Logo
Logo
×
   

প্রথম পাতা

শ্বেতহস্তী কর্ণফুলী টানেল

অপচয়-অনিয়মের পাহাড়

আরমান হেকিম

আরমান হেকিম

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

অপচয়-অনিয়মের পাহাড়

কর্ণফুলী টানেল নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। দেশের প্রথম নদীতল টানেল হিসাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময় বলা হয়েছিল, এটি চট্টগ্রামের যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত খুলে দেবে এবং অর্থনীতিতে যোগ করবে নতুন গতি। কিন্তু এটি এখন আক্ষরিক অর্থেই শ্বেতহস্তীতে পরিণত হয়েছে। প্রকল্প চালুর পর প্রত্যাশিত যানবাহন চলাচল নিশ্চিত হয়নি। ফলে টোল আদায় দিয়ে পরিচালন ব্যয়ই মেটানো যাচ্ছে না। এতে প্রতিদিন লোকসান গুনতে হচ্ছে ১০ লাখ টাকা। এর মধ্যেই আইএমইডির মূল্যায়নে উঠে এসেছে হরিলুটের চাঞ্চল্যকর তথ্য। নথিপত্রে অস্তিত্ব না থাকলেও ল্যান্ডস্কেপিং ও বাগানের নামে ৪৯ কোটি টাকা গায়েব করা হয়েছে। এছাড়া অপ্রয়োজনীয় বাংলো নির্মাণে ৫০৩ কোটি টাকা ব্যয়, ঠিকাদারকে কয়েকশ কোটি টাকার অনৈতিক সুবিধা দেওয়া এবং ভুয়া বিলে অর্থ উত্তোলনসহ প্রকল্পটিতে অন্তত ৪৪টি গুরুতর অডিট আপত্তি ঝুলছে।

সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) ২০২৬ সালের প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি প্রকৌশলগতভাবে সফল হলেও ব্যয় ব্যবস্থাপনা, আর্থিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে গুরুতর অসংগতি পাওয়া গেছে। অনেক খাতে ব্যয়ের পর্যাপ্ত নথি নেই, আবার অনেক ক্ষেত্রে সরকারি বিধি অনুসরণ না করেই অর্থ ছাড় করা হয়েছে।

সবচেয়ে আলোচিত অনিয়মগুলোর একটি হলো ল্যান্ডস্কেপিং ও বৃক্ষরোপণ (বাগান) ব্যয়। আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ খাতে ৪৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। কিন্তু সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (আরডিপিপি) কিংবা প্রকল্প সমাপ্তি প্রতিবেদনে (পিসিআর) এমন কোনো কাজের উল্লেখই নেই। কোথায় গাছ লাগানো হয়েছে, কতটুকু এলাকায় সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ হয়েছে কিংবা কীভাবে এই অর্থ ব্যয় করা হয়েছে-এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর প্রকল্পের নথিপত্রে পাওয়া যায়নি। অডিট কর্তৃপক্ষ এ ব্যয়কে গুরুতর আর্থিক অনিয়ম হিসাবে চিহ্নিত করেছে।

টানেলের জন্য ৫০৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে একটি সার্ভিস এরিয়া (৩০টি বাংলো)। কিন্তু আইএমইডির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, প্রকল্পের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে এই স্থাপনার প্রয়োজনীয়তার যথেষ্ট ভিত্তি পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ অর্ধহাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হলেও কেন এই স্থাপনা নির্মাণ করা হলো, তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা প্রকল্প নথিতে নেই। টানেলে যানবাহনের চাপ প্রত্যাশার তুলনায় কম হওয়ায় এই সার্ভিস এরিয়ার ব্যবহারও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

প্রকল্পে ব্যয়ের অস্বাভাবিকতার আরেকটি উদাহরণ বিদ্যমান একটি বাংলো সংস্কার। অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সংস্কারকাজে ব্যয় হয়েছে ১০ কোটি ২৭ লাখ টাকা। একটি বাংলো সংস্কারে এত অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

ঠিকাদারকে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে একাধিক। মূল্য সমন্বয়ের নামে বিধিবহির্ভূতভাবে ২২৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। একই ধরনের আরেকটি আপত্তিতে আরও ৪২ কোটি ২৬ লাখ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রকৃত ব্যয়ের ভিত্তিতে অর্থ ছাড় না করে প্রভিশনাল সাম থেকে অতিরিক্ত ৯০ কোটি ২৭ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। আবার যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই ৭৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ভেরিয়েশন অর্ডার জারি করা হয়েছে, যা সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর-২০০৮) লঙ্ঘনের শামিল বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে।

অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের পাশাপাশি ঠিকাদারের বিরুদ্ধে চুক্তির শর্তও কার্যকর করা হয়নি। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করলেও আদায় করা হয়নি বিলম্বজনিত জরিমানা। অডিটে বলা হয়েছে, এতে এক ঘটনায় ২৪৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা এবং আরেক ঘটনায় ২ কোটি ১১ লাখ টাকা লিকুইডেটেড ড্যামেজ থেকে সরকার বঞ্চিত হয়েছে। অর্থাৎ কাজে বিলম্ব হলেও তার আর্থিক দায় ঠিকাদারের ওপর আরোপ করা হয়নি।

প্রকল্পের প্রশাসনিক ব্যয়েও মিলেছে অসংগতির দীর্ঘ তালিকা। পৃথক সুপারভিশন পরামর্শক নিয়োগ থাকা সত্ত্বেও নির্মাণ তদারকির নামে অতিরিক্ত ৭০ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। চুক্তির শর্ত অনুসরণ না করে পরামর্শককে আপ্যায়ন ব্যয় হিসাবে ১৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। আবাসন ও রেন্টাল সুবিধার নামে আরও ৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়কে অনিয়ম হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি বিশেষজ্ঞদের খাবার ব্যয় এবং সফটওয়্যার ক্রয়ের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া জাল বিল-ভাউচার ব্যবহার করে ৪১ লাখ ৯ হাজার টাকা সরকারি অর্থ উত্তোলনের তথ্যও উঠে এসেছে অডিটে। সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ না করে উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই পুলিশ ও ফায়ার স্টেশন নির্মাণে ব্যয় করা হয়েছে ২১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও সরকারি গাড়ি ফেরত না দেওয়ায় ১৪ কোটি ৯ লাখ টাকা এবং পৃথকভাবে আরও ৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকার অডিট আপত্তি রয়েছে।

রাজস্ব ব্যবস্থাপনায়ও অনিয়ম ধরা পড়েছে। পরামর্শকের বিল থেকে প্রয়োজনীয় আয়কর কম কাটার কারণে সরকারের ৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা রাজস্ব ক্ষতির কথা বলা হয়েছে। উপ-ঠিকাদারের বিল থেকে ভ্যাট কম কাটার কারণে আরও ২ কোটি ৮৯ লাখ টাকার ক্ষতির অভিযোগ রয়েছে। নিরাপত্তা সেবার জন্য দেওয়া ১৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকার অগ্রিম দীর্ঘদিন সমন্বয় না করাকেও আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা হিসাবে উল্লেখ করেছে অডিট কর্তৃপক্ষ।

এসব আর্থিক অনিয়মের পাশাপাশি প্রকল্পটির অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আইএমইডি। সংস্থাটির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, প্রত্যাশিত যানবাহন না থাকায় টোল থেকে যে আয় হচ্ছে, তা পরিচালন ব্যয়ের মাত্র ৫৪ থেকে ৫৫ শতাংশ মেটাতে সক্ষম হচ্ছে। প্রতিদিন খরচ হচ্ছে ২২ লাখ টাকা। টোল আদায় হচ্ছে মাত্র ১২ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতিদিন লোকসান দিতে হচ্ছে ১০ লাখ টাকা। আর বছরে ৩৬ কোটি টাকার বেশি লোকসান হচ্ছে।

সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষায় প্রতিদিন গড়ে ১৭ হাজার ৩৭৫টি যানবাহন চলাচলের পূর্বাভাস দেওয়া হলেও বাস্তবে চলাচল করছে মাত্র ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার যানবাহন, যা লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১৪-২৩%। এ অবস্থায় অব্যবহৃত সার্ভিস এরিয়াটি তৃতীয় পক্ষের কাছে ইজারা দেওয়া, ইলেকট্রনিক টোল সংগ্রহ ব্যবস্থা চালু করা এবং টানেলের ব্যবহার বাড়াতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করেছে আইএমইডি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২২-২৩, ২০২৩-২৪ এবং আগের বিভিন্ন অর্থবছরের মোট ৪৪টি অডিট আপত্তি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। এর মধ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরের ২৪টি আপত্তিকে গুরুতর আর্থিক অনিয়ম হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আইএমইডি বলেছে, প্রকল্পে আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এসব আপত্তি দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন।

এসব বিষয়ে জানতে প্রকল্পটির সর্বশেষ পরিচালক (পিডি) হারুনুর রশীদের মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াটঅ্যাপে মেসেজ পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি।

সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ যুগান্তরকে বলেন, আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে লোকসান ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা। আমরা দায়িত্ব নেওয়ার আগে দৈনিক লোকসানের পরিমাণ আরও বেশি ছিল। প্রকল্পের সঙ্গে যেসব উন্নয়নকাজ হওয়ার কথা ছিল, সেগুলোর অনেকই হয়নি। আমরা এসব কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছি। পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগও আনার চেষ্টা করছি। এখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাড়লে যানবাহনের চলাচলও বাড়বে। 

অডিট আপত্তির বিষয়ে সচিব বলেন, অডিটে যেসব বিষয় এসেছে, সেগুলো নিয়ম অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা হবে। আমরা চেষ্টা করছি বর্তমানে যে সম্পদ ও সক্ষমতা রয়েছে, সেগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে প্রকল্পটিকে কীভাবে লাভজনক করা যায়। 

এ বিষয়ে পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক সচিব মামুন আল রশিদ যুগান্তরকে বলেন, এটি একটি অদূরদর্শী প্রকল্প। সময়ের আগেই এটি নেওয়া হয়েছে। যেসব ফিডব্যাকের কথা বিবেচনা করে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর এখনো সময় হয়নি।


Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম