Logo
Logo
×

প্রথম পাতা

জনপ্রত্যাশার সংসদীয় রাজনীতি

উত্তাপ সংযমে নবযাত্রা

শেখ মামুনুর রশীদ

শেখ মামুনুর রশীদ

প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

উত্তাপ সংযমে নবযাত্রা

সংসদীয় রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে জাতীয় সংসদ। এটিই সংসদীয় গণতন্ত্রের শর্ত ও সৌন্দর্য। সাধারণ ভোটারসহ দেশের প্রতিটি মানুষ প্রত্যাশা করে-জাতীয় সংসদ হবে তার আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং অধিকার বাস্তবায়নের প্রধান কেন্দ্র। সংসদে দাঁড়িয়ে জনপ্রতিনিধি তথা সংসদ-সদস্যরা জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষাসহ নিজ নিজ সংসদীয় এলাকার জনগণের পক্ষে কথা বলবেন। যেখানে সরকারি দলের পাশে সক্রিয় থাকবে শক্তিশালী বিরোধী দলও। জনগণের স্বার্থে সব পক্ষই যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে সংসদকে প্রাণবন্ত রাখবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার দেশের কোটি কোটি মানুষ টিভি পর্দায় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঠিক তাদের স্বপ্নের সেই সংসদ প্রত্যক্ষ করল। সংসদীয় রীতিনীতি মেনে প্রতিবাদ হয়েছে, একপর্যায়ে বেশ উত্তাপও ছড়ায়, প্রতিবাদে বিরোধী জোট ওয়াকআউটও করে। কিন্তু বিপরীতে সবাই ছিলেন সংযত। একে-অপরকে প্রাপ্য সম্মান দিয়ে কথা বলেছেন। 

এদিকে এই সংসদ যে কোনো গতানুগতিক সংসদ নয়, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে তারা নির্বাচিত হয়ে এখানে আসতে পেরেছেন, সেই কৃতজ্ঞতাবোধ ছিল প্রত্যেক সংসদ-সদস্যের মুখে। এজন্য ফ্যাসিবাদের হাত থেকে দেশ এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে সবাই শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। এসব বিবেচনায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে এই দিনটিকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেন। এককথায় সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যদি মূল্যায়ন করা হয়, তাহলে বলতে হবে-জনপ্রত্যাশার জাতীয় সংসদ বৃহস্পতিবার দিনভর ছিল বেশ জমজমাট। যেখানে উত্তাপের পাশাপাশি সবার মধ্যে সংযম ছিল, কথা বলার মধ্যে ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও পরিমিতিবোধ। এমন একটি দিনের জন্য ১৭-১৮ বছর ধরে সবাই অপেক্ষা করছিল। 

জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, এবারের অধিবেশন প্রথম দিনেই দেশবাসীকে একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। অতীতে সরকার ও বিরোধী দল ছিল একাকার। কে সরকারি দল, আর কে বিরোধী দল, তা বোঝা যেত না। এবার কিন্তু সরকারি দলকে জবাবদিহি করতে হবে। বিরোধী দলও কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। ফলে সত্যিকারার্থে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রে রূপ নেবে জাতীয় সংসদ। প্রথম দিনেই এমন আভাস মিলেছে। 

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় স্পিকারের আসন ফাঁকা রেখেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের কার্যক্রম শুরু হয়। বিগত সংসদের স্পিকার লাপাত্তা থেকেই পদত্যাগ করেন। ডেপুটি স্পিকার একাধিক মামলায় অভিযুক্ত হয়ে এখন কারাগারে। এরকম পরিস্থিতিতে সংসদ সচিব কানিজ মাওলার পরিচালনায় বেলা ১১টা ৫ মিনিটে শুরু হয় পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত। এর আগে সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে সংসদ অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন সংসদনেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ-সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তাকে অভিনন্দন জানান। জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই প্রথম সংসদ-সদস্য হিসাবে প্রবেশ করেন। বিরোধী দলের নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানও এবারই প্রথম সংসদে পা রেখেছেন। ১১টা ৫ মিনিটে কুরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। এরপর সূচনা বক্তব্য দেন সংসদনেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে আত্মত্যাগ করা সব শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। সমবেদনা জানান আহতদের প্রতিও। তারেক রহমান বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন। স্বৈরাচার বা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে তিনি কখনো আপস করেননি। এ সময় তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।

এরপর অধিবেশন পরিচালনার জন্য বর্ষীয়ান রাজনীতিক, পাঁচবারের সংসদ-সদস্য এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম প্রস্তাব করেন সংসদনেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় তিনি বলেন, জাতীয় সংসদকে জাতীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু না করে বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট সরকার অকার্যকর করে ফেলেছিল। আমরা এই মহান জাতীয় সংসদকে সব যুক্তিতর্ক আর জাতীয় সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চাই। দেশে আজ থেকে আবারও কাঙ্ক্ষিত সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে উল্লেখ করে তিনি সুখী, সমৃদ্ধ ও নিরাপদ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সবার সহযোগিতা কামনা করেন। সংসদনেতা তারেক রহমান বলেন, আমাদের দল, মত কিংবা কর্মসূচি ভিন্ন হতে পারে; কিন্তু তাঁবেদার ও ফ্যাসিবাদমুক্ত একটি স্বাধীন-সার্বভৌম নিরাপদ স্বনির্ভর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় আমাদের মধ্যে কোনো বিরোধ থাকতে পারে না, বিরোধ নেই। 

এদিকে সংসদনেতার প্রস্তাবে সমর্থন জানান বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এরপর বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে দলটির নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সংসদের সভাপতি হিসাবে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বক্তব্য দেন। পরে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর অধিবেশন ৩০ মিনিটের জন্য মুলতুবি রাখা হয়। এ সময়ে প্রথমে নবনির্বাচিত স্পিকার এবং পরে ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এরপর মন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন টাঙ্গাইল-৮ আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ-সদস্য অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান। জাতীয় সংসদের নবম তলায় অবস্থিত রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে এই শপথ গ্রহণ পর্বটি অনুষ্ঠিত হয়। 

বিরতির মধ্যে শপথ নিয়ে স্পিকারের আসনে বসে দিনের কার্যক্রম শুরু করেন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এ সময় নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে অভিনন্দন জানিয়ে বক্তব্য দেন সংসদনেতা তারেক রহমান, বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমানসহ সরকার এবং বিরোধী দলের বেশ কয়েকজন সংসদ-সদস্য। পরে দিনের পরবর্তী কার্যক্রম শুরুর আগে দেওয়া স্বাগত বক্তব্যে স্পিকার বলেন, সরকার এবং বিরোধী দল উভয়ে জাতির স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করি। বিরোধী দল যাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে, সেজন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকব। ইতোমধ্যে নিরপেক্ষতার খাতিরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির পদ থেকে তিনি পদত্যাগ করেছেন বলে জানান। 

এরপর স্পিকার পাঁচ সদস্যের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মনোনয়ন দেন। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অবর্তমানে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে তারা অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন। এছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান, সংসদ-সদস্য, জুলাই আন্দোলনে শহীদসহ বিশিষ্টজনের সম্মানে শোকপ্রস্তাব উত্থাপন করেন স্পিকার। এ সময় আলোচনাপর্ব অনুষ্ঠিত হয়। সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা আলোচনায় অংশ নেন। এরপর এক মিনিট নীরবতা পালন, দোয়া ও মোনাজাত শেষে প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিতে গ্রহণ করা হয়। দোয়া পরিচালনা করেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ। এরপর বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপন এবং পাঁচটি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়। 

প্রথম দিনের অধিবেশনের শেষদিকে সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ ঘিরে প্রতিবাদ জানিয়ে ওয়াকআউট করেন জামায়াত জোটের সংসদ-সদস্যরা। বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে বক্তব্যের জন্য রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের অধিবেশন কক্ষে প্রবেশের ঘোষণা দেওয়া হলে জামায়াত জোটের সংসদ-সদস্যরা আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান। এ সময় তারা ‘জুলাইয়ের সাথে গাদ্দারি চলবে না’ লেখা লাল রঙের প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন। সংসদ কক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রবেশ করলে প্রচলিত রীতিতে সংসদনেতা ও সরকারি দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানান। তবে বিরোধী দলের সদস্যদের একটি অংশ প্রতিবাদের অংশ হিসাবে নিজেদের আসনে বসে থাকেন। এ সময় বিউগলে জাতীয় সংগীত বাজতে শুরু করলে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সংসদের কর্মকর্তারা জাতীয় সংগীতের প্রতি সম্মান জানিয়ে সদস্যদের দাঁড়ানোর অনুরোধ করেন। তখন কেউ কেউ দাঁড়ালেও কয়েকজন সদস্য বসে ছিলেন। এর মধ্যে রাষ্ট্রপতি সংসদে তার ভাষণ শুরু করলে বিরোধী দলের সদস্যরা উচ্চৈঃস্বরে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। একপর্যায়ে তারা স্লোগান দিতে দিতে অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন। এর আগে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদ-সদস্যদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়া সংবিধান অনুযায়ী একটি বাধ্যবাধকতা। আমরা সংবিধানের বিধান ও জাতীয় সংসদের রেওয়াজ অনুসরণ করতে চাই। দয়া করে আপনারা খারাপ কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন না।’


Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম