Logo
Logo
×
   

প্রথম পাতা

খুচরা টাকা ব্যাংকে নেই সবাই জিম্মি দালালচক্রে

জড়িত বাংলাদেশ ব্যাংকের অসাধু চক্র

হামিদ বিশ্বাস

হামিদ বিশ্বাস

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

খুচরা টাকা ব্যাংকে নেই সবাই জিম্মি দালালচক্রে

‘চাহিবামাত্র ইহার বাহককে দিতে বাধ্য থাকিবে’-টাকার গায়ে এ লাইনটি লেখা থাকে সাধু ভাষায়। কিন্তু অসাধু চক্র এমন নির্দেশনা মানতে নারাজ। আর বাস্তবতা হলো-বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় খুচরা টাকা না থাকলেও সব আছে দালালচক্রের হাতে। এজন্য উলটো দালালচক্র যেন বলছে, ‘চাহিবামাত্র ইহার বাহককে কমিশন দিতে বাধ্য থাকিবে’। এমনই এক চাঞ্চল্যকর এবং নজিরবিহীন ঘটনার কলরেকর্ডসহ যাবতীয় ডকুমেন্ট যুগান্তরের হাতে এসে পৌঁছেছে।

যেখানে এক দালাল একজন গ্রাহককে বলছেন, ‘আগের রেটে আর দেওয়া যাবে না। রেট বেড়েছে। তাছাড়া খুচরা টাকাপয়সাও খুব বেশি নাই। আপনি তো কমে পাইছেন। হাতিরঝিলে যে স্পিডবোট বা নৌকা চলে, সেখানে ৫ টাকার নোট বা কয়েনের অনেক চাহিদা। সেখানে ৩২ শতাংশ কমিশনে ভাংতি পয়সা সরবরাহ করি। একইভাবে গুলশান এলাকার চক্রাকার বাস ঢাকার চাকায়ও ৩২ শতাংশ কমিশনে খুচরা টাকাপয়সা দিয়ে থাকি। এছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন রেটে খুচরা টাকাপয়সা সরবরাহ করি। নিয়মিত যোগাযোগ রাইখেন।’

জানতে চাইলে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শফিকুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি বাকরুদ্ধ। জাস্ট বাকরুদ্ধ। এভাবেও দুর্নীতি হতে পারে, কখনো চিন্তাও করিনি। আমার দীর্ঘ ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে এ ধরনের কোনো ঘটনা শুনিনি। তিনি বলেন, দালাল টাকা কোথায় পায়। সে তো ছাপায় না। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ ব্যাংকের কারও না কারও সঙ্গে যোগসাজশ করে টাকা বের করে। তিনি বলেন, খুচরা টাকা নিতে এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে গ্রাহক কোথায় যাবে। শপিংমল, বাসকাউন্টার ভাংতি টাকা কোথায় পাবে? আর এভাবে দালালের কাছ থেকে ২০-৩২% কমিশনে টাকা খুচরা করতে হলে সেই প্রভাবও তো সাধারণ ভোক্তার ওপরই পড়বে। তিনি বলেন, এগুলো দ্রুত বন্ধ করতে হবে। এভাবে ব্যাংক খাতকে আর হাসির পাত্র বানানো ঠিক হবে না।

জানা যায়, বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে কাঙ্ক্ষিত খুচরা টাকা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দালালচক্রের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট ব্যবহারকারী বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে। আর সেখানেই ঘটে যত বিপত্তি। তথ্যানুসন্ধানে কেস স্টাডি হিসাবে একটি উদাহরণই যথেষ্ট। ১৪ জুলাই একটি বড় শপিংমলের পক্ষ থেকে একজন দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় ভাংতি টাকার জন্য। এতে তিনি তৎক্ষণাৎ সাড়া দেন। কিন্তু মাত্র ৪৮ হাজার টাকা খুচরা করতে কমিশন দিতে হয় ১১ হাজার ১০০ টাকা। নথি বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ১ টাকার ৬ হাজার কয়েন নিতে গুনতে হয়েছে অতিরিক্ত ১২০০ টাকা বা ২০% কমিশন, ২ টাকার ৬ হাজার কয়েন নিতে অতিরিক্ত গুনতে হয়েছে ২৪০০ টাকা বা ২০% কমিশন এবং ৫ টাকার ৬ হাজার কয়েন নিতে অতিরিক্ত দিতে হয়েছে ৭ হাজার ৫০০ টাকা বা ২৫% কমিশন।

বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, খুচরা ৫, ১০ ও ২০ টাকার নোটের খুবই সংকট। তবে যা পাওয়া যায়, তা ছেঁড়াফাটা, দুর্গন্ধযুক্ত ও ব্যবহারের অনুপযোগী। এমনকি ১, ২ ও ৫ টাকার কাঙ্ক্ষিত কয়েনও পাওয়া যাচ্ছে না। সম্প্রতি সরকারি জনতা ব্যাংকের কয়েকটি শাখায় গিয়ে কোনো খুচরা টাকা পাওয়া যায়নি। সেখানে আছে ৫০ থেকে ১ হাজার টাকার নোট। একই চিত্র দেখা গেছে বেসরকারি খাতের পূবালী, সিটি ও ডাচ্-বাংলা ব্যাংকেও। পূবালী ব্যাংকের এক শাখা কর্মকর্তা বলেন, ৫, ১০ ও ২০ টাকার কোনো ভালো নোট নেই। যা আছে, সবই ছেঁড়াফাটা দুর্গন্ধযুক্ত; ব্যবহারের অনুপযোগী। একপর্যায়ে পাশের অন্য একটি শাখা থেকে কিছু খুচরা টাকা সংগ্রহ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন এই ব্যাংক কর্মকর্তা।

সিটি ব্যাংকের এক শাখার কর্মকর্তা জানান, আওয়ামী লীগ সরকার চলে গেছে প্রায় আড়াই বছর। এই সময়ে ৫, ১০ ও ২০ টাকার কোনো নোট শাখা পর্যায়ে আসেনি। হয়তো ছেপেছে সীমিত আকারে। কিন্তু আমরা পাইনি। আর বাংলাদেশ ব্যাংক না দিলে গ্রাহককে কোথা থেকে দেব।

ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এক শাখা কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকে খুচরা টাকা চাওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো আসেনি।

ব্যাংকাররা জানান, ব্যাংকের কোনো শাখা নির্দিষ্ট অঙ্কের বেশি টাকা ভল্টে রাখতে পারে না। বেশি হলেই তা কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সোনালী ব্যাংকের চেস্ট শাখায় জমা দেয়। আবার যখন দরকার হয় বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত চলতি হিসাবের বিপরীতে উত্তোলন করে নিয়ে যায়। এভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা জমা ও উত্তোলন একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। সব সময় ছেঁড়াফাটা, ক্রটিপূর্ণ ও ময়লাযুক্ত নোট ব্যাংকগুলোর কাছে এলে তা আলাদা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দিয়ে থাকে। এ ধরনের নোট পুড়িয়ে ফেলে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সমমূল্যের নতুন নোট দিয়ে থাকে। তবে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর নতুন নকশা প্রণয়নসহ বিভিন্ন কারণে দীর্ঘদিন ধরে কাঙ্ক্ষিত নতুন নোট বাজারে আসছে না। আবার ছেঁড়াফাটা, ত্রুটিপূর্ণ ও ময়লাযুক্ত নোটে বাজার এখন সয়লাব।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের ভল্টে যে পরিমাণ ৫, ১০ ও ২০ টাকার নোট আছে, তার অর্ধেকের বেশি ব্যবহার অযোগ্য। আবার নতুন টাকাও ছাপানো হচ্ছে না। ফলে খুচরা টাকার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। যা আছে, তাও চলে যাচ্ছে দালালের হাতে। এতে উদ্যোক্তারা পড়েছেন বিপাকে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন উদ্যোক্তা যুগান্তরকে জানান, এটা কি স্বাধীন দেশ, নাকি পরাধীন? আমি কোন দেশে বসবাস করছি? টাকা ভাঙাতে যদি ৩২% কমিশন দিতে হয়, তাহলে এ দেশে থেকে লাভ কী? কীভাবে ব্যবসা করব? আর কীভাবে সরকারকে ট্যাক্স দেব? আমরা কয় টাকা লাভ করি? কে টাকা ছাপাবে? কে কমিশন ছাড়া খুচরা টাকা দেবে? এসব দেখার দায়িত্ব কার? তিনি বলেন, এভাবে চলতে থাকলে শপিংমল, পরিবহণসহ এ সংক্রান্ত ব্যবসা পথে বসবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সোমবার যুগান্তরকে বলেন, এক, দুই ও পাঁচ টাকার কয়েনের কোনো সংকট নেই। এখানে যদি কোনো সংকট দেখানো হয়, তাহলে সেটা হবে কৃত্রিম। কারণ, পর্যাপ্ত কয়েন মজুত আছে। তবে ১০ ও ২০ টাকার নোটের কিছুটা সংকট রয়েছে। সেটা ছাপানো চলমান আছে। আর দালালের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। তাই কিছু বলতে পারব না।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .