বিরোধী দলের আন্দোলন
কৌশলে মোকাবিলা করবে বিএনপি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় ঐক্যের আন্দোলনকে এখনো ততটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে না ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। তাই এ প্রশ্নে পালটাপালটি বা কঠোর অবস্থানে না গিয়ে বিষয়টি ‘কৌশলে’ মোকাবিলা করার পক্ষে দলটি। বিশেষ করে বাদ পড়া ১৬টি অধ্যাদেশ সংসদে আবার উপস্থাপন করে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার পূরণ করে জনমনে দলের ইতিবাচক অবস্থানও স্পষ্ট করবে বিএনপি। দলটি মনে করে, ১৬টি অধ্যাদেশ নিয়ে মাঠ গরম করে বিরোধী দলগুলো পক্ষান্তরে বিএনপির জনপ্রিয়তা কমাতে চায়। তাই যাচাই-বাছাই শেষে এ সংক্রান্ত বিল সংসদে এনে জনগণের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
সরকারি দলের নেতারা বলছেন, যেসব অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করা হয়নি, সেগুলো অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজনে উপস্থাপন করা হয়নি। কিন্তু কিছু মহল সরকার এসব ‘অধ্যাদেশ বাদ দিয়েছে’ বলে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। বিএনপির অবস্থান হচ্ছে, যে জুলাই সনদে দল সই করেছে, তা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে। তবে খাল খনন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ জনকল্যাণে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি সরকার যখন বাস্তবায়ন শুরু করেছে, তখন কর্মসূচি দেওয়া দুরভিসন্ধিমূলক। জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হলে তা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিহত করতে হবে-এমন আলোচনাও আছে বিএনপিতে। একই সঙ্গে বিরোধী দলের আন্দোলন নিয়ে ইতোমধ্যে নেতাকর্মীদের সজাগ ও সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
একাধিক বিএনপি নেতা যুগান্তরকে বলেন, জনমনে আলোচনায় থাকার জন্য বিরোধী দল হিসাবে জামায়াতসহ ১১ দলীয় ঐক্য আন্দোলন করবে এটি স্বাভাবিক। কেউ কেউ একে রুটিন কাজ বলেও মনে করেন। তবে এ নিয়ে পালটা কোনো কর্মসূচির কথাও ভাবছে না বিএনপি। তাদের মতে, যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলসহ দেশে নানা সংকট সৃষ্টি হচ্ছে, যা একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এর জন্য সরকার দায়ী নয়। বিএনপি নেতারা আশা করেন, বিরোধীদলীয় নেতারাও এক সময় উপলব্ধি করবেন যে, এই মুহূর্তে এমন কোনো কিছু করা উচিত নয়, যা জনগণ অপছন্দ করবে। কারণ বিএনপি ইতোমধ্যে পরিষ্কার করেছে, যে জুলাই সনদে সই করেছে, তা বাস্তবায়ন করা হবে। এটি দলের অঙ্গীকার। গণভোট নিয়েও বিএনপি ব্যাখ্যা দিয়েছে। তারপরও এই ইস্যু মাঠে নিয়ে যাওয়া জনগণকে বিভ্রান্ত করা ছাড়া আর কিছু নয় বলে মনে করেন বিএনপি নেতারা।
জানতে চাইলে বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স যুগান্তরকে বলেন, এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সুস্পষ্ট বক্তব্য রেখেছেন। একটি মহল জুলাই সনদ এবং গণভোট নিয়ে যে কথাগুলো বলছে তা দুরভিসন্ধিমূলক। তারা রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার জন্য অহেতুক বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বক্তব্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চাইছে। এটা কখনোই সফল হবে না। জনগণ অত্যন্ত সচেতন। তিনি বলেন, আমরাও স্বচ্ছতার সঙ্গে এ নিয়ে এগোচ্ছি। আমরা স্পষ্টত বলছি, সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় যে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছি, সেই সনদের প্রতিটা লাইন অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করব। এটা নিয়ে পানি ঘোলা করার কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি না।
তিনি আরও বলেন, জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য যেসব কর্মসূচি নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষণা করা হয়েছিল, সেগুলো আমরা বাস্তবায়ন শুরু করেছি। এগুলোর পথে যদি কেউ কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, জনগণকে নিয়ে সেগুলো মোকাবিলা করব।
সরকার গঠনের পর ৪ এপ্রিল বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকেও বিরোধী দলের আন্দোলনের বিষয়টি আলোচনা হয়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা যুগান্তরকে জানান, সরকার গঠনের পর থেকে বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড কিছুটা স্থবির হয়ে আছে। এজন্য শিগগিরই দলকে গতিশীল করার নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। উদ্যোগের অংশ হিসাবে বিএনপির সাংগঠনিক দায়িত্বে থাকা নেতাদের নিয়ে বৈঠক করা হবে। সেই বৈঠকেই বিরোধী দলের আন্দোলন প্রসঙ্গে দলের অবস্থানের বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে।
এ প্রসঙ্গে মঙ্গলবার টাঙ্গাইলে এক সমাবেশে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস সনদ সই করার জন্য যখন ডেকেছিলেন, সবচেয়ে প্রথমে বিএনপি গিয়েছিল। বিএনপি জুলাই সনদ সই করে এসেছে। সেই জুলাই সনদের প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি লাইন আমরা বাস্তবায়ন করব।’
জনগণকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘যারা খাল খনন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকের কার্ড, পেশাদার খেলোয়াড় তৈরিসহ জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করবে, বিএনপি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তাদের প্রতিহত করবে। কাজেই সবাইকে সজাগ থাকতে হবে; সতর্ক থাকতে হবে। স্বৈরাচারের ভূত কাদের ওপর আবার ফিরে ফিরে আসর করছে, কারা আবার দেশে অরাজকতা তৈরি করতে চাচ্ছে-এই প্রশ্নও রাখেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান।
এর আগে রোববার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে যে ১৬টি অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করা হয়নি, সেগুলো অধিকতর যাচাই-বাছাই প্রয়োজন। কিন্তু কিছু মহল সরকার এসব ‘অধ্যাদেশ বাদ দিয়েছে’ বলে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তার মতে, আইনগুলোর প্রস্তাবনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও অনেকে তা উপেক্ষা করছেন। এ বিষয়ে বিভ্রান্তি না ছড়ানোর আহ্বানও জানান তিনি।
একই সংবাদ সম্মেলনে গণভোটের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এটা ঘটনাক্রমে সিদ্ধ। অধ্যাদেশ জারি হয়েছে গণভোট অধ্যাদেশ। গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সেটার বৈধতা আছে।’
গণভোট নিয়ে বিরোধী দলের আন্দোলনের হুমকি প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এটা তো ফ্যাক্টাম ভ্যালেট, এটা ঘটনাক্রমে সিদ্ধ। অধ্যাদেশ জারি হয়েছে গণভোট অধ্যাদেশ। গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সেটার বৈধতা আছে। সুতরাং এটা বিরোধী দলের হুমকি দেওয়ার কোনো বিষয় নেই। এটার বৈধতা তো আছেই। অবৈধ তো বলছি না।’

