ট্রমা কাটেনি, নিঃস্ব অনেক পরিবার
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানীর উত্তরা দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে ২৮ শিক্ষার্থীসহ ৩৫ জনের প্রাণহানির ঘটনার আজ এক বছর পূর্ণ হলো। বিভীষিকাময় ওইদিনের ভয়ংকর স্মৃতি আজও তাড়া করে ফিরছে বেঁচে যাওয়া শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারকে। বিমানের শব্দ বা চুলার আগুন দেখলেও আঁতকে উঠছে তারা। অন্যদিকে এক বছর পেরিয়ে গেলেও নিহতদের পরিবার এবং আহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়াসহ ৫ দফা দাবির কোনোটিই এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। প্রিয়জন হারানোর শোকের পাশাপাশি আহতদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা করাতে গিয়ে অনেকে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। কেউ কেউ ঋণ করে সংসার চালাচ্ছেন। এ ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনও জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। চরম হতাশায় থাকা পরিবারগুলো এখন তাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা জানাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের অপেক্ষায় দিন গুনছে।
মাইলস্টোন স্কুল ট্র্যাজেডিতে ক্ষতিগ্রস্ত বা নিহত শিক্ষার্থীদের অভিভাবক কমিটির সভাপতি নাজমুল হক আক্ষেপ করে যুগান্তরকে বলেন, আমাদের সন্তান হারানোর এক বছর হয়ে গেল। কিন্তু ক্ষতিপূরণ বা তদন্ত কমিশনের সুপারিশের কিছুই বাস্তবায়ন হলো না। আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর কোনো উদ্যোগও নেওয়া হয়নি। কর্মসংস্থান বা পুনর্বাসন না থাকায় পরিবারগুলোয় আর্থিক দুরবস্থা চরম আকার ধারণ করেছে।
তিনি জানান, নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে তারা দুর্দশার কথা জানিয়েছিলেন। তখন তিনি নির্বাচনের পর আবারও সাক্ষাতের আশ্বাস দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সচিবালয়ে একাধিকবার লিখিত আবেদন করেও তারা সাক্ষাতের সুযোগ পাননি। তবে তারা এখনো বিশ্বাস করেন, প্রধানমন্ত্রী তাদের ডাকবেন।
জানা যায়, ২০২৫ সালের ২১ জুলাইয়ের ওই দুর্ঘটনায় ৩৫ জন নিহত এবং অন্তত ৬৫ জন গুরুতর আহত হন। দুর্ঘটনার পর নিহতদের পরিবারকে ৫ কোটি এবং আহতদের ২ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়াসহ ৫ দফা দাবি জানিয়েছিল অভিভাবক কমিটি। এর মধ্যে রয়েছে প্রয়োজনীয় পুনর্বাসন, নিহতদের শহীদি মর্যাদা ও সনদ প্রদান, মেমোরিয়াল নির্মাণ, ২১ জুলাইকে জাতীয় শিক্ষা শোক দিবস ঘোষণা এবং উত্তরায় একটি মসজিদ কমপ্লেক্স নির্মাণ।
গত বছরের শেষদিকে তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে নিহতদের ২০ লাখ এবং আহতদের ৫ লাখ টাকা করে দেওয়ার যে ঘোষণা করা হয়েছিল, তা প্রত্যাখ্যান করে ন্যায়বিচারের দাবি জানান অভিভাবকরা। পরবর্তী সময়ে ক্ষতিপূরণ প্রশ্নে হাইকোর্ট রুল জারি করলেও তা এখনো আলোর মুখ দেখেনি।
বিমান বিধ্বস্তের আগুনে শরীরের ৪৫ শতাংশ পুড়ে যাওয়া শিক্ষার্থী নাবিদ নাওয়াজ ৯৭ দিন বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছে। তার বাবা মো. মিজানুর রহমান জানান, নাবিদের মতো অনেকেই নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছে। শরীরের চামড়া কুঁচকে হাত-পা বাঁকা হয়ে যাচ্ছে। সন্তানদের চিকিৎসায় পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। অনেকেই ঋণ করে সংসার চালাচ্ছে। অথচ রাষ্ট্র তাদের কোনো খোঁজ রাখছে না, ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও করছে না।
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, আইএসপিআর ও স্কুল কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৯ সদস্যের সরকারি তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন গত বছরের ৫ নভেম্বর তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করা হয়। ১৫০ জনের সাক্ষাৎকার এবং ১৬৮টি তথ্য বিশ্লেষণ করে ৩৩টি সুপারিশ করা হলেও প্রতিবেদনটি এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে আহত শিক্ষার্থীদের ট্রমা কাটাতে এবং পড়াশোনায় ফেরাতে স্কুল কর্তৃপক্ষ নিয়মিত কাউন্সেলিং ও বিনোদনের ব্যবস্থা করছে। সম্প্রতি গাজীপুরের একটি রিসোর্টে আহত ৬৩ শিক্ষার্থীকে নিয়ে ‘সবুজের মাঝে অমর তোমরা’ শীর্ষক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এর আগে ফুটবল খেলারও আয়োজন করা হয়, যেখানে রেফারির দায়িত্বে ছিলেন সাবেক ফুটবলার রেহানা পারভীন। খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভয়ংকর স্মৃতি ভুলিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর এই চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
ড. ইউনূসসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন : শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মাদ ইউনূস ও সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন করা হয়। চলতি বছরের ৭ মে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালতে আবেদন করেন নিহত শিক্ষার্থী উক্য ছাইং মারমার বাবা উসাইমং মারমা। আদালত বাদীর জবানবন্দি রেকর্ড করে আদেশ অপেক্ষমাণ রাখেন।

