্ন্যান্সে শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এতে আমানতকারী, বিনিয়োগকারী ও সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। চিঠিতে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনগত ক্ষমতার কথা তুলে ধরে দ্রুত পর্ষদ পুনর্গঠনের আহ্বান জানানো হয়।
ইউসিবির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে শওকত আজিজ রাসেল যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি মনে করি, এখানে দুর্নীতি ও লুটপাটের প্রভাব স্পষ্ট। এমনকি দুবাই ও লন্ডনকেন্দ্রিক কিছু স্বার্থের প্রভাবও কাজ করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই অনিশ্চয়তার কারণে জাতীয় নির্বাচনের পর পারটেক্স পরিবার ইউসিবিতে শেয়ার ধরে রাখবে-না কি বিক্রি করবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে।’
ব্যাংক বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন না হলে ইউসিবির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংক আরও গভীর সংকটে পড়বে। যার দায় এড়াতে পারবে না নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও নীতিনির্ধারকরা। একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অচলাবস্থা পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্যই নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে। গত প্রায় দেড় বছরে এমন কী অদৃশ্য চাপ বা প্রভাব কাজ করেছে, যার কারণে একটি ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা সম্ভব হলো না? না-কি নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভেতরেও রয়েছে অদৃশ্য কোনো প্রভাব? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা এখন সময়ের দাবি।
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘ইউসিবির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে আমরা ব্যাংক কোম্পানি আইন ও প্রযোজ্য নীতিমালা মেনে করেছি। ব্যাংকের স্বার্থ, আমানতকারীদের সুরক্ষা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা এই তিনটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই বাংলাদেশ ব্যাংক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোনো ধরনের চাপ বা প্রভাবের বিষয়টি সঠিক নয়।’ তবে এত দীর্ঘ সময়েও কেন পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা সম্ভব হয়নি-সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি তিনি।

