সাক্ষাৎকার: চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি
বন্দনার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসেছে সংসদ
বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যেখানে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন নেই
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, বর্তমান সরকার একটি কার্যকর ও প্রাণবন্ত সংসদ গড়ে তুলতে চায়। সরকার মনে করে, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সংসদের ভেতরেই সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। মনে রাখতে হবে, জাতীয় সংসদ কেবল একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানই নয়, এটি বাংলাদেশের মানুষের অধিকার, মর্যাদা এবং গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষারও প্রতীক। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, আস্থা ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে সরকার এবং বিরোধী দল মিলে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা, ভাতের অধিকার নিশ্চিত করা এবং গণতন্ত্রকে সুসংহত করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদনেতা তারেক রহমান যে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তারই ধারাবাহিক প্রতিফলন হচ্ছে আজকের এই জাতীয় সংসদ। আশা করি, এবারের সংসদ হবে দেশের মানুষের অধিকার, আশা ও স্বপ্নের প্রতিনিধিত্বকারী একটি সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান।
যুগান্তরকে দেওয়া একান্ত স্বাক্ষাৎকারে নূরুল ইসলাম মনি এসব কথা বলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় এবং প্রথম বাজেট অধিবেশন চলছে। ৩০ জুন এই সংসদে পাশ হয়েছে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট। এখন অধিবেশন মুলতুবি রাখা হয়েছে। ৭ জুলাই ফের অধিবেশন বসবে। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদনেতা তারেক রহমান সবাইকে চমকে দিয়ে চারবারের সংসদ-সদস্য এবং অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান নুরুল ইসলাম মনিকে জাতীয় সংসদের চিপ হুইপের দায়িত্ব দিয়েছেন। ইতোমধ্যে কাজে অত্যন্ত দক্ষতার ছাপ রেখেছেন তিনি। দ্রুত সময়ের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ন্যাম ভবনের সংস্কারকাজ শেষ করার পাশাপাশি সংসদ-সদস্যদের মাঝে বরাদ্দসহ বেশকিছু উদ্যোগ নিয়ে প্রশংসিত হয়েছেন। অধিবেশন চলাকালে দলনিরপেক্ষতার পরিচয় দিয়ে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষায়ও অনবদ্য ভূমিকা পালন করেছেন মৃদুভাষী এই ত্যাগী রাজনীতিক।
বর্তমান সংসদের কাছে মানুষের প্রত্যাশা, সরকার ও বিরোধী দলের ভূমিকা, সংবিধান সংশোধন, সংসদীয় কমিটি গঠন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ নানা বিষয়ে অকপটে কথা বলেন নূরুল ইসলাম মনি। বর্তমান সংসদ সম্পর্কে নিজের মূল্যায়ন জানতে চাইলে তিনি বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম-আত্মত্যাগসহ ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বর্তমান সংসদ গঠিত হয়েছে। অতীতে সংসদে ছিল নেতা-নেত্রী আর পরিবারের বন্দনা। মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে তারা কাজ করেনি। এবারের সংসদ সেই চিরচেনা সংস্কৃতি বদলে দিয়েছে। সংসদনেতা এবং বিরোধী দলের নেতাও নিয়মিত সংসদে উপস্থিত থাকেন। সংসদ-সদস্যরাও প্রাণ খুলে কথা বলছেন। কথা বলতে চাইলে বিরোধী দলের সদস্যদেরও সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এরকম সংস্কৃতি বা চর্চা আগে কখনো দেখা যায়নি।
চিফ হুইপ বলেন, দায়িত্ব নিয়েই প্রধানমন্ত্রী ও সংসদনেতা সব ক্ষেত্রে কৃচ্ছ্রসাধন করছেন। দেশ পরিচালনায় যেমন এর প্রভাব পড়েছে, সংসদেও এর প্রভাব পড়েছে। বাজেট পাশের দিন নৈশভোজের যে প্রচলন বিগত সময়ে ছিল, তিনি তা বাতিল করেছেন। আমরা জানতে চাইলাম কেন ডিনার বাতিল করলেন-তিনি জবাব দিলেন, ‘হামে এত এত শিশু মারা গেল, এখনো অনেক শিশু আক্রান্ত। আর এ সময় আমরা ডিনার করব, এটা মেনে নিতে পারছি না।’ এর মধ্য দিয়েই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রমাণ করলেন, তিনি কতটা মানবিক। তার কাছে দেশ এবং দেশের মানুষ সবার আগে। আপনারা ভাবতে পারেন, পৃথিবীতে আমরাই একমাত্র দেশ; যেখানে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন নেই, থাকার জায়গা নেই। সংসদ পরিচালনার বেলায়ও তিনি বিরোধী দলের মতামতকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। অতীত নিয়ে পড়ে না থেকে আগামী দিনে কী করা যায়, কী করবেন-সেই দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। বাজেট পাশের দিন বিরোধী দলের নেতার প্রস্তাব হাসিমুখে তিনি গ্রহণ করেছেন। এরকম সংসদ অতীতে আর দেশের মানুষ দেখেনি।
নূরুল ইসলাম মনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রথম দিনই বলেছেন আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে একটি কার্যকর, প্রাণবন্ত ও দায়িত্বশীল সংসদ পরিচালনা করা। আমরা চাই সংসদে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা, যুক্তিপূর্ণ তর্ক এবং সুস্থ বিতর্কের পরিবেশ সৃষ্টি। গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হলো মতের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করা। সেই লক্ষ্যেই আমরা সংসদকে একটি কার্যকর এবং অর্থবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমরা বিশ্বাস করি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংলাপ ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সমাধান করা সম্ভব। সেই পথ ধরেই আমরা জাতিকে আরও শক্তিশালী এবং স্বাবলম্বী ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে পারব। সরকার ও বিরোধী দল এ লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছে। সর্বশেষ বাজেট অধিবেশনেও আমরা এমন ঐক্য দেখেছি, যা আগামী প্রজন্মের কাছে অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম মনি এবারের নির্বাচনে বরগুনা-২ আসন থেকে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। প্রথম দফায় দুবার স্বতন্ত্রভাবে, বাকি দুবার নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে। ২ মার্চ প্রধানমন্ত্রী ও সংসদনেতা তারেক রহমান তাকে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপের দায়িত্ব দেন। এর আগে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে বিএনপি। ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ ভবনের উন্মুক্ত মঞ্চে সংসদ-সদস্য এবং মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ১২ মার্চ বসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন।
বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার মনিপুর গ্রামে ১৯৫২ সালের ২৫ মার্চ এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নূরুল ইসলাম মনি। ১৯৭২ সালে তিনি যশোর শিক্ষা বোর্ড থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। এরপর ১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি এবং পরের বছর প্রথম শ্রেণি পেয়ে এমএসসি পাশ করেন। নূরুল ইসলাম মনি ১৯৮৮ সালের চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে অংশ নিয়ে প্রথমবার সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিপুল ভোটে জয়ী হন। পরবর্তী সময়ে তিনি বিএনপিতে যোগদান করেন এবং একপর্যায়ে বরগুনা জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন নূরুল ইসলাম মনি।
সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ এবং সংসদীয় কমিটিগুলো কবে নাগাদ গঠিত হবে-এমন প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, সংবিধান সংশোধন একটি বড় বিষয়। এত বড় কাজ হুট করে করা যায় না। এজন্য সময় দরকার। যাচাই-বাছাইসহ প্রয়োজনীয় মতামত দরকার। মাত্র একটি অধিবেশন শেষ হয়েছে। আরেকটি অধিবেশন চলছে। হাতে সময় আছে, আশা করছি দ্রুত এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন সম্পর্কে চিফ হুইপ বলেন, জুলাইয়ের শহীদরা বাংলাদেশের গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিজেদের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তাদের আত্মদান জাতির ইতিহাসে চির অম্লান হয়ে থাকবে। নতুন প্রজন্ম তাদের আদর্শ, সাহস ও দেশপ্রেম থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলবে। আর এমন একটি বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য জুলাই সনদ বাস্তবায়ন সরকারি দলের অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। সংসদীয় কমিটিগুলোও দ্রুত সময়ের মধ্যে হবে বলেও জানান তিনি।
নূরুল ইসলাম মনি বলেন, জুলাই সনদের অনেক বিষয় বর্তমান সংবিধানের সঙ্গেই সম্পর্কিত। সংবিধানে ১৫৩টি অনুচ্ছেদ রয়েছে, আর জুলাই সনদে প্রায় ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। তাই শুধু ওই ৩০টি বিষয়কে আলাদা করে বাস্তবায়ন করলে হবে না; পুরো সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের সামনে তিনটি পথ রয়েছে-নতুন সংবিধান প্রণয়ন, সংবিধান স্থগিত রেখে নতুন ব্যবস্থা চালু করা, অথবা বিদ্যমান সংবিধান সংশোধন ও সংস্কার করা। আমরা তৃতীয় পথেই এগোচ্ছি, অর্থাৎ সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে চাই।
সংবিধান সংশোধন হবে সংসদে আর সংস্কার আলোচনা হবে সংসদের বাইরে উল্লেখ করে চিফ হুইপ বলেন, সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মূল উদ্দেশ্যের কোনো বড় পার্থক্য আমি দেখি না। প্রধানমন্ত্রীও তার সমাপনী বক্তব্যে বলেছেন, সংস্কারসংক্রান্ত আলোচনা সংসদের বাইরে সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে চলবে, পাশাপাশি সংসদের ভেতরে সংবিধান সংশোধনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এগোবে। সংবিধান সংশোধনের কাজ সময়সাপেক্ষ। এটি দেশের সর্বোচ্চ আইন; তাই সব দিক বিবেচনা করে ধীরে-সুস্থে এগোতে হবে। এজন্যই একটি কমিটি গঠন করা হবে, সেখানে প্রয়োজনীয় আলোচনা চলবে। আমরা মনে করি, এ বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে দূরত্ব খুব বেশি নয়। আলোচনা অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হবে।

