Logo
Logo
×
   

প্রথম পাতা

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর

খুলছে বহুমাত্রিক সম্ভাবনার দুয়ার

তারিকুল ইসলাম

তারিকুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

খুলছে বহুমাত্রিক সম্ভাবনার দুয়ার

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফাইল ছবি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়ায় রাষ্ট্রীয় সফর দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক অধ্যায় এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে বলে মনে করেন দেশটিতে অবস্থানরত প্রবাসীরা। তারা জানান, এই সফরের মধ্য দিয়ে বহুমাত্রিক সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলেছে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, মুক্তবাণিজ্য চুক্তি হলে আমদানি শুল্ক কমে আসবে, বাড়বে রপ্তানি। বাংলাদেশ থেকে যদি ৩ হাজার বা ৪ হাজার দক্ষতাসম্পন্ন মানুষ আসে, তাতে রেমিট্যান্স অনেক বেড়ে যাবে। দ্রুত শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ারও আশা তাদের। শিক্ষাবিদরা মনে করেন, শিক্ষা সহযোগিতা, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অংশীদারত্ব, যৌথ গবেষণা এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় গুরুত্ব অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এছাড়া তরুণ আইটি ও ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র্যাজুয়েটদের জন্য আন্তর্জাতিকমানের দক্ষতা অর্জন, নতুন কর্মসংস্থানের বিশাল সুযোগ সৃষ্টি হবে জানিয়েছেন আইটি বিশেষজ্ঞরা। প্রধানমন্ত্রীর দুই দিনের (২১ ও ২২ জুন) রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একান্ত বৈঠক এবং পরে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ছাড়াও দেশটির ছয়টি বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। এ সময় সংস্কৃতিবিষয়ক সমঝোতা স্মারক সই, সন্ত্রাসবাদ দমন বিষয়ে গবেষণাসক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতাসংক্রান্ত দলিল এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত একটি দ্বিপক্ষীয় দলিল বিনিময় হয়। এছাড়া বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক বিষয়ে সহযোগিতা জোরদারের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সম্মত হয় বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া। পাশাপাশি আরসিইপিতে (রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ) যোগদান এবং আসিয়ানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা জোরদারে বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে মালয়েশিয়া।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (বিএমসিসিআই) সভাপতি মো. আনোয়ার শহীদ যুগান্তরকে বলেন, সাংস্কৃতিক বিষয়ের ওপর সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। সবচেয়ে বড় যেটা, বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়ার একটি মুক্তবাণিজ্য চুক্তি হওয়ার ব্যাপারে আগে থেকেই আলোচনা চলছে। এক-দুই বছরের মধ্যে এটা হয়ে যাবে। আমাদের এখন বাণিজ্য মাত্র ৩ বিলিয়ন ডলারের এবং ১০ শতাংশ এক্সপোর্ট। এ কারণে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি হলে অনেক সুবিধা থাকবে।

তিনি বলেন, আমরা মালয়েশিয়া চেম্বার থেকে চেষ্টা করছি এক্সপোর্ট কীভাবে বাড়ানো যায়। জনশক্তি রপ্তানি যেটা করছি, সেখানে অদক্ষ শ্রমিক ৮ লাখ আছে, আরও দেড় থেকে দুই লাখ আছে অবৈধ। মালয়েশিয়ায় ওরা আবার সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রিতে খুব এগিয়ে আছে, ওয়ান অব দ্য টু। ওদের একটা বড় চাহিদা আছে, প্রায় ৩০ হাজার সেমিকন্ডাক্টরের। কিন্তু এখন পর্যন্ত ভারত, ভিয়েতনাম সব মিলে যেভাবে প্ল্যান করেছে, তাতে ১২ থেকে ১৪ হাজার হচ্ছে। তারা আরও নেওয়ার চেষ্টা করছে। আমরা এখানে সেমিকন্ডাক্টর ইঞ্জিনিয়ার, ডিজাইনারদের ট্রেনিং দেওয়ার একটি উদ্যোগ নিয়েছি। সমঝোতা স্মারকটি মূলত এর ওপরই ছিল। এটা করতে পারলে বাংলাদেশ থেকে যদি ৩ বা ৪ হাজার পাঠাতে পারি, আমাদের রেমিট্যান্স অনেক বেড়ে যাবে।

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। বেসরকারি খাত আমরা কীভাবে ব্যবহার করে এগিয়ে নিয়ে যাব, সেটার ওপর রেজাল্ট নির্ভর করছে। সার্বিক বিষয় হলো, এই সফরে ব্যবসা এবং যারা দক্ষ শ্রমিক বা যারা বাংলাদেশে আসবেন, তাদের জন্য অনেকটাই পথ মসৃণ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের যৌথ বিবৃতিতে শিক্ষা খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন শিক্ষাবিদরা। তারা মনে করছেন, বিশ্ববিদ্যালয় টু বিশ্ববিদ্যালয় অংশীদারত্ব, যৌথ গবেষণা এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা খাতে সহযোগিতা দুই দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া (আইআইইউএম)-এর লেকচারার ফাতেমা ইসলাম বলেন, মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের যৌথ বিবৃতিতে শিক্ষা সহযোগিতা, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অংশীদারত্ব, যৌথ গবেষণা এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।

তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে জ্ঞান, গবেষণা এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নই একটি দেশের টেকসই অগ্রগতির প্রধান ভিত্তি। এ বাস্তবতায় দুই দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা সময়ের দাবি। দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একাডেমিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচি, যৌথ গবেষণা প্রকল্প এবং পারস্পরিক স্বীকৃত ডিগ্রি কার্যক্রম চালু করা হলে উভয় দেশই উপকৃত হবে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজ করার সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হবে।

বিশেষভাবে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং উদ্ভাবনভিত্তিক গবেষণায় যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, এসব খাতে সহযোগিতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দুই দেশকে আরও সক্ষম করে তুলবে।

মালয়েশিয়ার সানওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. খালেদ শুকরান বলেন, বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া যৌথ বিবৃতি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে ঘোষিত প্রতিশ্রুতিগুলো কার্যকর করতে নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, সময়সীমা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করা জরুরি। বিশেষ করে শ্রমিক নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, দালালনির্ভরতা কমানো এবং নিরাপদ অভিবাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

মালয়েশিয়ার আইসিটি বিশেষজ্ঞ পাভেল সারওয়ার বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া উভয় দেশই ভবিষ্যতের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসাবে ডিজিটাল রূপান্তর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ফিনটেক, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স এবং সেমিকন্ডাক্টর খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, জ্ঞান বিনিময় এবং গবেষণা ও বেসরকারি খাতের অংশীদারত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আমার বিশ্বাস, এ সহযোগিতা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের তরুণ আইটি ও ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র্যাজুয়েটদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জন, নতুন কর্মসংস্থান এবং উদ্ভাবনের বিশাল সুযোগ সৃষ্টি হবে। অন্যদিকে মালয়েশিয়াও বাংলাদেশের দ্রুত বিকাশমান প্রযুক্তি খাতের সঙ্গে কাজ করে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক ডিজিটাল ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে পারবে।

তিনি বলেন, প্রযুক্তি কোনো সীমান্ত মানে না। সঠিক নীতি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং পারস্পরিক আস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া একসঙ্গে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ডিজিটাল উদ্ভাবন, এআই এবং সেমিকন্ডাক্টর সহযোগিতার একটি সফল মডেল তৈরি করতে সক্ষম হবে।

শফিকুল ইসলাম নামের মালয়েশিয়ায় কর্মরত একজন শ্রমিক বলেন, তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ এবং দ্রুত শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনার কথা বলেছেন। পাশাপাশি অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধকরণ এবং আটক বাংলাদেশিদের সম্ভাব্য প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও উত্থাপন করেছেন; যা প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। এসব সমস্যার দ্রুত সমাধান হবে বলে প্রবাসীরা বিশ্বাস করেন।

মালয়েশিয়ার আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট সুরিত বলেন, প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানকে মালয়েশিয়ার সরকার যেভাবে সম্মান জানিয়েছেন, তাতে ধারলা করা যায়, দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর হবে। তিনি বলেন, ‘আমার বাসা পুত্রজায়ায়, যেটা মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আসবেন বলে অন্তত সাত দিন আগে থেকে মালয়েশিয়ার সরকারকে প্রস্তুতি নিতে দেখেছি, যেটা অন্য কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে সাধারণত দেখা যায় না। এটা বাংলাদেশের জন্য বিশাল সম্মান।’

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম