বাংলাদেশের অস্ট্রেলিয়া-জয়
অবিস্মরণীয় অনন্য অর্জন
টেস্টের এক নম্বর অস্ট্রেলিয়াকে তাদের মাটিতে প্রথমবার হারিয়ে ইতিহাস গড়ার উচ্ছ্বাসে ভাসলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা -বিসিবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অস্ট্রেলিয়ার ক্যাঙ্গারু সাম্রাজ্যে দীর্ঘ ২৩ বছর পর পা রেখেই বিশ্ব ক্রিকেটে এক মহাজাগতিক ভূকম্পন সৃষ্টি করল বাংলাদেশ। অপেক্ষার প্রহর ছিল দীর্ঘ, পরীক্ষাটাও কঠিন। রোববার ডারউইনে সেই অপেক্ষার অবসান হলো এমন এক জয়ে, যা বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে আলাদা করে লেখা থাকবে। টেস্টের এক নম্বর দল অস্ট্রেলিয়াকে তাদের মাঠেই নয় উইকেটে হারিয়ে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে এটি বাংলাদেশের প্রথম জয়। শুধু জয় নয়, চার দিনজুড়ে দাপট দেখিয়ে স্বাগতিকদের রীতিমতো বিধ্বস্ত করে ছেড়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। অবিস্মরণীয় জয়ে ডারউইন থেকে এখন ইতিহাসের পাতায় বাংলাদেশ। হারের পর অসি অধিনায়ক প্যাট কামিন্সের সরল স্বীকারোক্তি, ‘সব বিভাগেই তারা আমাদের পর্যুদস্ত করেছে।’ অন্যদিকে বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত বলেন, ‘এটা এখন পর্যন্ত যে কোনো সংস্করণে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জয়।’ মহাকাব্যিক জয়ে দুই ম্যাচের সিরিজে বাংলাদেশ এগিয়ে গেল ১-০ ব্যবধানে। ২২ আগস্ট ম্যাকইয়ে শুরু হবে দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট।
অস্ট্রেলিয়ার দেওয়া ৫৭ রানের লক্ষ্য ছুঁতে বাংলাদেশের লেগেছে মাত্র ১৪.২ ওভার। এক উইকেট হারিয়ে জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায় তারা। মুমিনুল হক ৩০ ও সাদমান ইসলাম ২৫ রানে অপরাজিত থেকে ম্যাচ শেষ করেন। স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ৩৬ মিনিটে মুমিনুলের ব্যাট থেকে আসে জয়সূচক বাউন্ডারি। এরপর মারারা ওভালে শুরু হয় লাল-সবুজ উৎসব।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এটি বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়। এর আগে অস্ট্রেলিয়ায় খেলা দুই টেস্টেই ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশ। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ফিরে এবার সেই আক্ষেপ ঘুচল। ২০১৭ সালে দেশের মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর পর এবার তাদের মাঠেও একই কীর্তি গড়ল বাংলাদেশ। সাড়ে তিনদিনে পাওয়া দাপুটে জয়ের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন বোলাররা। প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেন হাসান মাহমুদ, ইবাদত হোসেনরা। হাসান নেন ছয় উইকেট। জবাবে তানজিদ হাসানের ১০১, নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪ এবং মেহেদী হাসান মিরাজের ৬৫ রানে ভর করে ৪২৬ রান করে বাংলাদেশ। লিড ২২৮ রানের। বিশাল সেই লিডই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের গতিপথ ঠিক করে দেয়। দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া লড়াইয়ের চেষ্টা করলেও মিরাজের ঘূর্ণি ও হাসানের পেসের সামনে বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি। মিরাজ নেন পাঁচ উইকেট। হাসানের শিকার আরও তিন। দুই ইনিংস মিলিয়ে নয় উইকেট নিয়ে হাসান মাহমুদই ম্যাচসেরা। ২৮৪ রানে থেমে যায় অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংস। স্বাগতিকদের হয়ে প্রতিরোধ গড়েন ক্যামেরন গ্রিন। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ব্যাট করে ২০১ বলে ১০৪ রান করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত বিফলে যায় ঘরের মাঠে তার প্রথম সেঞ্চুরি। হাসান মাহমুদের নিচু হয়ে আসা বল ব্যাটের কানায় লেগে স্টাম্পে আঘাত হানতেই শেষ হয় গ্রিনের প্রতিরোধ। এরপর নাথান লায়নকে এলবিডব্লু করে অস্ট্রেলিয়ার শেষ উইকেটটি তুলে নেন মিরাজ। তাতে বিদেশের মাটিতে তৃতীয়বার টেস্টে পাঁচ উইকেটের কীর্তি গড়েন তিনি। টেস্ট ক্যারিয়ারে এটি তার ১৫তম পাঁচ উইকেট। মুত্তিয়াহ মুরালিধরন, হরভাজন সিং, রবীচন্দ্রন অশ্বিন, ইয়াসির শাহ, রবীন্দ্র জাদেজার মতো গ্রেট স্পিনাররাও কখনো অস্ট্রেলিয়ায় পাঁচ উইকেটের স্বাদ পাননি।
এই জয়ের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক ছিল ম্যাচের আগে বাংলাদেশের অবস্থান। প্রস্তুতি ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হয়েছিল তারা। দলে ছিলেন না পেস আক্রমণের বড় ভরসা নাহিদ রানা। এমন পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে অস্ট্রেলিয়াকে উড়িয়ে দেওয়াই বাংলাদেশের বদলে যাওয়া মানসিকতার প্রমাণ। জয়ের পথে সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম হাসান মাহমুদ। তানজিদ পেয়েছেন ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি। মিরাজ ব্যাট হাতে ৬৫ রানের পর বল হাতে পাঁচ উইকেট নিয়ে হয়ে উঠেছেন জয়ের আরেক প্রধান কারিগর। আর ব্যাট হাতে ৮৪ রানের পাশাপাশি নাজমুলের নেতৃত্বও ছিল প্রশংসনীয়।
এই জয়ের আরেকটি তাৎপর্য আছে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে তাদের হারানো এশিয়ার দলগুলোর তালিকায় এতদিন ছিল শুধু ভারত ও পাকিস্তানের নাম। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো বাংলাদেশ। জয়ের পর বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দলের ম্যানেজার নাফিস ইকবালের ফোনে ভিডিও কলে ক্রিকেটারদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। অধিনায়ক নাজমুল বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। আমাদের অভিনন্দন জানিয়েছেন।’
এদিকে হারের পর অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞ ক্রিকেটার স্টিভ স্মিথ বলেন, ‘হারের কারণটা খুবই সরল। বাংলাদেশ আমাদের উড়িয়ে দিয়েছে।’ (স্কোর কার্ড খেলার পাতায়)

