৫ আগস্টে ঢামেকে পড়েছিল ৪৬ লাশ
সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট একই সঙ্গে যুগান্তকারী ও অত্যন্ত বেদনাদায়ক দিন। এদিন ছাত্র-জনতার চূড়ান্ত বিজয় হয় এবং স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটে। গণ-অভ্যুত্থানের দিনগুলোতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ছাত্র-জনতার কান্না ও আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠে। এ দিন শুধু ঢামেক হাসপাতালেই ৪৬ জনের মৃত্যু হয়। আর এখানে ১৫ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত ১৮৬ জন মারা যান। আওয়ামী সন্ত্রাসী এবং ফ্যাসিস্টের দোসর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হামলা ও গুলিতে তারা নিহত হন।
১৮ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত হাসপাতাল ঘিরে ফ্যাসিস্ট সরকারের সন্ত্রাসীদের জোরালো অবস্থান ছিল। হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসা নিতে তারা বাধা দিয়েছে। চিকিৎসক-নার্স, গণমাধ্যমকর্মীদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। বেশ কয়েকবার হাসপাতাল ভাঙচুর, এমনকি চিকিৎসকদের গায়ে হাত পর্যন্ত তুলেছে সন্ত্রাসী বাহিনীর ক্যাডাররা। তবে নানা হুমকি ও চোখ-রাঙানি উপেক্ষা করে ঢামেক হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে চিকিৎসা-সেবা দিয়েছে।
১ আগস্ট থেকে ঢামেক হাসপাতাল চত্বরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ ছাত্রলীগ-যুবলীগের সন্ত্রাসীরা জোরালো অবস্থান নেয়। আহতদের চিকিৎসা যাতে না হয় সেজন্য হাসপাতালের প্রবেশপথে তারা ব্যারিকেড দেয়। লাশ গুম করারও চেষ্টা করে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগসহ আশপাশে ছাত্রলীগ-যুবলীগ ও পুলিশ বেশ কয়েকবার ছাত্র-জনতার ওপর হামলা করে, গুলি চালায়। তবে হাসপাতালের ভেতরে ও বারান্দায় ছাত্র-জনতা অবস্থান নিয়ে আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করে। ১ আগস্ট থেকে প্রতি মুহূর্তে গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত ছিন্নভিন্ন শরীর নিয়ে আসছিলেন ছাত্র-জনতা। ওইদিন আওয়ামী সন্ত্রাসীদের বাধা উপেক্ষা করে দুই শতাধিক গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিকে হাসপাতালে আনা হয়। হাসপাতালের বারান্দা, জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে আশপাশের সব কক্ষে তারা ছটফট করছিলেন। একপর্যায়ে মর্গের বাইরে লাশ ফেলে রাখা হয়। ৩ আগস্ট থেকে হাসপাতালের স্থায়ী-অস্থায়ী মর্গ লাশের স্তূপে ভরে ওঠে। লাশগুলো পচে-গলে দুর্গন্ধ ছড়ায়। প্রিয়জনদের লাশ পেতে অনেক স্বজন হাসপাতালে ভিড় জমান।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করলে ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও মর্গের ভেতরে ও বাইরে বীভৎস দৃশ্যের সূচনা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে হতাহতদের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। আহতদের বাঁচাতে চিকিৎসক-নার্সরা দিন-রাত পরিশ্রম করেন। রক্ত দিতে সবার প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
৪ আগস্ট অসহযোগ কর্মসূচি দেওয়া হলে রাজধানীসহ পুরো দেশে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালায় আওয়ামী সন্ত্রাসী ও পুলিশ। ওইদিন গুরুতর আহত অবস্থায় প্রায় ২০০ জন ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি হন। তাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন গুলিবিদ্ধ। ওইদিন ১২ জন মারা যান।
ঢামেক হাসপাতালের তথ্যানুযায়ী-৩১ জুলাই পর্যন্ত ৪৫০ জন হাসপাতালে আসেন। এ সময়ের মধ্যে মারা যান ১০১ জন। এর মধ্যে ১৮ জুলাই গুলিবিদ্ধ হয়ে আসা দুই সাংবাদিকসহ ৯ জন মারা যান। এ সময় থেকে ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ছাত্র-জনতার ওপর চড়াও হয় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগসহ অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীরা। হাসপাতাল প্রাঙ্গণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও অবস্থান নেন। এ সময় আহতদের যেন চিকিৎসা না করা হয় বলে ছাত্রলীগ-যুবলীগের সন্ত্রাসীরা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বারবার হুমকি দেয়।
সরকারি হিসাবে ঢামেক হাসপাতালে ১৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে ৩০০ জনের বেশি মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও স্টাফরা জানান-ময়নাতদন্ত, তালিকাভুক্ত না করেই অধিকাংশ লাশ স্বজনরা নিয়ে গেছেন। অনেকে লাশ নিয়ে মিছিল বের করেছেন। ফলে লাশের হিসাব মেলাতে পারেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতালের রেজিস্টার অনুযায়ী-৩১ জুলাই পর্যন্ত ১০১ জন মারা যান। ৩ থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত ৫ দিনে ৮৬ জন মারা যান। ৩ আগস্ট একজন, ৪ আগস্ট ১২ জন, ৫ আগস্ট ৪৬ জন এবং ৬ আগস্ট ২২ জনের মৃত্যু হয়। এছাড়া ৭ আগস্ট ১০ জন এবং ৮ আগস্ট পাঁচজন মারা যান। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে ঢামেক হাসপাতালে ২৮৩ জনের মৃত্যু হয়।

