Logo
Logo
×
   

প্রথম পাতা

ঝুলে আছে জুলাই সনদ

Icon

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ঝুলে আছে জুলাই সনদ

ফাইল ছবি

ইতিহাস বদলে দেওয়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শুধু একটি আন্দোলন ছিল না। ছিল রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি। দেশের ছাত্র-জনতা রক্ত দিয়েছিল পরিবর্তনের আশায়। ক্ষমতার ভারসাম্য, সুশাসন আর জবাবদিহির নতুন পথ তৈরি হবে সেই আকাঙ্ক্ষা ছিল তাদের। সেই আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নের লিখিত দলিল ‘জুলাই জাতীয় সনদ।’ গণভোটে জনগণের সমর্থনও মিলেছে। কিন্তু বাস্তবায়নের পথ এখন থমকে আছে। উচ্চ আদালতে আইনি চ্যালেঞ্জ, বিএনপির সংশোধনের প্রস্তুতি আর জামায়াতের সংস্কারের দাবি-এসবের মাঝেই ঝুলে আছে বহু কাঙ্ক্ষিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কারের যে বিশাল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, ইতোমধ্যে তার পুরোটাই হাতছাড়া হয়েছে। তবে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি বলছে, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে কাজ এগিয়ে চলছে।

দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্র সংস্কার। কিন্তু সংস্কারের যে ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তার প্রায় পুরোটাই হাতছাড়া হয়ে গেছে। প্রশাসনিক সংস্কারের নামে যতটুকু হয়েছে তা ছিল মূলত লোক দেখানো। তিনি বলেন, সংস্কারের সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার কারণ হলো-কোন সংস্কারগুলো করা যাবে, কোনটা করা যাবে না তা নির্ধারণ করেছে আমলাতন্ত্র। তার মতে, ক্ষমতার হাতবদলের প্রক্রিয়ায় অসুস্থ প্রতিযোগিতা, এমনকি সচিবালয়ে মবসহ অভূতপূর্ব অরাজকতা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে অন্য সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সরকারি খাতের মতো সরকারি চাকরিতে সার্বিকভাবে দলীয়করণের প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন দলের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয়েছে। ফলে সরকার ও সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে ‘এবার আমাদের পালা’ এই প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।’

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ সংসদীয় কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন যুগান্তরকে বলেন, জুলাইয়ের চেতনা বাস্তবায়নে আমাদের কাজ এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে সংবিধান সংশোধনের কমিটি গঠিত হয়েছে। এই কমিটির প্রথম মিটিং হয়েছে। মিটিংয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত হতে সময় লাগবে।

প্রসঙ্গত, ছাত্র-জনতার সম্মিলিত আন্দোলনে আজ থেকে দুই বছর আগে অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শাসকের মোড়কে জড়িয়ে থাকা শেখ হাসিনার দানবীয় সরকারের পতন হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ক্ষমতার মসনদে চেপে বসা ১৬ বছরের স্বৈরাচারের অবসান ঘটে। এরপর ৮ আগস্ট দেশের দায়িত্ব নেয় ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এই আন্দোলনের পর সাধারণ মানুষের স্বপ্ন ছিল বিশাল। রচিত হয় জুলাই সনদ। তবে তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী, শহীদ পরিবার ও আহতদের মাঝে রয়েছে ক্ষোভ।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সর্বশেষ অবস্থা : জুলাই সনদ ও গণভোট অধ্যাদেশের বৈধতা প্রশ্নে উচ্চ আদালতের রুলের শুনানি হওয়ার কথা ছিল ১৭ জুন। কিন্তু ওইদিন শুনানি হয়নি। এখন পর্যন্ত তা শুনানির অপেক্ষায় ঝুলে আছে। এই রিটের বিপরীতে গত ৩ মার্চ আদালত রুল জারি করে। এতে ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ কেন অবৈধ হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই দিন ধার্য করে আদেশ দেন। এ ব্যাপারে রিটকারী পক্ষের আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব যুগান্তরকে বলেন, এই রিট আবেদনের শুনানি হয়নি। তবে এটি তালিকায় আছে।

সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী চৌধুরী মো. রেদোয়ান-ই-খোদা গত ২৩ ফেব্রুয়ারি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ এবং গণভোট অধ্যাদেশের ৩ ধারা ও তফসিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একটি রিট করেন। এছাড়া জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ এবং এর আলোকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যের শপথের জন্য গত ১৬ ফেব্রুয়ারি দেওয়া চিঠির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী গাজী মো. মাহবুব আলম আরেকটি রিট করেন। এই রিটের নিষ্পত্তি না হলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

বিদ্যমান শাসন কাঠামোয় ক্ষমতাসীন দলের কাছে একচেটিয়া ক্ষমতা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সরকারপ্রধান, সংসদ নেতা একই সঙ্গে দলের প্রধান। আর জুলাই সনদের মূল কথা হচ্ছে-রাষ্ট্র সংস্কারের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলের একচেটিয়া ক্ষমতা কমানো। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় প্রধানমন্ত্রী-রাষ্ট্রপতির ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগসংক্রান্ত বিধিবিধান করা।

এদিকে জুলাই বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনের জন্য ইতোমধ্যে ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করেছে সংসদের সরকারি দল বিএনপি। তবে বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বলছে, সংশোধন নয়, গণভোটের রায় অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। তা না হলে সংসদের পাশাপাশি তারা রাজপথে আন্দোলনে নামবেন। কমিটি এরই মধ্যে প্রথম মিটিং করেছে।

রাষ্ট্র সংস্কারে ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর বিএনপি ও জামায়াতসহ দেশের ৩০টি রাজনৈতিক দল জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করে। এই সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে ৪৭টি প্রস্তাব বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হলো-প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণ, সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা। বাকি ৩৭টি প্রস্তাব আইন বা নির্বাহী আদেশে বাস্তবায়ন সম্ভব। ওই বছরের ১৩ নভেম্বর জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেন রাষ্ট্রপতি। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে গণভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদ ও বাস্তবায়ন আদেশ পাশ হয়। অর্থাৎ জুলাই সনদ নিজে সংবিধান নয়; কিন্তু এটি রাষ্ট্র সংস্কারের একটি নীতিগত ও রাজনৈতিক রূপরেখা। জুলাই আদেশে উল্লেখ আছে, নির্বাচনের পর সংসদ-সদস্যরা দুটি দায়িত্ব পালন করবেন। সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকে পরবর্তী ১৮০ দিন সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসাবে কাজ করবে। আর সংবিধান সংশোধনের পর তারা কাজ করবেন নিয়মিত আইনসভার সদস্য হিসাবে। তবে নির্বাচনের পর এ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতবিরোধ শুরু হয় যা এখনো অব্যাহত আছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার প্রথম দফায় ৬টি সংস্কার কমিশন গঠন করে। এগুলো হলো-সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, পুলিশ, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন এবং দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশন। পরে স্থানীয় সরকার, গণমাধ্যম, স্বাস্থ্য, শ্রম ও নারীবিষয়ক আরও পাঁচটি কমিশন কাজ করে। মোট ১১টি কমিশন রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাত নিয়ে কয়েকশ সুপারিশ দিয়েছে। এই সুপারিশের আলোকে রাষ্ট্র সংস্কারে চূড়ান্ত সুপারিশের জন্য জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদ প্রস্তুত করে দিয়ে যায়।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম