Logo
Logo
×
   

প্রথম পাতা

শুধু বন্দি রেখেই নিরাময় সম্ভব নয়

ইয়াবা সেবনে হার্ট অ্যাটাকে মারা যাচ্ছে কিশোর-তরুণরাও

Icon

অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ইয়াবা সেবনে হার্ট অ্যাটাকে মারা যাচ্ছে কিশোর-তরুণরাও

প্রতীকী ছবি

আমাদের দেশে মাদকাসক্তির চিকিৎসা মানেই দীর্ঘ সময় বন্দি রাখা। কিন্তু মাদকাসক্তি নিরাময়ের ক্ষেত্রে বন্দিত্বই একমাত্র চিকিৎসা নয়। সুস্থ করে তোলার প্রক্রিয়ায় রোগীকে কিছু সময়ের জন্য কিছুটা বিচ্ছিন্ন করা যেতে পারে। কিন্তু কোনোভাবেই তাকে কারাগারের মতো বন্দি অবস্থায় রাখা যাবে না। বরং এজন্য প্রয়োজন সঠিক ওষুধ এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা। এছাড়াও বেশকিছু কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে মাদকাসক্তি নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে থাকে।

তবে বিশ্বব্যাপী মাদকাসক্তির চিকিৎসায় নানা ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। কোথাও প্রচণ্ড খরতাপের মধ্যে কিংবা উত্তপ্ত বালুতে রেখে শরীরকে সম্পূর্ণ বিষমুক্ত করার চেষ্টা হয়, যা এক ধরনের অপচিকিৎসা। এতে তেমন কোনো সুফল মেলে না। কিছুদিন পরই ফের আসক্তিতে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা দেখা দেয়। আমাদের দেশেও এ ধরনের কিছু অপচিকিৎসা হয়ে থাকে। এতে সুস্থতার বদলে রোগী বরং আরও গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। সমাজে মাদক গ্রহণের নানা ধরনের কারণ দেখা যায়। কেউ কৌতূহল থেকে, কেউবা বন্ধুদের চাপে কিংবা সাময়িক আনন্দ উপভোগের জন্য মাদকের পথে পা বাড়ায়। এছাড়া প্রেমে ব্যর্থতা, সংসারে বিচ্ছেদসহ নানা ধরনের দুঃখকষ্ট ভুলে থাকার জন্যও অনেকে মাদক গ্রহণ করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ‘ম্যাল অ্যাডাপ্টিভ কোপিং’। অর্থাৎ ভুল পথে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা। কারণ, মাদক কখনোই দুঃখকষ্ট দূর করতে পারে না। মাদকসেবনের প্রতিক্রিয়ায় মূলত মানুষের স্বাভাবিক আবেগ, অনুভূতি ও চিন্তা কাজ করে না। তখন এক ধরনের ঘোর লাগা অনুভূতি তৈরি হয়।

মাদকাসক্তি থেকে দ্রুত মুক্তি না পাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে রিট্রাইভাল কিউ বা মস্তিষ্কের দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি। বাইরে থেকে কোনো ওষুধ প্রয়োগ করে মস্তিষ্টের কোনো স্মৃতি সহজে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। ফলে মাদকসেবনের স্মৃতি বারবার ফিরে আসে, যা আসক্ত ব্যক্তিদের নেশার জগতে টেনে নিয়ে যায়। এছাড়া মাদক গ্রহণের ফলে ডোপামিন নামের এক ধরনের হরমোন একসঙ্গে প্রচুর পরিমাণে নিঃসরণ হয়। এতে মানব মস্তিষ্কের একটি অংশ (নিউরো ট্রান্সমিটার এবং রিওয়ার্ড সেন্টার) সাময়িকভাবে উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে। এক ধরনের ভালো লাগা বা আনন্দের অনুভূতি তৈরি হয়। ফলে ক্রমাগত এমন আনন্দ পেতে মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সেন্টার আরও বেশি মাদক গ্রহণের বার্তা পাঠায়। এ কারণেই মাদকসেবীরা বারবার নেশার জগতে ফিরে আসে।

এভাবে ক্রমাগত মাদকসেবনের এক পর্যায়ে নেশা ছাড়া জীবন অচল হয়ে পড়ে। তখন আনন্দ পাওয়ার বদলে মাদকসেবন না করলে ভয়ংকর যন্ত্রণা হয়। ফলে কষ্ট থেকে বাঁচতে আরও বেশি করে মাদকসেবন করতে হয়। এভাবে মাদকের কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকে না। এরপর ধীরে ধীরে মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। তখন কেউ কেউ আত্মহননের মতো চরম পথ বেছে নেন। এ কারণে কেউ একবার মাদকাসক্ত হয়ে পড়লে তার দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন হয়। তবে নানা ধরনের চিকিৎসায় মাদকাসক্তি নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও যে কোনো সময় ফের মাদকে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। এমনকি নেশা ছেড়ে দেওয়ার ৩০ কিংবা ৪০ বছর পরও ফের মাদক গ্রহণের ইচ্ছা হতে পারে।

তবে আমাদের দেশে অ্যামফিটামিনজাতীয় মাদক (ইয়াবা ও আইস) ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। একেবারে গ্রামীণ জনপদেও ইয়াবা বিক্রি হয়। ফলে মাদকাসক্ত তরুণদের অনেকে অসময়ে হৃদরোগে মারা যাচ্ছে। সম্প্রতি ২০ বা ২৫ বছর বয়সি কিশোর ও তরুণরাও বুকে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। অথচ এ বয়সে তাদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সেটাই হচ্ছে। এছাড়া মাদকসেবনের কারণে অনেকের মধ্যে মানসিক ভারসাম্যহীনতা কিংবা সিজোফ্রেনিয়ার মতো অবস্থায় দেখা যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে সাবসস্টেন্স ইনডিউসড সাইকোসিস। অর্থাৎ মাদকসেবনজনিত মানসিক বৈকল্য। এর চিকিৎসা বেশ জটিল ও ব্যয়বহুল।

সমাজের কতটা গভীরে মাদকের বিস্তার ঘটছে, সে সম্পর্কে একটা প্রকৃত চিত্র নানা কারণে জানা সম্ভব হচ্ছে না। প্রচলিত ডোপ টেস্ট পদ্ধতিতে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব নয়। কারণ, একটি নির্দিষ্ট সময় পর ডোপ টেস্ট করা হলে দেহে মাদকের অস্তিত্ব ধরা নাও পড়তে পারে। প্রকৃত অবস্থা জানতে হলে বিশেষ ধরনের জরিপ বা এথনোগ্রাফি সার্ভে করা প্রয়োজন। এ পদ্ধতিতে নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন মাদকসেবীদের কাছে গিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে হয়।

আমাদের বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় নীতিতে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা বলা হলেও বাস্তবে সেটি দেখা যাচ্ছে না। ফলে টানা যাচ্ছে না মাদকের লাগাম। এক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স বাস্তবায়ন করতে হলে অবশ্যই একটি সমন্বিত কর্মকৌশলের সাহায্য নিতে হবে। এজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বিচার বিভাগ, কাউন্সেলর, চিকিৎসা, সংবাদমাধ্যম এবং সর্বোপরি নাগরিক সমাজ-অর্থাৎ প্রতিটি স্তরের অংশগ্রহণ ছাড়া মাদকের ভয়াবহ বিস্তার থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .