সরকারের প্রতি বিশ্লেষকদের পরামর্শ
শুরুটা দারুণ তবুও সতর্ক থাকতে হবে
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের শুরুর পথ চলাটা দারুণ হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, বিশাল ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেওয়ার আগেই তারেক রহমান নিজে বিরোধীপক্ষের শীর্ষ নেতাদের বাসায় গিয়ে সাক্ষাৎ করেছেন। দেশের রাজনীতিতে এটি অত্যন্ত ভালো উদাহরণ। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব নেওয়ার পরেই তার সময়ানুবর্তিতা, ছুটির দিনে অফিস করা, প্রটোকল ছাড়া চলাচলসহ নানা পদক্ষেপ সর্বমহলে প্রশংসা কুড়িয়েছে। এছাড়া নতুন সরকার শুরু থেকেই তাদের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিয়েছে। ইতোমধ্যে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড এবং খাল খননসহ অন্যান্য নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেও জোর কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
তবে একই সঙ্গে বাংলাদেশের বাস্তবতায় নতুন সরকারের পথচলা যে খুব সহজ নয়, সেই বিষয়টিও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ইতোমধ্যেই দু-চারটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে গেছে। যেমন, বাংলাদেশ ব্যাংকে মব সৃষ্টির ঘটনা, বাংলা একাডেমির পুরস্কার নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এবং নরসিংদীতে ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় বাবার কাছ থেকে অপহরণের পর এক কিশোরীকে হত্যার ঘটনা সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও এর কোনোটির সঙ্গে সরকার সরাসরি জড়িত নয়। তথাপি শেষ হিসাব-নিকাশে কাঠগড়ায় যেন সরকারকেই দাঁড়াতে হচ্ছে। এছাড়া ইতোমধ্যে দু-একজন মন্ত্রী ও নেতার অতিকথন নিয়েও বেশ আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। ফলে সরকারকে সামনের দিনে আরও সতর্কতার সঙ্গে পথ চলতে হবে। এখনই হতাশ হওয়ার মতো কিছু হয়নি মনে করলেও বিশ্লেষকদের পরামর্শ-সরকারের প্রতিটি বিষয়ে খুব সাবধানে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ নতুন সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও সাবেক রাষ্ট্রদূত ড. আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, নতুন সরকারের পথচলার মাত্র ১০ দিন হলো। এখনই তো আর মূল্যায়ন করার সময় হয়নি। তবে আমি প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দিতে চাই, কারণ তিনি শুরুটা দারুণ করেছেন। তিনি সময়ানুবর্তিতার একটা ভালো নজির স্থাপন করছেন। এর আগে নির্বাচিত হওয়ার পর নিজেই বিরোধীপক্ষের শীর্ষ নেতাদের বাসায় গিয়ে সাক্ষাৎ করেছেন। এই আন্তরিকতা আমাদের দেশের রাজনীতিতে একটা ভালো উদাহরণ। এগুলো থেকে বোঝা যায়, তিনি দেশ, মানুষ ও গণতন্ত্রের জন্য ভালো কিছু করতে চান।
তিনি আরও বলেন, তবে সরকার তো একটা বড় জায়গা। সব সময় সব কিছু হয়তো প্রধানমন্ত্রীর নজরে রাখা সম্ভব হবে না। দায়টা কিন্তু তার ওপরই পড়বে। ফলে আমি মনে করি, নতুন সরকারের যে সুন্দর একটি যাত্রা শুরু হয়েছে, সেখানে সামনের দিনে আরও সতর্কতার সঙ্গে পথ চলতে হবে। কারণ ইতোমধ্যে দু-চারটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে গেছে। যেমন বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘটনা। তবে ১৮ কোটি মানুষের দেশে সব কিছু হয়তো মুহূর্তেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। কিন্তু ধীরে ধীরে সব ঠিক করতেই হবে। কারণ এই সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক। অতএব তাকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হবে।
তারেক রহমান অত্যন্ত প্রতিকূল সময়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন বলে দেশের রাজনীতিতে আলোচনা আছে। তাছাড়া তিনি মানুষকে এক ধরনের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। মানুষ তাকে বিশ্বাসও করেছে। তবে একই সঙ্গে দেশে এখন অত্যন্ত শক্তিশালী একটি বিরোধী দল রয়েছে; যারা সংসদের ভেতরে ও বাইরে সোচ্চার থেকে বিএনপি সরকারের সমালোচনায় মুখর থাকবে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সরকার গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা দেবে। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি ছাড়াও বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ এখন নীরব থাকলেও ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে বিএনপিকে ছাড় দেবে না। সব মিলিয়ে তিনটি রাজনৈতিক শক্তিকে মোকাবিলার পাশাপাশি গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সমালোচনা সামাল দিয়ে টিকে থাকতে হবে নতুন সরকারকে। ফলে কেন্দ্রে কেবল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একক ইতিবাচক সিদ্ধান্তে সব কিছু সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। একই পথে চলতে হবে মন্ত্রী-এমপিসহ বিএনপির প্রতিটি নেতাকর্মীকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলামও মনে করেন, নতুন সরকারের শুরুটা খুবই ভালো হয়েছে। মানুষ যেভাবে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়েছে সেটাও খুবই ইতিবাচক। তিনি যুগান্তরকে বলেন, এমনকি নির্বাচনের আগেও কিন্তু তাকে মানুষ খুব ভালোভাবে নিয়েছে। সব মিলিয়ে শুরুটা খুব ভালো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এখন দু-একটি বিতর্কিত ঘটনাও ঘটেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘটনা নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। আবার বাংলা একাডেমির যে ঘটনা, সেখানে যদি সিদ্ধান্তটা আগে থেকেই ভালো করে নেওয়া যেত, তাহলে হয়তো এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হতো না। আবার নরসিংদীতে যেটা হয়েছে; ফলে এসব ছোট ছোট ঘটনা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করবে। তবে সরকার তো অনেক বড় জায়গা। মাত্র ১০ দিনের মতো শেষ হলো। আরও কিছুদিন গেলে আমরা হয়তো বুঝতে পারব। তবে আমরা মনে করি, নতুন সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা। ফলে প্রতিটি বিষয়ে খুব সাবধানে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ের গবেষক আলতাফ পারভেজ যুগান্তরকে বলেন, সরকারকে অন্তত ছয় মাস দেখতেই হবে। কারণ অনেক বছর পর একটি নির্বাচিত সরকার এসেছে। এই সরকারের প্রধান ১৭ বছর দেশের বাইরে ছিলেন। ফলে এই সরকারকে একটু সময় দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, অন্যদিকে সরকারেরও আস্তে আস্তে কাজে হাত দেওয়া উচিত। কারণ বাংলাদেশ খুব সহজ জায়গা নয়। দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজ এবং প্রশাসন। যে কোনো কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গেলে তো এই মানুষের ওপর নির্ভর করেই করতে হয়। ফলে দু-চারজন রাজনীতিবিদ চাইলেও দেশকে ঠিকভাবে পরিচালনা করা অনেক কঠিন। সেক্ষেত্রে তাদের আরও সময় দিতে হবে।
আলতাফ পারভেজ বলেন, কৃষিঋণ মওকুফসহ শুরুতেই সরকারের বেশ কিছু ভালো কাজ হয়েছে। কৃষিকে গুরুত্ব দেওয়া অবশ্যই ইতিবাচক দিক। একই সঙ্গে বীজ, কীটনাশক ও সার-এই তিনটি বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, আবার বাংলা একাডেমি পুরস্কারকে কেন্দ্র করে যে ঘটনা ঘটেছে কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের যে ঘটনা; এগুলো স্বাভাবিক নয়। ফলে সরকারের আরও সতর্ক হওয়া উচিত এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হওয়া উচিত। আমাদের সমাজে অতীতের যে রাজনৈতিক কালচার বা অতীতের সরকারগুলো যেসব ভুল করেছে সেগুলো থেকে মুক্ত থাকা উচিত। বিএনপিসহ মিত্রদের ২১২ জন এমপি আছেন। আরও অভিজ্ঞ ও দক্ষ মানুষ আছেন। আমি মনে করি তাদের অবশ্যই কাজে লাগানো যেতে পারে।
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মুহাম্মদ নুরুল হুদা যুগান্তরকে বলেন, সরকার একটি বড় জায়গা, এখানে সব সময় সব কিছু ঠিক থাকবে, এমনটা ভাবা উচিত নয়। ভালো কাজ হবে, কিছু মন্দ কাজও হবে। কারণ তারা তো আমাদের মতোই মানুষ। ভুলভ্রান্তি আমাদের যেমন হয়, তাদেরও তেমন কিছু ভুলভ্রান্তি হবে। দেখতে হবে সেখান থেকে আমরা শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে ভালো করতে পারি কি না? আমি আশা করব-ভুল করলে সেখান থেকে শিক্ষা নেবেন, যেন ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে। ফলে আমি মনে করি না, এখনই হতাশ হওয়ার মতো কিছু আছে।

