Logo
Logo
×
   

প্রথম পাতা

মোহাম্মদপুর-আদাবর

আবারও মাথাচাড়া দিচ্ছে অর্ধশতাধিক কিশোর গ্যাং

ইকবাল হাসান ফরিদ

ইকবাল হাসান ফরিদ

প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

আবারও মাথাচাড়া দিচ্ছে অর্ধশতাধিক কিশোর গ্যাং

রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় ফের সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে অর্ধশতাধিক কিশোর গ্যাং। প্রতীকী ছবি

রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় ফের সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে অর্ধশতাধিক কিশোর গ্যাং। টানা অভিযান, গ্রেফতার আর নজরদারির পর কিছুদিন স্তিমিত থাকলেও সম্প্রতি নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে এসব গ্রুপ। সন্ধ্যা নামলেই বসিলা, রায়েরবাজার, শেখেরটেক, ঢাকা উদ্যান, চাঁদ উদ্যান ও আদাবর এলাকায় দলবদ্ধ কিশোরদের অবস্থান, পথরোধ, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, মোহাম্মদপুর ও আশপাশের এলাকায় সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা ৫০টির বেশি। গ্রুপ-উপগ্রুপ সব মিলিয়ে এদের সদস্যসংখ্যা কয়েক হাজার। গত কয়েক মাসে অভিযানে অনেকে গ্রেফতার হলেও বাকিরা গা ঢাকা দিয়ে গ্যাং পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। আবার কেউ কেউ জামিনে বেরিয়ে এসে সক্রিয় হচ্ছে। পুলিশের দাবি-এসব গ্যাংয়ের তৎপরতা রুখতে টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও তালিকাভুক্ত অপরাধীদের ওপর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে মোহাম্মদপুর ও আদাবরে ৫৫০টি সিসি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সংসদ-সদস্য ববি হাজ্জাজ রোববার বলেছেন, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানো হলে ছিনতাই-চাঁদাবাজি কমবে। রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে কেউ ছাড় পাবে না বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।

গত শনিবার রাতে আদাবরের মনসুরাবাদ এলাকায় ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে দুই এমব্রয়ডারি শ্রমিককে মারধরের অভিযোগ ওঠে কালা রাসেলের নেতৃত্বাধীন এক কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে। বাধা দিলে আবির এমব্রয়ডারি নামে একটি কারখানায় হামলার ঘটনাও ঘটে। এর প্রতিবাদে শ্রমিকরা রাতেই আদাবর থানার সামনে অবস্থান নেন। পরে দায়ের করা মামলায় কথিত ‘কালা রাসেল’ গ্রুপের নেতা কালা রাসেলসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

গত শুক্রবার বিকালে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থান এলাকায় ছিনতাইয়ে বাধা দিলে দুই পুলিশ সদস্যকে ছুরিকাঘাত করে দুর্বৃত্তরা। অস্ত্রের মুখে ঘিরে ধরে ছিনতাইয়ের চেষ্টা চালানো হয়। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায় তারা। ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। এর আগে ১৯ ফেব্রুয়ারি দুপুরে বসিলা সিটি ডেভেলপার্স এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবসায়ী শাহিনের দোকানে চার মোটরসাইকেলে করে আট যুবক গিয়ে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। টাকা না দিলে গুলি করার হুমকি দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, দোকানের এক কর্মচারীকে ইলেকট্রিক শকও দেওয়া হয়। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, এক যুবক বলছে, ‘এই মার্কেট বন্ধ। মালিকরে কইবা, ফারুক কইছে।’ এ ঘটনায় কালা ফারুক নামে এক চাঁদাবাজকে রোববার গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে ফুটপাত থেকে নিয়মিত চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।

ভুক্তভোগীরা জানান, মোহাম্মদপুরে সন্ধ্যা নামলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। বসিলা বেড়িবাঁধ, তিন রাস্তার মোড়, ঢাকা উদ্যান, শেখেরটেক কিংবা রায়েরবাজার-সব জায়গায় একই চিত্র। সন্ধ্যার পর বাইরে বের হওয়া অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ। উঠতি বয়সি কিশোরদের কয়েকটি গ্রুপ প্রকাশ্যেই দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে জড়াচ্ছে। দিনদুপুরেও পথরোধ, মোবাইল ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে।

আদাবরের সুমন শেখ নামে এক কলেজছাত্র জানান, গত মাসে মোটরসাইকেল থেকে নামিয়ে চারজন তাকে ঘিরে ধরে নগদ টাকা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেয়। থানায় অভিযোগ করেননি। তার ভাষায়, পরদিন আবার তো ওই রাস্তায় চলতে হবে।

বসিলা এলাকার রিকশাচালক রমজান আলী বলেন, এখন আর রাতে রিকশা চালাই না। রাতে ১০-১৫ জন একসঙ্গে এসে ঠেক দেয়। যা কামাই করি, সব নিয়ে যায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধের ধরন বদলেছে। আগে নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার, এলাকা নিয়ন্ত্রণ বা মারামারিতেই সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন সাধারণ মানুষই টার্গেট। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয়ের ছায়া ব্যবহার করে ভয়ভীতি দেখানো হয়। ফলে ভুক্তভোগীদের বড় অংশ থানায় যেতে চান না।

‘ডায়মন্ড’ ও ‘ধাক্কা দে’ পার্টি-এই দুই কিশোর গ্যাং দীর্ঘদিন ধরে মোহাম্মদীয়া হাউজিং ও আশপাশের এলাকায় অন্তত ১২টি স্পটে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসাসহ নানা অপকর্ম চালিয়ে আসছে বলে স্থানীয়দের দাবি। অর্ধশতাধিক সদস্যের এই দুই গ্রুপের অনেকেই দিনের বেলায় দৃশ্যমান পেশায় যুক্ত। কেউ রাজমিস্ত্রি, কেউ চা বিক্রেতা, কেউ প্রাইভেটকার চালক। তবে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে তারা ভাগ হয়ে চাপাতি, সামুরাইসহ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নেয়। এই দুই গ্যাংয়ের মাস্টারমাইন্ড জুলফিকার আলী, যিনি কিশোরদের কাছে ‘দাদাভাই’ নামে পরিচিত। তাকে সম্প্রতি র‌্যাব গ্রেফতার করেছিল। পরে জামিনে বেরিয়ে আবার সক্রিয় হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসাসহ অন্তত পাঁচ ধরনের অপরাধে সম্পৃক্ত এ চক্র।

মোহাম্মদপুর তিন রাস্তার মোড়, চাঁদ উদ্যান, লাউতলা, নবীনগর হাউজিং, বসিলা চল্লিশ ফিট, কাঁটাসুর, তুরাগ হাউজিং, আক্কাস নগর, ঢাকা উদ্যান নদীর পাড়, চন্দ্রিমা হাউজিংসহ বিভিন্ন এলাকায় আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অবস্থান নেয় গ্যাং সদস্যরা-এমন অভিযোগ রয়েছে। কখনো নিজেদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে পথচারীদের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের ঘটনাও ঘটছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, কবজি কাটা আনোয়ার গ্রুপ, ডায়মন্ড, এলেক্স, ল ঠেলা, গ্রুপ টুয়েন্টি ফাইভ, স্টারবন্ড, মুরগি গ্রুপ, দে-ধাক্কা, কালা রাসেল, আইডিসি, লাল গ্রুপসহ আরও বহু নামে-বেনামে কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে পাড়া-মহল্লায়। এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের বয়স ১৪ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। দিনে আড্ডা, রাতে ভাগ হয়ে টার্গেট খোঁজা-এটাই এখন নিয়মিত চিত্র।

সাম্প্রতিক সময়ে একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে মোহাম্মদপুর থানার আওতায় ছিনতাইয়ের ১০৮টি স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। সক্রিয় ছিনতাইকারীর তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে ২০৫ জনের নাম।

ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ ইবনে মিজান বলেন, সব ধরনের অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধপ্রবণ এলাকায় নিয়মিত ব্লক রেইড, মোটরবাইক পেট্রোলিং এবং ছিনতাইপ্রবণ এলাকায় চেকপোস্ট কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। তিনি বলেন, কিশোর গ্যাং আগের মতো না থাকলেও বিভিন্ন গ্রুপের সদস্যরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তারা বিভিন্ন অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা করছে। তাদের আইনের আওতায় আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ-অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, বেকারত্ব, মাদক, পারিবারিক নজরদারির অভাব এবং দ্রুত টাকার লোভ কিশোরদের বিপথে ঠেলে দিচ্ছে। শুধু গ্রেফতার নয়, পুনর্বাসন ও সামাজিক উদ্যোগ জরুরি। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সমাজকে সম্পৃক্ত না করলে সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হবে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম