Logo
Logo
×

প্রথম পাতা

এলডিসি উত্তরণে ৩ বছর সময় চেয়েছে সরকার

দুদিকেই প্রস্তুতির পরামর্শ

হামিদ-উজ-জামান

হামিদ-উজ-জামান

প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দুদিকেই প্রস্তুতির পরামর্শ

দায়িত্ব নিয়েই স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা ৩ বছর বাড়ানোর অনুরোধ করেছে নতুন সরকার। বুধবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) অধীন কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) চেয়ারম্যান হোসে অ্যান্তেনিও ওকাম্পোর কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। এতে বলা হয়েছে, সময়সীমা বাড়ানো হলে সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল করা, চলমান সংস্কারগুলো সংহত করা এবং স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজির (এসটিএস) অধীন অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ পাওয়া যাবে।

এছাড়া চিঠিতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরা হয়। বলা হয়, এলডিসি উত্তরণ-প্রস্তুতির সময়কাল ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো প্রয়োজন। আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ হবে চলতি বছরের ২৪ নভেম্বর। চূড়ান্ত উত্তরণের আগে তৃতীয় পর্যালোচনা প্রক্রিয়াও চলমান।

এদিকে এমন চিঠি দিয়ে কতটুকু লাভ হবে? সময় না বাড়লে সমস্যা কী এবং বাড়লেই বা সুবিধা কী। এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। শনিবার তারা যুগান্তরকে বলেন, দুদিকের প্রস্তুতিই রাখতে হবে। তা না হলে একূল-ওকূল দুকূলই হারাতে হতে পারে।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এলডিসি উত্তরণের জন্য ৩ বছর সময় বৃদ্ধির যে আবেদন করা হয়েছে তার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কেননা সরকার যেসব যুক্তি দেখিয়েছে সেগুলোর মধ্যে কোভিড-১৯-এর জন্য তো ২ বছর সময় দিয়েছে আগেই। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি, ট্রাম্প ট্যারিফ, অভ্যন্তরীণ সমস্যা ইত্যাদি কারণে তো এলডিসির মূল্যায়ন সূচকে কোনো পরিবর্তন হয়নি। সূচক পেছায়নি। সরকার বলেছে, এলডিসি উত্তরণের পর যে ধাক্কা আসবে তা সামলানো যাবে না। এক্ষেত্রে প্রশ্ন আসবে এলডিসি উত্তরণের পরও তো ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশে শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত রাখবে। শুধু ওষুধ তৈরিতে ইনটেলেকচ্যুয়াল প্রপার্টি রাইটস প্রযোজ্য হবে। সেক্ষেত্রে ফি দিয়ে ওষুধ তৈরি করতে হবে। তিনি বলেন, আরও প্রশ্ন আসবে লাওস ও নেপাল তো তোমাদের চেয়ে অনেক ছোট দেশ, তারা তো সময় বাড়ানোর আবেদন করেনি। তাহলে তোমরা কেন? ২০১৮ সালেই তো তোমরা জান এলডিসি উত্তরণ কোন বছরে ঘটবে। তাহলে এই ৭-৮ বছরে কেন প্রস্তুতি নেওয়া হলো না। এত সময়েও যা হয়নি আগামী ৩ বছরে তা কি সম্ভব। এসব প্রশ্নের জবাব দেওয়া কঠিন হবে। তাই সময় বৃদ্ধির সম্ভাবনা ক্ষীণ। সরকারের উচিত সময় বাড়বে না ধরেই সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা। শুধু চিঠি দিয়ে বসে থাকলেই হবে না। এতে একূল-ওকূল দুকূলই যেতে পারে। উত্তরণ পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য যা যা করণীয় সেগুলো করতে হবে, পাশাপাশি সময় বাড়ানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

ড. জাহিদ আরও বলেন, ব্যবসায়ীদের চাপে সরকার এই চিঠি দিয়েছে। এক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যাত হলে বলতে পারবে আমরা তো চেষ্টা করেছি। যদি ৩ বছর সময় পাওয়া না যায় অনেক ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক সুবিধা কমবে। রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা বাতিল হয়ে যাবে। আর সময় বাড়লে তখন আস্তে ধীরে প্রস্তুতির সময়টা পাওয়া যাবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, চিঠি দেওয়া ভালো কাজ হয়েছে। কেননা আগামী সপ্তাহে সিডিপির মিটিং আছে। তার আগে এই চিঠি দেওয়াটা খুব দরকার ছিল। তারা এখন মূল্যায়ন করবে। এরপর জুনে ইকোসকের (জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ) সম্মেলন আছে সেখানেও এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে। শেষ পর্যন্ত সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনেও বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে। তবে ক্রাইটেরিয়া দিয়ে আর্গুমেন্ট করলে লাভ হবে না। আমাদের ক্রাইসিস দেখিয়ে বলতে হবে। যেমনটা করে অ্যাঙ্গোলা ও সলোমন দ্বীপপুঞ্জ তাদের এলডিসি উত্তরণ পিছিয়েছিল। আমাদের সরকারকে বলতে হবে ২০২৪ সালের আন্দোলন এবং নতুন সরকার হওয়ায় সংকট রয়েছে। এ অবস্থায় এলডিসি উত্তরণ ঘটলে এসটিএস (স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি) বাস্তবায়ন কঠিন হবে।

তিনি বলেন, তবে ৩ বছর সময় বাড়বে কি বাড়বে না সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে এখনো কিছু বলা যাচ্ছে না। এজন্য সরকারকে যেটা করতে হবে সেটা হলো যদি সময় না বাড়ে সেক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি অব্যাহত রাখতে হবে। অপরদিকে সময় বাড়ানোর জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যখন এটি উঠবে তখন বন্ধু দেশগুলোকে বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলার জন্য বিশেষ অনুরোধ জানাতে হবে। এক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, জাপান, চীন ইত্যাদি দেশগুলো যেন বাংলাদেশের সময় বাড়ানোর পক্ষে মতামত দেয়। সেজন্য শক্ত কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে।

ড. মোস্তাফিজুর আরও বলেন, যদি সময় না বাড়ে তাহলে চলতি বছরের নভেম্বরেই এলডিসি উত্তরণ ঘটবে। তখন রপ্তানিসহ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যে চ্যালেঞ্জ আসবে, তা মোকাবিলা করতে হবে। আর যদি সময় বাড়ানো যায়, তাহলে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আরও কয়েকটি দেশ আমাদের যে ৩ বছরের শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত রাখতে তার সঙ্গে আরও ৩ বছর যোগ হয়ে ৬ বছরের সুবিধা পাওয়া যাবে। এজন্য একদিকে চ্যালেঞ্জ নেওয়ার প্রস্তুতি, অন্যদিকে সময় বাড়াতে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম