চালকের কাছে যাত্রীর জীবন মূল্যহীন
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশের একেকটি সড়ক-মহাসড়ক যেন হয়ে উঠেছে মৃত্যুকূপ। জীবন এখানে মূল্যহীন। চালকের দক্ষতার অভাব, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, বেপরোয়া গতি, সড়কের বেহাল ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ শুক্রবারের দুটি বড় দুর্ঘটনা সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। একজন প্রাইভেটকার যাত্রীর ধারণ করা মোবাইল ফুটেজে সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলায় দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষের দৃশ্য ধরা পড়ে। এতে দেখা যায়, দ্রুতগতির একটি বাস অপরদিকের বাসকে পাশাপাশি অতিক্রম করার সময় ভয়ানকভাবে চাপা দেয়। এ সময় একটি বাস পাশের খাদে পড়ে যায় এবং আগুন ধরে যেতে দেখা যায়। এ ঘটনায় ৯ জন নিহত ও আরও বেশ কয়েকজন যাত্রী আহত হন। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে এই দুর্ঘটনা ঘটে। একই দিন সকালে বগুড়া সদর উপজেলায় বগুড়া-নওগাঁ মহাসড়কে পৃথক ঘটনায় বাসচাপায় ৯ জন নিহত ও অন্তত ২৪ জন আহত হন। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও ৬ জনসহ একদিনে ২৪ জনের প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। এসব ঘটনায় সড়কে যাতায়াত এখন রীতিমতো ভীতির কারণ হয়ে উঠেছে।
২০২৫ সালে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৯ হাজারের বেশি মানুষ। চলতি বছরের জুলাই মাসেই ৪ শতাধিক মানুষ মারা যান। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্ঘটনার পর জড়িত চালক, হেলপার বা বাস মালিকদের শাস্তির আওতায় আনার ব্যর্থতা এবং ‘বিচারহীনতা’র কারণে সড়ক নিরাপদ হচ্ছে না। বেপরোয়া চালকদের কারণে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ পৃথিবী থেকে চলে যাচ্ছেন। সড়কের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর মিছিল ঠেকাতে সব অংশীজনকে নিয়ে ‘সমন্বিত ও যুগোপযোগী’ পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মত দেন তারা।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার তুলনায় মামলা দায়েরের সংখ্যা খুবই কম। আবার যেসব ঘটনায় মামলা হয়, সেগুলোর নিষ্পত্তি ও বিচারের উদাহরণ আরও কম। দুর্ঘটনার পর দায়েরকৃত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি ও যথাযথ বিচার হলে চালকরা বেপরোয়া মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসতেন। একইভাবে মালিকরাও ফিটনেসবিহীন যানবাহন সড়ক থেকে উঠিয়ে নিতেন। তিনি বলেন, আহত বা নিহত পরিবারগুলো সরকার বা পরিবহণ মালিকপক্ষের কাছ থেকে তেমন ক্ষতিপূরণও পায় না।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, সড়কে দুর্ঘটনার পর চাপের মুখে মামলা হলেও তদন্ত যথাযথ প্রক্রিয়ায় এগোয় না। আসামিদের গ্রেফতার ও অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশের ‘ধীরে চলো’ নীতি রয়েছে। অভিযোগপত্র দেওয়ার আগে তদন্তের বিষয়ে বাদীকে জানানোর নিয়ম থাকলেও তা মানা হয় না। ফলে মামলার বিচারও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় শুরু হয় না।
সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় যে মামলাগুলো হয় সেগুলো চূড়ান্ত পর্যায়ে যাওয়ার আগে বেশির ভাগই কম্প্রোমাইজ (আপস) হয়ে যায়। ১ শতাংশ মামলারও চূড়ান্ত বিচার হয় না।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, সড়ক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের অভিমত, আমাদের দেশে যেটাকে ‘দুর্ঘটনা’ বলা হয়, সেটা প্রকৃতপক্ষে মানবসৃষ্ট ‘হত্যাকাণ্ড’। যদি চালকদের লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস ও সড়ক ঠিক থাকে, সেই সঙ্গে রোড সংকেত ও আচরণবিধি মেনে চলার পর দু-চারটি ঘটনা ঘটে-তবেই তাকে দুর্ঘটনা বলা যায়। কিন্তু এ দেশে সড়ক ব্যবস্থাপনা ঠিক না করে প্রতিমুহূর্তে হত্যার আয়োজন হচ্ছে। এক্ষেত্রে যার যতটুকু দায়, সে অনুযায়ী বিচার করা উচিত।
২০১৮ সালে ঢাকার দুই কলেজ শিক্ষার্থী বাসচাপায় নিহত হলে সারা দেশে নিরাপদ সড়কের দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। শিক্ষার্থীদের ব্যাপক আন্দোলনের মুখে ওই বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর ‘সড়ক পরিবহণ আইন-২০২৮’ পাশ করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। ২০১৯ সালের ১ নভেম্বর থেকে আইনটি কার্যকর হয়। পরে ২০২২ সালের ২৭ ডিসেম্বর এ আইনের আওতায় জারি হয় ‘সড়ক পরিবহণ বিধিমালা-২০২২।’ শুরু থেকেই আইনটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, আইনে নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। পরে ২০২৪ সালে পরিবহণ সিন্ডিকেটের চাপে আইনটির অন্তত ১০ জায়গায় সংশোধনী এনে শাস্তি ও জরিমানা কমানো হয়। তখন অধিকারকর্মীরা অভিযোগ করেন, সরকার জনস্বার্থ উপেক্ষা করে পরিবহণের প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কাছে নতি স্বীকার করেছে। বর্তমানে সেই সংশোধনী খসড়াতেই ঝুলে আছে আইনটি।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য বলছে, গত বছর (২০২৫ সালে) রাজধানীসহ সারা দেশে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৯ হাজার ১১১ জন। এতে আহত হয়েছেন ১৪ হাজার ৮১২ জন। তবে সড়ক, রেল ও নৌপথ মিলিয়ে মোট দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ৭ হাজার ৩৬৯টি, যেখানে ৯ হাজার ৭৫৪ জন নিহত হয়। সংস্থাটির তথ্যমতে, মহাসড়কে ছোট যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় দুর্ঘটনার হার বেড়েছে। এসব দুর্ঘটনায় বছরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি।
দুর্ঘটনার ‘স্থান’ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জাতীয় মহাসড়ক ৩৮.২২ শতাংশ, আঞ্চলিক মহাসড়ক ২৭.১৩ শতাংশ এবং ফিডার রোডে ২৮.৮৩ শতাংশ দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। শহর এলাকার মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে ৪.২২ শতাংশ এবং চট্টগ্রাম মহানগরীতে ০.৯০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে। জাতীয় মহাসড়কে এবং আঞ্চলিক মহাসড়কে দুর্ঘটনা বৃদ্ধির মূল কারণ ছোট যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি। মোটরসাইকেল, ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশা অবাধে চলাচলের কারণে দুর্ঘটনার মাত্রা ও তীব্রতা দুটিই বেড়েছে।
দুর্ঘটনার ‘ধরন’ বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট দুর্ঘটনার ৪৮.৮৪ শতাংশ পথচারীকে গাড়িচাপা দেওয়া, মুখোমুখি সংঘর্ষ ২৬ শতাংশ, নিয়ন্ত্রণ হারানো ১৮.৬৩ শতাংশ, চাকায় ওড়না প্যাঁচিয়ে যাওয়াসহ অন্যান্য কারণে ০.৪৪ শতাংশ এবং ট্রেন-যানবাহন সংঘর্ষ ০.৬৮ শতাংশ।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সাড়ে ৭ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় মোট নিহত হয়েছে ৪৮ হাজার ৭১৩ জন। সবশেষ জুলাই মাসে দেশে ৪৫৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪১৬ জন নিহত ও ৬২৯ জন আহত হয়েছেন। নিহতের সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়, যা মোট নিহত হওয়ার এক-তৃতীয়াংশের বেশি। এ মাসেও বেশির ভাগ দুর্ঘটনা ঘটেছে জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে। জাতীয় মহাসড়কে ১৬৯টি ও আঞ্চলিক সড়কে ১৫৫টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জুলাই মাসে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে। এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৬৪টি। মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে ১২৩টি। পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেওয়ার ঘটনা ১০৮টি। এছাড়া একটি যানবাহনের সঙ্গে আরেকটির পেছন থেকে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে ৫৪টি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, এক বা একাধিক কোম্পানির অধীনে নির্দিষ্ট বাস পরিচালনা করা হলে যাত্রী নিয়ে যাতায়াতে প্রতিযোগিতা বন্ধ হবে। এর সঙ্গে চালকদের নিয়মিত ডোপ টেস্ট, ফিটনেসবিহীন গাড়ি শতভাগ অপসারণ, সিসিটিভি ক্যামেরায় গতিসীমা লঙ্ঘন মনিটরিংসহ চালক ও পথচারীদের সচেতন করতে হবে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক এম শামসুল হক যুগান্তরকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সরকারি-বেসরকারি সব স্টেকহোল্ডারকে নিয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে অবকাঠামোগত উন্নয়নে সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। ফুটপাত মুক্ত করে পথচারীদের চলাচল উপযোগী করার ওপর জোর দেন তিনি।

