রমজানুল মুবারক
ত্যাগের মহিমায় আলোকিত হওয়ার সময় এখন
পীর মাওলানা আব্দুর রহীম ইসলামাবাদী
প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আজ দশ রমজান। সময়ের পাখা মেলে রহমতের প্রথম দশক নীরবে বিদায় নিল। রহমত, বরকত আর মাগফিরাতের স্রোতধারায় স্নাত হওয়ার যে পবিত্র আহ্বান নিয়ে মাহে রমজান আমাদের দ্বারে এসেছিল, তার এক অধ্যায় শেষ হলো আজ। মাসের শুরুতে যে অঙ্গীকারে আমরা হৃদয় উন্মুক্ত করেছিলাম-আত্মশুদ্ধি, আত্মসংযম, আত্মসংশোধন ও ত্যাগের দীপ্ত চেতনায় আজ সে অঙ্গীকারের আয়নায় নিজেকে দেখার সময়।
আমরা কি সত্যিই বদলাতে পেরেছি? আমাদের সিয়াম কি শুধু ক্ষুধা-পিপাসার নাম, নাকি তা আত্মাকে আলোকিত করেছে? রহমতের ঝরনাধারায় আমরা কতটুকু ভিজেছি? আত্মসমালোচনার চর্চা না থাকলে মানুষ নিজের আমল নিয়েই আত্মতৃপ্তির মায়াজালে বন্দি হয়ে পড়ে। আর আত্মতৃপ্তি ধীরে ধীরে উদাসীনতায় রূপ নেয়; উদাসীনতা এক সময় আমলকে শূন্য করে দেয়। এ প্রসঙ্গে মুহাম্মদ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘অনেক রোজাদার আছে, যাদের রোজা থেকে প্রাপ্তি শুধু ক্ষুধা ও তৃষ্ণা; আর অনেক তাহাজ্জুদগুজার আছে, যাদের অর্জন শুধু রাতজাগা।’ (মিশকাতুল মাসাবিহ)। ‘ওই ব্যক্তির নাক ধূলিধূসরিত হোক, যে রমজান পেল এবং তার গুনাহ মাফ করার আগেই তা বিদায় নিল।’ (সুনানে তিরমিজি-৩৫৪৫)।
রমজান শুধু উপবাসের মাস নয়; এটি ইবাদতের মহাসমুদ্র। এ মাসে আল্লাহর রহমত এমনভাবে নেমে আসে যে, বান্দার পাপরাশি খড়কুটোর মতো ভেসে যায়। তাওবা-ইস্তিগফার, কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া-দরুদ, নফল নামাজ সব মিলিয়ে রমজান হয়ে ওঠে নৈকট্যের সোপান। হাদিসে এসেছে, এ মাসে নফল ইবাদতের সওয়াব অন্য মাসের ফরজের সমতুল্য। অর্থাৎ রমজান বান্দার জন্য বাড়তি প্রাপ্তির সুবর্ণ সুযোগ। যেমন একজন কর্মচারী নির্ধারিত দায়িত্বের বাইরে আন্তরিকতা দেখালে ধীরে ধীরে কর্তার প্রিয় হয়ে ওঠে, তেমনি ফরজের পর নফল ইবাদতে মনোনিবেশ করলে বান্দা হয়ে ওঠে প্রভুর নিকটবর্তী।
নবীজি (সা.) আরও বলেছেন, রমজানে আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেন, তাদের গুনাহ ক্ষমা করেন, দোয়া কবুল করেন এবং নেক কাজে অগ্রগামীদের নিয়ে ফেরেশতাদের সামনে গর্ব করেন। সুতরাং এ মাসে সৎকর্মে প্রতিযোগিতা করা, ভালো কাজে অগ্রসর হওয়া এটাই মুমিনের শোভা। যারা রমজানের মর্যাদা অনুধাবন করে, তারা এ মাসকে জীবনের মোড় ঘোরানোর উপলক্ষ্য বানায়। পক্ষান্তরে যারা উদাসীন, অজুহাতে রোজা ত্যাগ করে কিংবা প্রকাশ্যে অশোভন আচরণে লিপ্ত হয়, তারা নিজেদেরই বঞ্চিত করে। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি বৈধ কারণ ছাড়া রমজানের একটি রোজাও ইচ্ছাকৃতভাবে ভঙ্গ করে, সারা জীবন রোজা রাখলেও তার পূর্ণ ক্ষতিপূরণ হবে না। (তিরমিজি)।
আল্লাহতায়ালা কুরআনুল কারিমে ঘোষণা করেন, ‘তিনি মানুষের জন্য যে রহমত উন্মুক্ত করেন, কেউ তা রুদ্ধ করতে পারে না; আর তিনি যা রুদ্ধ করেন, কেউ তা উন্মুক্ত করতে পারে না।’ (সূরা ফাতির : ২)।
রমজানের প্রথম দশক পেরিয়ে আমরা এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সামনে মাগফিরাত ও নাজাতের সুবর্ণ অধ্যায় অপেক্ষমাণ। এ সময়টুকু যদি আমরা সচেতনভাবে কাজে লাগাই, তবে এ রমজান আমাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। আসুন, আত্মজিজ্ঞাসাকে সঙ্গী করি; গাফিলতি ঝেড়ে ফেলি; ইবাদতে গভীরভাবে মনোযোগী হই। আল্লাহর দরবারে বিনয়াবনত হয়ে বলি, হে প্রভু, আমাদের রোজা কবুল করুন, গুনাহ মাফ করুন, অন্তরকে তাকওয়ার আলোয় উদ্ভাসিত করুন। রমজান যেন শুধু একটি মাস না হয়; হয়ে উঠুক আমাদের চরিত্র, চেতনা ও চিরস্থায়ী পরিবর্তনের সূচনা। আমিন।
সভাপতি : জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ
