যুগান্তরকে ববিতা
নারীরা এখন দেশ গড়ার কারিগর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম ফরিদা আক্তার ববিতা। সত্তরের দশক থেকে তিনি বাংলা সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকের হৃদয়ে বিশেষ জায়গা করে নেন। সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা ‘অশনি সংকেত’-এ অভিনয় করে তিনি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসা পান। ক্যারিয়ারে অসংখ্য জনপ্রিয় সিনেমায় কাজ করেছেন। ১৯৭৫ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রবর্তনের পর টানা তিনবার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পান ববিতা। ২০১৬ সালে ভূষিত হন আজীবন সম্মাননায়। চলতি বছর পেয়েছেন রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক। ববিতা শুধু একজন অভিনেত্রী নন, তিনি বাংলাদেশের সিনেমার স্বর্ণযুগের এক কিংবদন্তী। তার অভিনয়শৈলী আজও নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের অনুপ্রেরণা জোগায়। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষ্যে দিনটি নিয়ে তার ভাবনা, নিজের জীবনের নারীকেন্দ্রিক কিছু না বলা কথা ব্যক্ত করেছেন যুগান্তরের সঙ্গে। ববিতা বলেছেন, নারীরা এখন দেশ গড়ার কারিগর। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এফ আই দীপু।
নারী দিবস আপনার কাছে কী অর্থ বহন করে?
বিশ্ব নারী দিবসে পৃথিবীর সব নারীর প্রতি আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। অবশ্যই নারী দিবস আমার কাছে বিশেষ অর্থ বহন করে। কারণ নারীদেরকে নিয়েইতো সবকিছু। নারী কখনো মা, কখনো স্ত্রী, কখনো বোন, কখনো সন্তান, কখনো সহকর্মী, আবার কখনো অভিভাবক। একজন নারীই পারে একটি সংসার, একটি সমাজকে সুন্দরভাবে পরিচালিত করতে, হোক তা সামনে কিংবা নেপথ্যে থেকে। একটি বিশেষ দিনে নারীদের স্মরণ করা বা দিনটিকে বিশেষভাবে উদযাপন করাও নারীদের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা প্রদর্শন বলে আমার কাছে মনে হয়।
আপনার জীবনে কোন নারী সবচেয়ে বেশি প্রেরণা জুগিয়েছেন?
আমার জীবনে আমার মা-ই সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। যতদূর জানি, আমার মা যশোহর থেকে ট্রেনে করে কলকাতা যেতেন লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজে পড়াশোনা করতে। বিয়ের পর তিনি সংসারের হাল ধরেন। আমার মা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তিনি আবৃত্তি করতেন। এককথায়, তিনি শুধুই যে সংসার নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন এমন নয়। আরও বহুবিধ কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। আমাদের বলতেন, শুধু পড়াশোনা করলেই চলবে না। নাচ, গান, আবৃত্তিতেও নিজেদের পারদর্শী হতে হবে। সেই মায়ের অনুপ্রেরণাতেই আমি আজকের ববিতা।
একজন নারী হিসাবে আপনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?
জীবনে যা-ই করি সফল হতে হবে, যে কাজই করি সেটি দিয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে যেতে হবে, এটাই ছিল আমার জীবনের বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য নিজেকে সেভাবেই গড়ে তুলেছি। প্রয়াত শ্রদ্ধেয় শহীদ জহির রায়হান ভাই আমাকে অভিনয় জীবনের শুরুতেই যে সাহস, অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলেন, সেটাই যেন আমাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে ভীষণ অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল। জীবনে চলার পথে নানান প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছি। সবকিছুই একে একে সামলে নিয়েছি। জীবনে চ্যালেঞ্জ একেক সময় একেকভাবে এসেছে। সব মোকাবিলা করতে পেরেছি, আলহামদুলিল্লাহ।
বিনোদন জগতে নারীদের জন্য কাজের পরিবেশ কতটা পরিবর্তিত হয়েছে বলে মনে করেন?
সত্যি বলতে কী, আমি শেষবার যে সিনেমায় অভিনয় করেছি সেই সময় পর্যন্ত কিন্তু নারীদের কাজের পরিবেশ ছিল যথেষ্ট অনুকূলে। পরিবেশ বলতে আমি এটাই বলব, একজন নারী শিল্পীকে যথাযথ সম্মান দিয়ে ঠিকঠাকভাবে কাজ আদায় করে নেওয়া। এটা আমি আমার অভিনয় জীবনের শুরু থেকেই পেয়ে এসেছি। পরবর্তীতে বিগত এক দশকেরও বেশি সময়ে তার আরও পরিবর্তন হয়েছে কী না জানি না।
কর্মক্ষেত্রে কখনও কি জেন্ডার বৈষম্যের শিকার হয়েছেন? হলে সেটি কীভাবে মোকাবিলা করেছেন?
না, আমি কখনো এ ধরনের বৈষম্যের শিকার হইনি। আমাকে পুরো ইন্ডাস্ট্রির মানুষ ভীষণ সম্মান করতেন, আমাকে নিরাপদেই রাখতেন। যে কারণে জীবনে কখনো কোনো ঝামেলার মাঝেও পড়িনি।
একজন অভিনেত্রীর জন্য সিনেমায় নারীকেন্দ্রিক গল্পে অভিনয় করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন?
আমি নিজেও নারীকেন্দ্রিক বেশ কয়েকটি সিনেমাতে অভিনয় করেছি। যেমন-বীরাঙ্গনা সখিনা, লেডি স্মাগলার, প্রিয়তমা, বাদী থেকে বেগম, আলো তুমি আলেয়া, বন্দিনী, গোলাপি এখন ট্রেনে, সুন্দরী, চম্পা চামেলী, আনারকলি, নতুন বউ, বিরাজ বৌ, ঘরের লক্ষ্মী ইত্যাদি। এসব সিনেমার গল্প নারীকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছে। একজন নায়িকা বা অভিনেত্রী সিনেমায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করার স্বপ্ন দেখেন এ কারণে যে, তাকে দেখার আগ্রহ নিয়েই দর্শক প্রেক্ষাগৃহে যাবেন। সব নায়িকার মনেই এ ইচ্ছে থাকে। আবার একজন নারীশিল্পীর অভিনয়ে স্বতঃস্ফূর্ততা ও দক্ষতা দেখানোর ক্ষেত্রেও নারীকেন্দ্রিক সিনেমাগুলো বিশেষ অর্থ বহন করে। এই ধরনের সিনেমা একজন নায়িকাকে অন্যান্য নায়িকার চেয়ে বিশেষভাবে আলাদাও করে। যেমনটা ভারতেও বেশ কয়েকজন নায়িকা এই ধরনের সিনেমাতে অভিনয় করে আলোচিত।
বর্তমান সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন কতটা এগিয়েছে বলে মনে করেন?
নারীদের ক্ষমতায়ন অনেক অনেক এগিয়েছে বলেই আমি মনে করি। কী করছে না নারীরা! তারা বিমান চালাচ্ছে, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিচ্ছে, উদ্যোক্তা হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে নারীরাই সংসারের হাল ধরছে। নারীরা এখন দেশ গড়ার কারিগর, কেউ এমপি, কেউ মন্ত্রী অর্থাৎ সমাজ বিনির্মাণে কাজ করছে। নারীরা তাদের মেধা, যোগ্যতা ও শ্রম দিয়ে নিজেদের ক্ষমতায়নকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।
তরুণ প্রজন্মের মেয়েদের জন্য আপনার কী বার্তা থাকবে?
শুধু এতটুকুই বলবো, গ্লোবালাইজেশনের এই যুগে নিজেকে শুধু পড়াশোনার মাঝেই সীমাবদ্ধ করে রাখলে চলবে না। পড়াশোনার পাশাপাশি সবকিছুই করতে হবে। নিজেকে সমৃদ্ধ করতে হবে। নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, নিজের পরিবারের সম্মানের প্রতি খেয়াল রেখে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। সমাজ-সংসারের কথা ভেবে নিজেকে নিরাপদে রেখেই প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। পড়াশোনা শেষেও যদি সংসারই করতে হয় সেখানেও একজন নারীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। একটি সংসারকে সঠিকভাবে পরিচালনা করাও অনেক বড় কাজ।
সোশ্যাল মিডিয়ায় নারীদের প্রতি বিদ্বেষ বা ট্রোলিং নিয়ে আপনার মতামত কী?
যেহেতু আমি সোশ্যাল মিডিয়ায় নেই, তাই এই বিষয়ে আসলে আমার বলারও তেমন কিছু নেই। তবে যে কোনো ধরনের মিডিয়ায় নারীদের প্রতি বিদ্বেষ বা ট্রোলিং এটা একটি অসুস্থ মানসিকতারই লক্ষণ বলে আমি মনে করি।
ভবিষ্যতে নারী অধিকার বা সচেতনতা নিয়ে কাজ করার কোনো পরিকল্পনা আছে কি?
এই সময়ে এসে আসলে এ ধরনের কোনো পরিকল্পনা নেই। কারণ এর আগে এ ধরনের অনেক কাজ করেছি আমি দেশে-বিদেশে। তবে ভবিষ্যতের কথাতো আর বলা যায় না। যদি করি তখন সবাই জানতে পারবেন।
নারী দিবসে বিশেষ কোনো উদ্যোগে যুক্ত আছেন?
নারী দিবসে এখনো কোনো বিশেষ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত নই। তবে যে কোনো সময় হয়েও যেতে পারি। আসলে একজন নারী হিসাবে প্রতিনিয়তই কিন্তু কোনো না কোনোভাবে সমাজের প্রতি, সমাজের মানুষের প্রতি আমি-আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করছি। প্রত্যেক ঘরে ঘরে নারীরা যদি ঠিকঠাকভাবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করে যায়, তাহলেই সমাজ-সংসার এবং সর্বোপরি রাষ্ট্র সুন্দরভাবে পরিচালিত হবে।

