প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ফারাক বিশাল
জাতীয় স্মৃতিসৌধ। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
এ দেশের সাধারণ জনগণই ছিল প্রতিটি বিজয়ের মূল কারিগর। কিন্তু প্রতিবারই প্রকৃত কারিগরদের দূরে রেখে অল্পসংখ্যক লোকের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে। দুষ্টু শক্তি দেশে চালু করেছে লুটপাটের অর্থনীতি। ফলে বেড়েছে বেকারত্ব ও দারিদ্র্য। মুদ্রাস্ফীতি চরম আকার ধারণ করেছে। শিক্ষাক্ষেত্রে আমরা প্রচণ্ড পিছিয়ে পড়েছি। যে কারণে মহান স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর এসেও প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির বিশাল ফারাক রয়ে গেছে বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষক ও রাজনীতিকরা। তারা বলছেন, স্বাধীনতার ঘোষণায় ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার-এ তিনটির কোনোটিই অর্জিত হয়নি। বরং নানা ধরনের অন্যায়-অবিচার হয়েছে। তবে সবকিছুর পরও এখনো হতাশ হতে চান না এই রাজনীতি বিশ্লেষক ও রাজনীতিকরা। তারা মনে করেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের বিদায়ের পর ১২ ফেব্রুয়ারি একটা ভালো নির্বাচন হয়েছে। এখন সবাইকেই আন্তরিক হতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ জনগণ আরও বেশি সচেতন ও সংগঠিত হতে পারলেই প্রকৃত বিজয় অর্জন করা সম্ভব।
অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতি বিশ্লেষক ড. মাহবুব উল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছরের ইতিহাসে প্রাপ্তির সঙ্গে প্রত্যাশার ফারাক বিশাল। আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণায় ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার-এই তিনটির কোনোটিই বাংলাদেশে অর্জিত হয়নি। সাম্যের বদলে অসাম্য তীব্র আকার ধারণ করেছে। ধনী ও গরিবের শ্রেণি পার্থক্য বিশাল আকার ধারণ করেছে; যা বিপজ্জনক মাত্রায় চলে গেছে। এটা চলতে থাকলে সমাজের ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে যাবে। এছাড়া গণতন্ত্রের কথা বলে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। আর বাংলাদেশ হওয়ার পর আমাদের গণতন্ত্র হচ্ছে ভোট ডাকাতি, বিরোধী দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না দেওয়া এবং একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া। চারটি সংবাদপত্র রেখে বাকি সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। রক্ষীবাহিনীর জুলুম, অত্যাচার, হত্যাকাণ্ড ছিল। এই ধারাবাহিকতায় শেখ হাসিনার সময়েও বাংলাদেশে গুম-খুন হয়েছে। তিনি আরও বলেন, শিক্ষাক্ষেত্রে আমরা প্রচণ্ড পিছিয়ে পড়েছি। হাসপাতালগুলোয় নানারকম বিশৃঙ্খলা রয়েই গেছে। বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। চার কোটি মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। মুদ্রাস্ফীতি একটা বড় সমস্যা। এখন আবার ইরান যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ফলে সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে। এই হলো বাংলাদেশের অবস্থা। তিনি বলেন, এখন একটা বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফ্যাসিস্ট সরকার বিদায় নিয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি একটা ভালো নির্বাচন হয়েছে। এখন সবাইকেই আন্তরিক হতে হবে। সবাই আন্তরিক না হলে এবং এই বিষয়গুলোয় মনোযোগ না দিলে এগুলো থেকে উদ্ধার পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হবে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম যুগান্তরকে বলেন, ইতিহাসে দেখতে পাই আমাদের প্রতিটি বিজয়ের মূল কারিগর ছিল জনগণ। কিন্তু প্রতিবারই প্রকৃত কারিগরদের দূরে রেখে অল্পসংখ্যক লোকের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে। আর এই দুষ্টু শক্তি দেশে লুটপাটের অর্থনীতি চালু করে। এভাবেই চলছে দিনের পর দিন। লড়াই করে বিজয় আনে জনগণ; কিন্তু ফসল তোলার দায়িত্ব নিয়েছে সেই দুষ্টু শক্তি। ফলে আমরা দেখেছি, সরকারের পরিবর্তন হয়েছে; কিন্তু মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। এগুলো থেকে উত্তরণের একটাই উপায় আছে। আমাদের সব বিজয়ের যারা মূল কারিগর, সেই সাধারণ মানুষকে রাষ্ট্র পরিচালনায় সরাসরি যুক্ত হতে হবে। তাদের শুধু সার্টিফিকেট দিলেই হবে না, তারা শুধু পার্লামেন্টে দুটো লোক পাঠাবে না, তাদের আরও বেশি সচেতন ও সংগঠিত হতে হবে। এটা করতে পারলেই আমাদের প্রকৃত বিজয় অর্জন করা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, আমি মনে করি, আমাদের মধ্যে এই উপলব্ধি বাড়ছে। ফলে আমি আশাবাদী, আমরা সফল হব। যদিও পরিস্থিতি দেখে মনে হতে পারে যে রোদনভরা বসন্ত। কিন্তু এই বসন্তের নির্মাতা এ দেশের জনগণ। ফলে হয়তো বেশকিছু গুরুতর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, আমাদের এই স্বাধীনতা অমর এবং এর মূল কারিগর এ দেশের জনগণ। তারা বারবার ত্যাগ স্বীকার করেছে এবং পরীক্ষা দিয়েছে। ফলে আমি নিরাশ হতে চাই না।
জানতে চাইলে সাংবাদিক, শিক্ষক ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক আফসান চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, প্রত্যাশার সঙ্গে একাত্তর সালের ইতিহাসের সম্পর্ক নেই। আমরা যে প্রত্যাশাগুলো করি, সেগুলো করি রাষ্ট্রের কাছে। আর আমাদের রাষ্ট্র তো কোনোদিন সফল হয়নি। ১৯৭১ সালে রাষ্ট্রের ওপর ১০ ভাগ মানুষ নির্ভর করত অর্থনীতির জন্য। ২০২৬ সালে এসে সেটা ১৫ ভাগ হয়েছে। ৫০-৫৫ বছরে যে রাষ্ট্র মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে না, সেখানে আমাদের প্রত্যাশা করাটাই তো ভুল। আমাদের ইতিহাস হচ্ছে সমাজের ইতিহাস, সাধারণ মানুষের ইতিহাস। সাধারণ মানুষ কি রাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে? করে না। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের কোনো সরকার সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারের পরিবর্তন আনতে পারেনি। যতটুকু পরিবর্তন হয়েছে, তা মানুষের নিজের চেষ্টায়। এদেশের মানুষ প্রধানত নিজের ওপর নির্ভরশীল। আর যা আছে সব কথার কথা।
জানতে চাইলে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না যুগান্তরকে বলেন, আমরা আমাদের দারিদ্র্য দূর করব কীভাবে, বেকারদের চাকরি দেব কীভাবে, সোশ্যাল সেফটি নেটওয়ার্ক বাড়াব কীভাবে-একেবারে দৈনন্দিন জীবন-জীবিকার সঙ্গে যুক্ত এরকম অনেক প্রশ্ন আমাদের সংস্কারচিন্তার মধ্যেই নেই। আমাদের সংস্কার তো হচ্ছে ‘কনস্টিটিউশনাল ফান্ডামেন্টাল রাইটস’। সেখানে আমরা ঐকমত্য হতে পারছি না। এখন যদি বলেন, ৫৫ বছরে কী পেলাম? ৫৫ বছর তো ধারাবাহিক সংগ্রামের নয়। ২০২৪ সালে একটা পার্থক্যের সূচনা হয়েছিল। এখন মানুষ গুণগত পরিবর্তন চাইছে। কিন্তু সেটার দিকে আমরা এখনো নজর দিতে পারিনি। এখনো আমরা জাতীয় সংগীতের সময় দাঁড়াচ্ছি কি না, সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেব কি না-সেটাতেই আটকে আছি। এর মানে হলো, এখনো আমরা মূল সমস্যার মধ্যে না ঢুকে বহিরাঙ্গের বিষয়গুলোতেই আটকে আছি। তিনি আরও বলেন, এখানে কমবেশি সবারই ব্যর্থতা আছে, এটা মানতেই হবে। এখানে আমাদের অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি গড়ে তুলতে হবে। আর সেখানে মূল দায়িত্ব যারা চালকের আসনে থাকেন, অর্থাৎ যারা ক্ষমতায় থাকেন তাদের।

