শাবাশ বাংলাদেশ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কোনো কোনো চিত্রনাট্য এত সরলীকরণ হয় যে, শুরুতেই বোঝা যায় শেষটা কেমন হবে। ডারউইন টেস্টের গল্পটাও ঠিক তাই। অফ-স্টাম্পের বাইরের বল কাট করে মুমিনুল হক ডিপ ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট দিয়ে দড়ির ওপারে পাঠাতেই বাংলাদেশের ‘মধুরেণ সমাপয়েৎ’। যেন কাট নয়, তুলির শেষ আঁচড়। ক্যানভাসে সব রংই ছিল, বাকি ছিল শুধু ওই বাউন্ডারি। যার স্পর্শে বাংলাদেশের প্রথম অস্ট্রেলিয়া-জয়। ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে তখন লাল-সবুজের যৌবন গর্জন। সে এক পাগলপারা উদ্যাপন। উজ্জ্বল সূর্যের নিচে (ডারউইনে তখন বেলা ২টা ৩৬ মিনিট) সশব্দ সোল্লাসে, অমৃততুল্য জয়ের সুঘ্রাণে মাতোয়ারা প্রবাসীরা অবগাহন করেছেন আনন্দরথে।
গ্রন্থনির্মাণে লেখক যেমন নিজের সত্তা-আবেগ বিলিয়ে দেন প্রতিটি অক্ষরে, শব্দচয়নে, বাক্য বিন্যাসে-ডারউইন টেস্টে জয়ের সৌধ নির্মাণে তেমনই প্রতিভা ও পরিশ্রমের এক একটি ইট সাজিয়েছেন হাসান মাহমুদ, তানজিদ হাসান, নাজমুল হোসেন শান্ত ও মেহেদী হাসান মিরাজরা। তাদের এমন অকুতোভয় ও অবিস্মরণীয় নৈপুণ্যভাস্বর ক্রিকেটীয় কৌলীন্যে দর্পচূর্ণ হয়েছে বিশ্বের এক নম্বর টেস্ট দলের। চারদিনেরও কম সময়ে টেস্ট র্যাংকিংয়ের নয় নম্বর দল নয় উইকেটে অস্ট্রেলিয়াকে তাদেরই আঙিনায় পরাভূত করবে, তা কে ভেবেছিল।
২৩ বছর পর প্রথম অস্ট্রেলিয়া সফরে বাংলাদেশের এমন শৃঙ্গস্পর্শী জয় আরেক ‘প্রথমেরও’ জন্ম দিল-অস্ট্রেলিয়ায় তিন ম্যাচে প্রথম টেস্ট জয়। আর সব মিলিয়ে সাত টেস্টে দ্বিতীয় জয়। প্রথমটি মিরপুরে ২০১৭ সালে।
টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামার পর থেকে অস্ট্রেলিয়ার দুর্দশা-দুর্বিপাক-দুর্যোগের শুরু। আর বাংলাদেশ শুরু থেকে শেষাবধি ব্যাটে-বলে দামাল ক্রিকেটের দস্যিপনায় অসিদের নাভিশ্বাস তুলে ঐতিহাসিক জয়ের কাব্য লেখে। যে জয়কে যথার্থভাবেই অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত যে কোনো ফরম্যাটে নিজেদের সর্বকালের সেরা জয় বলে উল্লেখ করেছেন।
ঐতিহাসিক, অবিস্মরণীয়-যা-ই বলুন, বাংলাদেশের এই অভূতপূর্ব জয় আত্মবিশ্বাসের জ্বালানির অবারিত জোগান দেবে আগামী দিনগুলোতে। ডারউইন টেস্টে বাংলাদেশের অন্যতম বর্ণিল চরিত্র মেহেদী হাসান মিরাজ তাই এমন মাদকতাময় ও মনোহর জয়ের মোমেন্টাম ধরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তার সতীর্থদের প্রতি। তিনি এও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। নিজেদের ডেরায় এভাবে বিব্রতকর পরাজয়ের পর অস্ট্রেলিয়া যে পরের টেস্টে ঝাঁপিয়ে পড়বে, সেকথা তো জানাই।
তবু প্রবল প্রতিপক্ষের আঙিনায় তাদের অপদস্ত করা, তাদের ক্রিকেটীয় আভিজাত্যে-অহংয়ে আঘাত করা-এ তো এভারেস্ট জয়ের চেয়ে কম নয়। তাই শনিবার শুরু হতে যাওয়া ম্যাকে টেস্ট নিয়ে অত ভাবাভাবির কী আছে। রবিবাসরীয় সুখস্নাত জয় নিয়ে আপাতত বিভোর থাকলেই হয়।
বাংলাদেশ শুধু কি অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছে? তাবৎ বোদ্ধাও কি বোকা বনে যাননি? খোদ অ্যাডাম গিলক্রিস্ট অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেওয়া মেহেদী হাসান মিরাজের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে স্বীকার করতে কুণ্ঠিত হননি যে, বাংলাদেশ অবাক করে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়াকে। ‘তোমরা যে এভাবে ক্রিকেট খেলতে পারো, ভাবিনি,’ গিলক্রিস্টের অকপট স্বীকারোক্তি।
অবাক পৃথিবী এখন বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে ভাবছে-এত সুন্দর, এত নিষ্ঠুর ক্রিকেট কীভাবে খেললে তোমরা।

