Logo
Logo
×
   

প্রথম পাতা

রক্তাক্ত জুলাই

পতনের শব্দে দেশ ছাড়ে হাসিনা পরিবার

আরমান ভূঁইয়া

আরমান ভূঁইয়া

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

পতনের শব্দে দেশ ছাড়ে হাসিনা পরিবার

জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাসে ৫ আগস্ট সরকার পতনের দিনটি যতটা ঐতিহাসিক, তার চেয়েও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয় আগের দুদিন ৩ ও ৪ আগস্ট। এই ৪৮ ঘণ্টায় দেশে এমন বেশকিছু সিদ্ধান্ত হয়, যা কার্যত শেখ হাসিনা সরকারের পতনকে অনিবার্য করে তোলে। একদিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে সরকার পতনের একদফা দাবিতে রাজপথে নামে লাখো মানুষ, অন্যদিকে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ না করার অবস্থান। ফলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসে। সরকারের নিয়ন্ত্রণ দ্রুত দুর্বল হতে শুরু করে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র, আন্দোলনের সমন্বয়ক, প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ৩ আগস্ট সেনাসদরে অনুষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক এবং ৪ আগস্ট রাতে সেনাবাহিনীর অবস্থান সরকারপ্রধানের কাছে পৌঁছে যায়। এরপর শেখ হাসিনা উপলব্ধি করেন, আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তিকে আর আগের মতো ব্যবহার করা সম্ভব হবে না। ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে গুলি চালাতে সেনাবাহিনীর অনাগ্রহ সরকারের রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়। একই সময়ে আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে-এমন আশঙ্কা থেকেই ২ ও ৩ আগস্ট শেখ পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে দেশ ছাড়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়।

একদফার ঘোষণায় আন্দোলনের নতুন মোড় : ২০২৪ সালের ১ আগস্ট ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজত থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ক মুক্তি পাওয়ার পর আন্দোলন নতুন গতি পায়। ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে ৯ দফা থেকে সরে এসে শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে ৪ আগস্ট থেকে দেশব্যাপী সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন এবং ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। পরে পরিস্থিতি বিবেচনায় কর্মসূচিটি একদিন এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়।

সেনাসদরের বৈঠক বদলে দেয় সমীকরণ : ৩ আগস্ট সেনাপ্রধানের সভাপতিত্বে সেনাসদরে দেশের বিভিন্ন সেনানিবাসের কর্মকর্তাদের নিয়ে বিশেষ ‘অফিসার্স অ্যাড্রেস’ অনুষ্ঠিত হয়। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকে অংশ নেওয়া জুনিয়র ও মধ্যম পর্যায়ের বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে গুলি চালানো বা কঠোর শক্তি প্রয়োগের বিরোধিতা করেন। বৈঠক শেষে সেনাপ্রধান কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, সেনাবাহিনী জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক এবং জনগণের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করাই তাদের দায়িত্ব। এই অবস্থান সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হয়ে আসে।

৪ আগস্ট সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিন : ৪ আগস্ট সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের প্রথম দিনেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করে এবং ৫, ৬ ও ৭ আগস্ট সরকারি ছুটি ঘোষণা করে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ওই রাতেই কারফিউ কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের বিষয়ে সেনাবাহিনীর আপত্তির কথা সরকারের কাছে জানিয়ে দেওয়া হয়। এরপরই শেখ হাসিনা বুঝতে পারেন, রাষ্ট্রীয় শক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ আর আগের অবস্থানে নেই।

শেখ পরিবারের সদস্যদের দেশত্যাগ : সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, ২ ও ৩ আগস্ট শেখ পরিবারের বিভিন্ন সদস্যকে দেশ ছাড়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ৩ আগস্ট সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন বলে জানা যায়। তার পরিবারের সদস্যদের একটি অংশ একই সময়ে লন্ডনে যান। এছাড়া শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও শেখ রেহানার দেবর মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং শেখ রেহানার ছেলে রেদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি ৫ আগস্টের আগেই দেশ ছাড়েন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। অন্যদিকে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় তখন যুক্তরাষ্ট্রে এবং মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ভারতের দিল্লিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দায়িত্বে ছিলেন। শেখ সেলিম, শেখ ফজলে শামস পরশসহ পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য গণ-অভ্যুত্থানের পর আত্মগোপনে গিয়ে পরে দেশ ছাড়েন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।

৫ আগস্টের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল আগের দুদিনে : ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির মুখে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেন। তবে ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ওইদিনের নাটকীয় পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল তার আগের ৪৮ ঘণ্টায়। একদিকে এক দফার আন্দোলন জনসমর্থনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়, অন্যদিকে সেনাবাহিনী নিরস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগে অনাগ্রহী অবস্থান নেয়। একই সময়ে শেখ পরিবারের সদস্যদের দেশত্যাগের প্রস্তুতি এবং প্রশাসনের অভ্যন্তরে আস্থার সংকট-সব মিলিয়ে ৩ ও ৪ আগস্টেই কার্যত শেখ হাসিনা সরকারের পতনের রূপরেখা চূড়ান্ত হয়ে যায়।

জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়ক ও ৯ দফার অন্যতম ঘোষক আব্দুল কাদের যুগান্তরকে বলেন, ৩ আগস্ট ছিল আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্টগুলোর একটি। ওইদিন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের একদফা দাবি ঘোষণা করা হয়। তিনি জানান, ১ আগস্ট ডিবি কার্যালয় থেকে ছয় সমন্বয়ক মুক্তি পাওয়ার পর আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলছিল। কিন্তু ২ আগস্ট যাত্রাবাড়ী ও উত্তরায় আন্দোলনকারীদের নিহত হওয়ার ঘটনার পর আন্দোলন একদফার দিকে মোড় নেয় এবং ৩ আগস্ট একদফার পাশাপাশি সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, ৪ আগস্ট আন্দোলনের গতি আরও তীব্র করতে ৬ আগস্টের নির্ধারিত ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি একদিন এগিয়ে ৫ আগস্ট পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় করে ঢাকা অবরোধের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে থাকার সিদ্ধান্ত ছিল। এ সময় সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ না করার অবস্থানের খবরও বিভিন্ন সূত্রে তাদের কাছে পৌঁছায়, যা আন্দোলনকারীদের মনোবল আরও দৃঢ় করে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম