Logo
Logo
×
   

প্রথম পাতা

সম্পদ উদ্ধার ও টাকা ফেরাতে উদ্যোগ

পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা হবে বিদেশে

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা হবে বিদেশে

দেশ থেকে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারে ফৌজদারি ও দেওয়ানি কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ফৌজদারি ও দেওয়ানি আইনের আওতায় এই কার্যক্রম চলবে। পাচার করা সম্পদের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সেই তথ্যের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সংস্থাগুলোর মাধ্যমে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এর মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাইয়ের পাশাপাশি দালিলিক প্রমাণ সংগ্রহ করা হবে। এসব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেলেই কেবল ফৌজদারি ও দেওয়ানি কার্যক্রমের শেষ ধাপে দেশে ও বিদেশে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। ইতোমধ্যে দেশের ভেতরে বহুবিদ তদন্তের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে মামলা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখনও কোনো মামলা হয়নি। তবে বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত পরিচালনা ও তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে পাচার করা সম্পদ জব্দের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার হয়েছে। এর পরিমাণ প্রায় পাঁচ লাখ কোটি টাকা হতে পারে। এসব টাকা ফেরাতে এখন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

সূত্র জানায়, পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনতে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছিল। এর অংশ হিসাবে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন বেসরকারি খাত বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো গ্রুপের নামে যুক্তরাজ্যে থাকা বেশ কিছু সম্পদ জব্দ করা হয়। দেশেও সাইফুজ্জামান চৌধুরীর নামে ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে প্রকৃত তথ্য গোপন করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। রপ্তানির বিল দেশে না এনে পাচার করা বেশ কিছু সম্পদ কঠোর তদারকির মাধ্যমে দেশে আনা হয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে পাচার করা টাকা ফেরানোর কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে পাচার করা টাকা ফেরানোর কার্যক্রমকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসাবে চিহ্নিত করে। পাচার করা সম্পদ ফেরানোর টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান এ নিয়ে বিস্তর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তার গৃহীত বহুবিদ পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে-পাচার করা সম্পদ ফেরাতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ফৌজদারি ও দেওয়ানি কার্যক্রম শুরু করা, বিদেশে তদন্ত পরিচালনা ও আইনি লড়াই চালাতে সম্পদ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকে পাচার করা সম্পদ ফেরানোর কার্যক্রমে যুক্ত করা, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরিচালনা পর্ষদকে এ কাজের জন্য সম্পূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া, টাকা পাচারের সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে ছয়টি গ্রুপকে চিহ্নিত করে এদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে দেওয়ানি কার্যক্রম শুরু করা এবং এর শেষ ধাপে তাদের বিরুদ্ধে পাচারকারী দেশে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পর শীর্ষ পাচারকারীদের শতাধিক ঘটনা নিয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ে কাজ শুরু করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই কাজে তথ্য সংগ্রহ, তদন্ত পরিচালনা ও বিদেশে মামলা করার জন্য আন্তর্জাতিক অ্যাসেট রিকভারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তি করতে বলা হয়েছে ব্যাংকগুলোকে। যেসব ব্যাংক থেকে টাকা পাচার হয়েছে ওইসব ব্যাংক এসব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে খেলাপি ঋণের তথ্য দিতে শুরু করেছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে পাচার করা অর্থ সম্পর্কে অনুসন্ধান করছে সংস্থাগুলো। এসবের পাশাপাশি টাকা পাচারকারীদের বিষয়ে নতুন করে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হবে।

এ লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটকে (বিএফআইইউ) নির্দেশনা দিয়েছেন। এর মধ্যে ব্যাংকগুলোকে বলা হয়েছে, প্রতিটি পাচারের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অ্যাসেট রিকভারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তি করতে। ইতোমধ্যে বেসরকারি খাতের ১০টি ব্যাংক ৯টি আন্তর্জাতিক অ্যাসেট রিকভারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৩৬টি ঘটনার বিষয়ে চুক্তি করেছে। টাকা পাচারের ওই ৩৬টি ঘটনার তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এ চুক্তির আওতায় পাচার করা টাকা উদ্ধারের অর্থ থেকে নির্ধারিত হারে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কমিশন দেওয়া হবে। কোনো নগদ অর্থ নেওয়া হবে না। এ জন্য লিটিগেশন ফান্ড ও সাপোর্ট (পাচার করা সম্পদ ফেরাতে অর্থ ও কারিগরি সহায়তা) দিচ্ছে এমন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও চুক্তি করতে বলা হয়েছে ব্যাংকগুলোকে। অন্তর্বর্তী সরকার ১০ কোটি ডলারের একটি লিটিগেশন ফান্ড গঠেনের উদ্যোগ নিয়েছিল। সে লক্ষ্যে সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একাধিক বৈঠকও করেছিলেন। সেই কার্যক্রমকে এগিয়ে নেওয়া হবে।

যেসব ব্যাংক থেকে টাকা পাচার হয়েছে ওইসব ব্যাংককে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে টাকা পাচারের বিষয়ে তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলো এসব খাতে খেলাপি ঋণের তথ্য দিতে শুরু করেছে। এসব তথ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো পাচারের তথ্য অনুসন্ধান করছে।

এছাড়া বিএফআইইউ টাকা পাচারকারীদের বিষয়ে আন্তর্জাতিকভাবে নানা উৎস থেকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করছে। পাচারের তথ্য পাওয়া গেলে অফিশিয়ালি তথ্য চাওয়া হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় টাকা পাচারের অনেক তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি। সেসব তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সিআইডিকে দেওয়া হচ্ছে। তারা আরও তদন্ত করে দেশে মামলা করছে। এসব মামলায় পাচারকারীদের শনাক্ত করা হলেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মামলা করা সহজ হবে।

পাচার করা টাকা ফেরাতে বাংলাদেশ সরকার যে দেশে টাকা পাচার হয়েছে সে দেশের সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। এতে সরকারিভাবে তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে বিদেশে সম্পদ তৈরিতে মানিলন্ডারিংয়ের ঘটনা বা ফৌজদারি অপরাধ হিসাবে শনাক্ত করতে পারলেই সংশ্লিষ্ট দেশও পাচারের সম্পদের বিষয়ে পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর আলোকেই যুক্তরাজ্যে দুটি গ্রুপের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। আর ব্যাংকগুলোকে বলা হয়েছে, পাচার করা সম্পদ ফেরাতে দেওয়ানি কার্যক্রম শুরু করতে। এতে সম্পদের ওপর ব্যাংকের অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে এবং ফেরানো সহজ হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পরামর্শ অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব পদক্ষেপ নিচ্ছে।

পাচার করা টাকা ফেরানোর কার্যক্রমে ব্যাংকগুলোকে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এ কাজে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে বলা হয়েছে।

শীর্ষ খেলাপি ও টাকা পাচারের দায়ে ইতোমধ্যে প্রথম পর্যায়ের কাজের অংশ হিসাবে ছয়টি গ্রুপকে শনাক্ত করা হয়েছে। এদের বিরুদ্ধে দেওয়ানি কার্যক্রমের শেষ পর্যায়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মামলা করা হবে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .