Logo
Logo
×
   

প্রথম পাতা

ভারতে বসে হাসিনার কর্মকাণ্ড

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন অস্থিরতা

হক ফারুক আহমেদ

হক ফারুক আহমেদ

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন অস্থিরতা

ভারতের মাটিতে বসে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য জুলাই শহীদদের প্রতি অবমাননা বলে আখ্যা দিয়েছে ঢাকা। এতে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। ভারত সরকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বললেও তাদের পরোক্ষ সমর্থন ছাড়া দিল্লিতে এমন আয়োজন কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, এ ঘটনায় ভারতের ‘দ্বিমুখী নীতি’ স্পষ্ট হয়েছে। এদিকে প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে চাপ বাড়িয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

বুধবার সন্ধ্যায় ভারতের নয়াদিল্লির ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব (এফসিসি) অব সাউথ এশিয়ার নির্ধারিত এক প্রেস কনফারেন্সে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। এতে আলোচকদের মধ্যে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী ও ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান ছিলেন। এই আয়োজনের কয়েকদিন আগেই শেখ হাসিনা যেন ভারত থেকে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য না দেন, সে বিষয়ে দেশটির সহযোগিতা চাওয়া হয়েছিল। সোমবার পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠকেও বিষয়টি তোলা হয়। একই দিন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার বিষয়ে ভারতকে তার অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন। একদিন পর মঙ্গলবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল নিয়মিত এক ব্রিফিংয়ে জানান, শেখ হাসিনার বক্তব্য দেওয়ার আয়োজনে ভারত সরকারের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। তাই এর দায়ও তারা নেবে না। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ্ যুগান্তরকে বলেন, প্রথমত একজন ফেরারি ও দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসাবে তার এই বক্তব্য দেওয়া সাজে না। জানি না, আইনগতভাবেও এই বক্তব্যের কোনো গ্রহণযোগ্যতা আছে কি না। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের মানুষ তার শাসনকাল দেখেছে। তার অত্যাচার, অবিচার, দুঃশাসন দেখেছে। তিনি কীভাবে জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন, সেটি প্রত্যক্ষ করেছে। তারপর আবার তাকে দেশের মানুষ হাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নেবে, এটি একেবারেই অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। তিনি কল্পনার রাজ্যে বসবাস করছেন এবং বাস্তবতাকে অস্বীকার করছেন।

এদিকে শেখ হাসিনাকে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় বুধবার রাতেই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকী উদযাপনের দিন ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার এই মতবিনিময় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি গুরুতর অপমান। এটি বাংলাদেশ-ভারতের সৌহার্দপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিকাশে ক্ষতিকর। 

এতে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে শিশুসহ নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের হত্যাকাণ্ড নিয়ে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত তথ্য অস্বীকার করা ইতিহাসের গতিপথ উলটে দেওয়ার একটি ব্যর্থ চেষ্টা। শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীরা এ ধরনের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ২০১৩ সালের বাংলাদেশ-ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য ভারত সরকারের কাছে বারবার অনুরোধ জানানো হলেও এখনো কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবির যুগান্তরকে বলেন, শেখ হাসিনা তার নিজ দেশে ফিরে আসতে চাইতেই পারেন। কিন্তু বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই তাকে দেশে আসতে হবে। তবে তিনি যা বলছেন আর তার সরকারের সময়ে বাস্তব অবস্থা যা ছিল-দুটো এক নয়।

এদিকে শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর কয়েকটি মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলেছিলেন। এর আগে বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও জাপানের বার্তা সংস্থা কিয়োডো নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি চলতি বছরের ডিসেম্বরে দেশে ফেরার কথা জানিয়েছিলেন। একই কথা বলেছেন দিল্লির প্রেস কনফারেন্সেও। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতই তাকে এভাবে কথা বলার সুযোগ করে দিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শাহিদুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, শেখ হাসিনাকে গণমাধ্যমে এভাবে কথা বলেতে দেওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশ বিষয়ে ভারতের দ্বিমুখী নীতি স্পষ্ট হয়েছে। আমি বলব, ভারত বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এতে বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের প্রতি তাদের অবজ্ঞা, অনীহা প্রকাশ পায়। তিনি বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শেখ হাসিনার বক্তব্যের বিষয়ে যে বক্তব্য দিয়েছে, তা অত্যন্ত সাহসী ও সময়োপযোগী। প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতের বিষয়ে যে অবস্থান নিয়েছেন, সেটিও সঠিক আছে বলে মনে করি।

একটি কূটনৈতিক সূত্র বলছে, বারবার সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলা হলেও কিছুদিন পরপর একটি নতুন বিষয় সামনে এনে অস্বস্তি তৈরি করছে ভারত। এতে বর্তমান সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে সত্যিকার অর্থেই একটি অর্থবহ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক তৈরি হবে কি না, তা নিয়ে অস্পষ্টতা আছে। তবে শেখ হাসিনা ইস্যুতে পুরো বিষয়টি একটু ভিন্নভাবে দেখেন সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিক মুন্সী ফয়েজ আহমদ। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার যদি জনসমর্থন না থাকে, তাহলে তিনি কী বললেন বা করলেন, তা নিয়ে অস্থির হওয়ার কিছু নেই। জনসমর্থন না থাকলে তিনি কখনো দেশে এলেও প্রক্রিয়া অনুযায়ী যা হওয়ার তাই হবে। এখানে ভারতকে কিছু বলে লাভ নেই। শেখ হাসিনা সেখানে আশ্রিত। কিন্তু তাই বলে ভারত তো তার কথা বলার অধিকার বন্ধ করতে পারে না। তিনি বলেন, সবকিছুর পরও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন বা কার্যকরী একটি সম্পর্ক প্রয়োজন। কারণ, ভারতের সঙ্গে কার্যকরী একটি সম্পর্ক হলে শেখ হাসিনা বা তার দলের অনেক প্রচেষ্টা ব্যর্থ করা সম্ভব।


Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম