Logo
Logo
×
   

প্রথম পাতা

রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা

ওয়ান-ইলেভেনের ক্ষমতাধর কুশীলবরা কে কোথায়?

তারিকুল ইসলাম

তারিকুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ওয়ান-ইলেভেনের ক্ষমতাধর কুশীলবরা কে কোথায়?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ওয়ান-ইলেভেন একটি বিতর্কিত অধ্যায় বলে বিবেচিত। হঠাৎ ক্ষমতাধর হয়ে উঠা কয়েকজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী সামরিক কর্মকর্তা এবং তাদের বেসামরিক সহযোগীর নিয়ন্ত্রণে ওই সময় দেশ পরিচালিত হয়েছে। ক্ষমতা, রাজনীতি ও অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ ছিল তাদের হাতে। সেই সময়ে শুদ্ধি অভিযানের নামে দেশজুড়ে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা এবং ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার ও হয়রানি করা হয়। অবৈধভাবে অর্থ আদায়সহ কতিপয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তখন নানা গুরুতর অভিযোগ ওঠে। ওই দুই বছরে দেশজুড়ে ভয়ের রাজত্ব কায়েম করে সেই কুশীলবরা দাপুটে সময় পার করেছেন। বলতে গেলে তাদের কথায়ই তখন চলেছে সবকিছু। কিন্তু সময়ের বাঁক বদলে তারাই বহু বছর ধরে আড়ালে। সেই আমলের প্রতাপশালী বিতর্কিত সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেফতারের পর নতুন করে এখন আলোচনা উঠছে, কোথায় আছেন ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ রাজনৈতিক অঙ্গনেও তাদের নিয়ে ফের আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।

অবশ্য তাদের বিরুদ্ধে এত অভিযোগের পরও কাউকেই দেশের কোনো আইনি প্রক্রিয়া মোকাবিলা করতে হয়নি। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। নির্বাসিত জীবন পার করছেন তারা। বেশির ভাগ পর্যবেক্ষকের ধারণা, আইনি ঝামেলা থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখার জন্য তারা প্রবাস জীবন বেছে নিয়েছেন।

প্রায় ১৯ বছর আগে বহুল আলোচিত ওয়ান-ইলেভেনের সময় প্রভাবশালী সেনা কর্মকর্তা হিসাবে আলোচিত লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে সোমবার রাতে বারিধারার বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। তবে সিন্ডিকেট করে ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও মানব পাচারের অভিযোগে রাজধানীর পল্টন মডেল থানার এক মামলায় তাকে গ্রেফতার করে ডিবি। তাকে গ্রেফতারের পর বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু মঙ্গলবার তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় লিখেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানকে ধন্যবাদ। ১/১১-তে গণতন্ত্র হত্যাকারীদের গ্রেফতার শুরু করার জন্য।’

সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ এবং ওই সময়ের সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদসহ নেপথ্যের নায়করা কোথায় আছেন, কী করছেন, তা নিয়ে জানার আগ্রহ সবার। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে সংঘটিত রাজনৈতিক পরিবর্তন ‘ওয়ান-ইলেভেন’ নামে পরিচিত। সেনাবাহিনীর সমর্থনে ওই সময় গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হয়েছিলেন ফখরুদ্দীন আহমদ। তবে ক্ষমতার মূল কেন্দ্রে ছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে-মামলা, তদন্তসহ সব ঝামেলা এড়াতেই নির্বাসিত জীবন বেছে নিয়েছেন ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবরা। সেই সময়কার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ নাগরিকত্ব নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন যুক্তরাষ্ট্রে। এক-এগারোর প্রধান কুশীলব তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদও আছেন যুক্তরাষ্ট্রে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি লড়ছেন ক্যানসারের সঙ্গে। অনেকটা ব্যতিক্রম ছিলেন গ্রেফতার হওয়া মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। এক-এগারোর পর ৬ বছর রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছেন। এরপর দেশে ফিরে তিনি ঢাকায় রেস্তোরাঁ পরিচালনাসহ একাধিক ব্যবসায় যুক্ত হন। দুদফায় (২০১৮ ও ২০২৪) ফেনী-৩ আসনের (সোনাগাজী-দাগনভূঞা) সংসদ-সদস্য ছিলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে সামরিক অ্যাটাশে হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার আরেক আলোচিত কর্মকর্তা ব্রি. জে. (অব.) চৌধুরী ফজলুল বারী। গণতান্ত্রিক সরকারের জমানায় এক-এগারোর ঘটনাবলীর তদন্তের প্রয়োজনে তাকে ডাকা হলেও আর দেশে ফেরেননি। এরপর থেকেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে। সেই সময়ের আলোচিত ও বিতর্কিত আরেক সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা এটিএম আমিন আছেন দুবাইয়ে। একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি।

২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ড. ফখরুদ্দীন আহমদ কিছুদিন দেশেই ছিলেন। তিনি ঘোষণাও দিয়েছিলেন দেশে থাকবেন। প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার পর তার নিরাপত্তাও দিয়েছিল সরকার। বসবাস করতেন সরকারের দেওয়া বাড়িতেই। কিন্তু ওই বছরের মে মাসে খবর প্রকাশ হয়-ড. ফখরুদ্দীনকে সংসদীয় কমিটিতে তলব করা হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে উঠা বিভিন্ন অভিযোগ তদন্ত হবে। এর পরই সরকারি বাড়ি ছেড়ে তিনি পরিবার নিয়ে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটির নাগরিক হওয়ার সুবাদে বাড়ি কেনেন মেরিল্যান্ড স্টেটের পটোম্যাকে। সেখানে তার দুটি বাড়ির একটিতে তিনি পরিবার নিয়ে থাকেন। আর অন্য বাড়িতে থাকে তার মেয়ের পরিবার। দীর্ঘদিন থেকে তিনি সেখানে অবস্থান করলেও বাংলাদেশি কমিউনিটিকে তিনি এড়িয়ে চলছেন।

এক-এগারোর সময়কার সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ অবসর নেন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের মাঝামাঝিতে। ওই বছরের ১৪ জুন তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। প্রথমে ফ্লোরিডায় ছোট ভাই ও ছেলের কাছে থাকতেন। পরে তার ‘মালটিপল মাইলোনা’ ক্যানসার ধরা পড়ে। চিকিৎসার জন্য আগে ঘন ঘন নিউইয়র্কে যাতায়াত করলেও এখন পারতপক্ষে তিনি সেখানে যাচ্ছেন না। মইন ইউ আহমেদ এখন ফ্লোরিডার পামবিচে থাকেন। একান্ত ঘনিষ্ঠজন ছাড়া কারও সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হয় না তার। প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হন কম।

এক-এগারোর সময়ে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন ব্রি. জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন। পরে তাকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরও প্রভাবশালী এ কর্মকর্তা তার পদেই ছিলেন। অবসরের আগে আনসারের মহাপরিচালক পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তাকে। ২০০৯ সালের ১৭ মে সব আর্থিক সুবিধাসহ সেনাবাহিনী থেকে অবসরে যান তিনি। পরে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পরিচয়ে দেশত্যাগ করেন। একটি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে তিনি দুবাইয়ে অবস্থান করছেন। সেখানে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ করেন তিনি। দেশ ছাড়ার পর আমিন আর ফিরে আসেননি। বিভিন্ন সূত্রমতে, তিনি এবং ওই সময়ে ডিজিএফআইয়ের আরেক ক্ষমতাধর কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) সাঈদ জোয়ার্দার দুবাই-কানাডা যাওয়া-আসার মধ্যে আছেন। ওয়ান-ইলেভেনের সময়ের আরেক আলোচিত সামরিক কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল চৌধুরী ফজলুল বারী অবস্থান করছেন যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ সময়ে ব্রিগেডিয়ার বারী ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশ দূতাবাসে সামরিক অ্যাটাশের চাকরি নিয়ে দেশত্যাগ করেছিলেন। পরে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে তাকে দেশে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হলেও তিনি আর ফিরে আসেননি। এখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।

লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরী এক-এগারোর সরকারের সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ে রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ এবং একের পর এক মামলা করে আলোচনায় ছিল দুর্নীতি দমন কমিশন। পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন দুদক চেয়ারম্যান হাসান মশহুদ।

সমালোচনার মুখে ২০০৯ সালের ২ এপ্রিলে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি। এরপর থেকেই লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা। জানা গেছে, এরপর কিছুদিন তিনি ঢাকার ডিওএইচএসের বাসাতেই ছিলেন। তবে এখন কোথায় আছেন তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম