অমর একুশে বইমেলার উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী
দেশটাকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে চায় সরকার
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
অমর একুশে বইমেলার উদ্বোধন শেষে বৃহস্পতিবার স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে স্টল ঘুরে দেখছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। জনগণের প্রতি জবাবদিহিমূলক এ সরকার দেশটাকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে চায়। অমর একুশে বইমেলা কেবল বই বেচাকেনার মেলা নয়, বরং মেলা হয়ে উঠুক শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের সূতিকাগার।’ বৃহস্পতিবার বিকালে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অমর একুশে বইমেলা-২০২৬ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী একটি সমৃদ্ধ, মেধাভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সম্মিলিত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে অমর একুশে বইমেলা-২০২৬ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হয়। এ সময় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান ও মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। অনুষ্ঠানে সুরসপ্তকের শিল্পীরা জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন। এরপর বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ পাঠ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অমর একুশে বইমেলা কেবল বই কেনাবেচার মেলা নয়, এটি আমাদের মেধা ও মননের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বায়ান্নর ভাষা শহীদদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করেই আজকের এ মেলা। ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে জনগণের ভোটে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার দেশটাকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে চায়।’
এবারের মেলা নির্ধারিত সময়ের কিছুটা পরে শুরু হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দেশের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিয়মের কিছুটা ব্যত্যয় ঘটলেও বইমেলার আবেদন বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি। এটি আমাদের মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের এক অবিনাশী স্মারক।’
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বই পড়ার গুরুত্বের ওপর বিশেষ জোর দেন। জার্মান দার্শনিক মার্কুইস সিসেরোর উক্তি উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘বই ছাড়া ঘর আত্মা ছাড়া দেহের মতো। বিজ্ঞানীদের মতে, বই পড়া মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে নতুন সংযোগ তৈরি করে এবং স্মৃতিশক্তি বাড়ায়। অথচ বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট আসক্তি তরুণ প্রজন্মকে বইবিমুখ করে তুলছে। স্ক্রিনে পড়ার চেয়ে কাগজের পাতায় কালো অক্ষরে জ্ঞানের গভীরতা উপভোগ করার আবেদন অনন্য।’
আন্তর্জাতিক জরিপের উদ্ধৃতি দিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১০২টি দেশের পাঠাভ্যাস জরিপে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭তম। আমাদের নাগরিকরা বছরে গড়ে মাত্র তিনটি বই পড়েন। এ চিত্র আমাদের পালটাতে হবে। মেলা যেন শুধু উৎসব না হয়ে আমাদের বইপ্রেমী করে তোলে, এটাই প্রত্যাশা।’
বাংলা একাডেমিকে ভবিষ্যতের জন্য দিকনির্দেশনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অমর একুশে বইমেলাকে আগামীতে ‘আন্তর্জাতিক বইমেলা’ হিসাবে আয়োজনের বিবেচনা করতে হবে। এর ফলে আমরা বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে পরিচিত হতে পারব। পাশাপাশি জাতিসংঘে বাংলাকে দাপ্তরিক ভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা আমরা অব্যাহত রাখব।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির মননের প্রতীক বাংলা একাডেমি আমাদের তরুণ-তরুণীদের মেধা ও মনন বিকাশের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন মেয়াদি গবেষণাবৃত্তি, তরুণ লেখক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজন। এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে উত্তর-প্রজন্মকে বাংলা ভাষা ও দেশজ সংস্কৃতির মূলধারার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারিত হবে, ইনশাআল্লাহ।’
তিনি বইমেলাকে কেবল ঢাকাকেন্দ্রিক না রেখে সারা বছর দেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা ও উপজেলায় ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান। এ বিষয়ে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় সব ধরনের সহযোগিতা করবে বলে তিনি আশ্বাস দেন। তরুণ প্রজন্মের মেধা বিকাশে বাংলা একাডেমির গবেষণাবৃত্তি এবং তরুণ লেখক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আরও সম্প্রসারিত করার নির্দেশনাও দেন তিনি।
বক্তব্যের শেষে প্রধানমন্ত্রী দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একটি নিরাপদ, মানবিক ও সমৃদ্ধ ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যে দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করেন। এরপর তিনি ফিতা কেটে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন এবং বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন।
অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক, মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজমসহ কবি-সাহিত্যিক, শিল্পী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকবে মেলা : অনেক জল্পনা-কল্পনার পর অবশেষে বহুলপ্রতীক্ষিত অমর একুশে বইমেলা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো। বৃহস্পতিবার দুপুরে বাংলা একাডেমিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বইমেলার উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের পর সাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয় বইমেলার ফটক। মেলা ঘিরে পুরো এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এর দায়িত্বে আছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্য নিয়ে এবারের বইমেলার যাত্রা শুরু। মেলা চলবে ১৫ মার্চ পর্যন্ত। এ সময় ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকবে মেলা। ছুটির দিন বইমেলা চলবে বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত।
শিল্পী ফেরদৌস আরার পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সুরসপ্তক’-এর শিল্পীদের সম্মিলিত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত এবং ভাষার গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে মহান ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। বিশেষ অতিথি হিসাবে বক্তব্য দেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এমপি এবং প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এমপি। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মফিদুর রহমান এবং বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি মো. রেজাউল করিম বাদশা। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক।
অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে অবশেষে শুরু হচ্ছে অমর একুশে বইমেলা ২০২৬। আমরা আশা করি, সবার সহযোগিতায় জাতির মননের প্রতীক বাংলা একাডেমি আয়োজিত এবারের বইমেলা উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হবে।
মেলা : উদ্বোধনের পর মেলা ঘুরে দেখা যায়, এখনো অনেক প্রকাশক স্টল সাজানোর কাজ করছেন। আবার কেউ কেউ বই বিক্রির জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করেছেন। আশা করা যাচ্ছে, আজ (শুক্রবার) থেকে পাঠক ও লেখকের ভিড় শুরু হবে। শুক্রবার মেলা শুরু হবে বেলা ১১টায় এবং শেষ হবে রাত ৯টায়। বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মেলায় থাকবে শিশুপ্রহর। সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে বইমেলা প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে বইমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতার প্রাথমিক পর্ব। বিকাল ৩টায় বইমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে স্মরণ : ফরিদা পারভীন শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন মোহাম্মদ রোমেল। আলোচনায় অংশ নেবেন ড. আবু ইসহাক হোসেন। সভাপতিত্ব করবেন কবি ও দার্শনিক ফরহাদ মজহার। বিকাল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
