পদোন্নতি ঠেকাতে নতুন ফাঁদ
ডিআইজিদের আমলনামায় ‘ক্রিসমাস ট্রি’ কাটার অপবাদ
অতিরিক্ত আইজিপির ৫ পদে তীব্র প্রতিযোগিতা, তিন দশক আগের গাছ কাটার ঘটনা টেনে একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা
১৯৯৩ সালের ৮ জুন পুলিশ সদর দপ্তরের নতুন ভবন উদ্বোধনকালে গাছের চারা রোপণ করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) পদে পাঁচজন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। এ লক্ষ্যে ২৬ জন ডিআইজির আমলনামা (এসিআর ও সার্ভিস রেকর্ড) যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। তবে এই পদোন্নতিকে ঘিরে পর্দার আড়ালে শুরু হয়েছে তীব্র লবিং, পালটাপালটি অভিযোগ এবং কাদা ছোড়াছুড়ি। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, প্রায় তিন দশক আগের একটি ‘রাজসিক’ কাটার ঘটনাকেও এখন কিছু কর্মকর্তার পদোন্নতি ঠেকানোর হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। যার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নেই।
পুলিশ সদর দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পদোন্নতির দৌড়ে থাকা কর্মকর্তাদের অধিকাংশই বিসিএস ১৫ ও ১৭ ব্যাচের। এর মধ্যে ৯ জন ডিআইজি ১৫ ব্যাচের এবং ১৭ জন ১৭ ব্যাচের কর্মকর্তা। চাকরি জীবনের শেষ দিকে এসে অনেকের কাছে অতিরিক্ত আইজিপি পদই সম্ভাব্য সর্বোচ্চ পদোন্নতি। কিন্তু পদোন্নতি প্রত্যাশীদের মধ্যে যারা অধিকতর যোগ্য ও দক্ষ তাদের বিরুদ্ধে নোংরা চক্রান্ত শুরু হয়েছে। অথচ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এসব কর্মকর্তাদের বিএনপিপন্থি হিসেবে চিহ্নিত করে দফায় দফায় পদোন্নতিবঞ্চিত করা হয়।
অভিযোগ উঠেছে, কতিপয় দুর্নীতিগ্রস্ত ও দলবাজ ডিআইজি অধিকতর যোগ্য ও পেশাদার সহকর্মী-ব্যাচমেটের পদোন্নতি ঠেকাতে এখন মরিয়া। তারা কোনো উপায় না পেয়ে এখন প্রায় তিন দশক আগের আলোচিত এই গাছ কাটার দোষ নিরীহ কর্মকর্তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে পদোন্নতি আটকে দেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্র করছেন।
আলোচিত ‘ক্রিসমাস ট্রি’ বিতর্ক : সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া পুলিশ সদর দপ্তরের মূল ভবনের সামনে একটি ‘ক্রিসমাস ট্রি’ রোপণ করেন। ওই সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরকারের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপিসহ পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা ছিলেন। কিন্তু ২০১৮ সালে তৎকালীন আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারীর সময় পুলিশ সদর দপ্তরের সৌন্দর্যবর্ধনের অংশ হিসেবে ওই গাছ কেটে সেখানে পানির ফোয়ারা নির্মাণ করা হয়। তখন অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন মো. মোখলেসুর রহমান। ওই ঘটনা সামনে এনে এখন কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গাছ কাটার দায় চাপানোর অপচেষ্টা চেষ্টা চলছে। অথচ যারা ওই সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা বাস্তবায়নের সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত ছিলেন না। মূলত আলোচিত গাছটি কাটা হয়েছিল রাতের আঁধারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই সময় পুলিশ সদর দপ্তরে দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন মালী যুগান্তরকে বলেন, গাছটি রাতের বেলায় কেটে ফেলা হয়েছিল। তখন কোনো জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। পরে শুনেছি-আইজি স্যারের নির্দেশে গাছ কাটা হয়।
রাজনৈতিক তকমার অভিযোগ : ভুক্তভোগী একাধিক কর্মকর্তা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় চার থেকে পাঁচবার পর্যন্ত পদোন্নতিবঞ্চিত হওয়ার পরও এখন তাদেরই আওয়ামী লীগপন্থি বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা হচ্ছে। এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে। তারা বলেন, ভাগ্যে থাকলে পদোন্নতি হবে, কিন্তু নোংরামির তো একটা শেষ আছে।
তাদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগের ১৭ বছরের শাসনামলে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত ছিলেন অনেক কর্মকর্তা। রাষ্ট্রীয় পটপরিবর্তনের পর সেই বঞ্চনার অবসান হওয়ার কথা থাকলেও এখন নতুনভাবে রাজনৈতিক তকমা লাগিয়ে পদোন্নতির পথ রুদ্ধ চক্রান্ত করা হচ্ছে।
একজন কর্মকর্তা বলেন, ব্যক্তিস্বার্থে যে সিদ্ধান্ত তৎকালীন আইজিপি পর্যায়ে নেওয়া হয়েছিল, সেখানে নিচের পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ত করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া উচিত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম সোমবার যুগান্তরকে বলেন, প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের কর্মকর্তা আখ্যা দিয়ে পদোন্নতি ঠেকানোর রেওয়াজ শুরু হয় মূলত আওয়ামী লীগ আমল থেকে। অথচ এটা পুলিশে কখনো ছিল না। ওই সময় পেশাদার সিনিয়র অফিসারদের ডিঙ্গিয়ে কীভাবে দলবাজ বহু জুনিয়র পদোন্নতি বাগিয়ে নেয়। কিন্তু এখন যেন সেই বাজে কালচার আর ফিরে না আসে, সেটি অবশ্যই প্রত্যাশা করব। তিনি বলেন, এগুলো সরকার যেন কঠোর হস্তে দমন করে। এছাড়া অফিসারদের মধ্যে যদি ইন্টারনাল কোনো দলাদলি বা গ্রুপিং থাকে, সেগুলোও নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
তিনি বলেন, ইনসাফ বা ন্যায় বিচারটা প্রতিষ্ঠা করা দরকার। তিনি মনে করেন, পদোন্নতি হতে হবে সিস্টেম মোতাবেক। আওয়ামী রেজিমে যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, তাদের কথা আলাদা, সেটি সরকার তো দেখবে। কিন্তু কাউকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে হয়রানি কিংবা পদোন্নতি বঞ্চনা করা হলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
পদোন্নতি ঘিরে তীব্র লবিং : সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, অতিরিক্ত আইজিপির শূন্য হওয়া মাত্র ৫টি পদকে কেন্দ্র করে পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। কেউ কেউ নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় তুলে ধরে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন, কেউ আবার নিজের পদোন্নতি নিশ্চিত করতে প্রতিদ্বন্দ্বী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ সামনে আনছেন।
একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, প্রশাসনের ভেতরে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী মেধা ও যোগ্যতাকে অন্যতম মাপকাঠি বিবেচনা না করে দলবাজিকে প্রধান যোগ্যতা হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। এ যাত্রায় তারা পদোন্নতি পাবে না বুঝতে পেরে, মিথ্যা অপবাদ দিয়ে কিছু কর্মকর্তার প্রাপ্য পদোন্নতি আটকে দেওয়ার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব অভিযোগ সত্য হলে তা কেবল কয়েকজন কর্মকর্তার পদোন্নতির প্রশ্ন নয়; বরং পুলিশ বাহিনীর পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা এবং চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ার নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
পলাতক থাকায় এ বিষয়ে সাবেক আইজিপি ড. জাবেদ পাটোয়ারীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

