Logo
Logo
×
   

প্রথম পাতা

বিশেষ সাক্ষাৎকার : রুহুল কবির রিজভী

জনসমর্থন ধরে রাখাই বিএনপির অগ্রাধিকার

নূরে আলম জিকু

নূরে আলম জিকু

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জনসমর্থন ধরে রাখাই বিএনপির অগ্রাধিকার

রাজপথের দীর্ঘ সংগ্রাম, বারবার কারাবরণ আর প্রতিকূল সময়ে দলের মুখপাত্র হিসাবে অবিচল উপস্থিতি-রুহুল কবির রিজভী এখন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্বে। সরকার পরিচালনাকালীন দলের সাংগঠনিক সক্রিয়তা ধরে রাখা, নেতাকর্মীদের সুশৃঙ্খল রাখা এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় দল ও সরকারের গতিশীলতা বজায় রাখার নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে তিনি মুখোমুখি হয়েছেন যুগান্তরের। আলাপচারিতায় বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল ও সাংগঠনিক ভাবনার নানা দিক তুলে ধরেছেন তিনি। বিশেষ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন যুগান্তরের স্টাফ রিপোর্টার নূরে আলম জিকু।

যুগান্তর : ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসাবে আপনার প্রথম অগ্রাধিকার কী হবে?

রিজভী : সারা দেশে বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড আরও শক্তিশালী, সুসংগঠিত ও সুসংহত করা। আমরা সব সময় দেখেছি, দল ক্ষমতায় গেলে সাংগঠনিক তৎপরতা কমে যায়। সেটি যেন না হতে পারে, সেদিকে নজর দেব। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড করে যাব।

যুগান্তর : দীর্ঘদিন বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর কাজের ধরনে কোনো পরিবর্তন আসবে কি?

রিজভী : আশা করি না। আমি সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ছিলাম, এখন স্থায়ী কমিটির সদস্য। এছাড়া বর্তমানে সরকারপ্রধানের উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্বে আছি। সরকারি দায়িত্বে থেকে যতটুকু ভূমিকা রাখা দরকার, তা রাখব। আমি পার্টি অফিসে সব সময় সার্বক্ষণিক থাকতাম। সারা দিন অন্য কোথাও প্রোগ্রাম থাকলেও অন্তত এক ঘণ্টা সময় পেলে কার্যালয়ে অবস্থান করতাম। নেতাকর্মীরা আসতেন, তাদের সঙ্গে কথা বলতাম। নেতাকর্মীদের সঙ্গে এই যোগাযোগ রক্ষা করা এবং তারা এসে যেন আমাকে না পেয়ে ফিরে না যান-সেদিকে খেয়াল রেখে আমি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসাবে আগের মতোই দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখব।

যুগান্তর : বিএনপির সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের (বর্তমান রাষ্ট্রপতি) শূন্যতা পূরণ করা কতটা কঠিন হবে?

রিজভী : তিনি দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে একটি ভয়ংকর ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের সময় ছিল। সেই দুঃশাসনে তাকে নেতৃত্ব দিতে হয়েছে, বারবার তিনি গ্রেফতার হয়েছেন। নেতাকর্মীদের মধ্যে তার অবশ্যই একটি বড় প্রভাব রয়েছে। তিনি তখন ছিলেন দলের দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তি; অর্থাৎ চেয়ারম্যানের পরই তাকে সাংগঠনিক দায়িত্বগুলো পালন করতে হয়েছে। তাই তার একটা অভাব তো থাকবেই। তবে আশা রাখি, সেই অভাব পূরণে কোনো ধরনের শূন্যতা বা ফাঁক যেন তৈরি না হয়, সব সময় সেই চেষ্টা চালিয়ে যাব।

যুগান্তর : মির্জা ফখরুলের কোন বিষয়টি আপনি অনুসরণ করতে চান?

রিজভী : তিনি অত্যন্ত সদালাপী ও সজ্জন মানুষ। নেতাকর্মীরা তার এই আন্তরিকতাপূর্ণ আচরণ ভীষণ পছন্দ করতেন। আমি চেষ্টা করব তার এই মহান গুণ ও বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে, যাতে নেতাকর্মীরা মানসিকভাবে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

যুগান্তর : দলের ভেতরে এখন সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক দুর্বলতা কোথায় দেখছেন?

রিজভী : আমি এটাকে সাংগঠনিক দুর্বলতা বলব না। দল সরকার গঠন করলে সাংগঠনিক তৎপরতা কিছুটা কমে, এটি সব সময় সব দলের ক্ষেত্রেই দেখা গেছে। কিন্তু বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান বিষয়টিকে সেভাবে দেখছেন না। দলের তৎপরতাও বজায় থাকবে, আর সরকারে যারা রয়েছেন তারা সরকারি কাজ পরিচালনা করবেন। এছাড়া প্রতি সপ্তাহেই দু-একদিন দলের চেয়ারম্যান তৃণমূলের সঙ্গে বসছেন ও মতবিনিময় করছেন। সেখান থেকে তিনি সাংগঠনিক নানা বিষয়ে অবগত হচ্ছেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছেন। তাই মনে করি না কোনো সাংগঠনিক দুর্বলতা আছে, বরং নেতাকর্মীরা আরও উজ্জীবিত। আর যেহেতু তিনি আমাকে একটি দায়িত্ব দিয়েছেন, তাই নেতাকর্মীরা যাতে কখনোই নিজেকে অভিভাবকহীন মনে না করেন, তা দেখার চেষ্টা করব।

যুগান্তর : ক্ষমতায় আসার পর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে যে বেপরোয়া আচরণের অভিযোগ আছে, সেটি আপনি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন?

রিজভী : দেখুন, অভিযোগ উঠতেই পারে। একটি পরিবারের সব সন্তান তো একরকম হয় না; কেউ কেউ পথবিচ্যুত হয়। বিএনপি একটি বিরাট সংগঠন, এখানেও দু-একজন তেমন হতে পারে। কিন্তু দেখতে হবে অভিভাবককে, যিনি সন্তানকে শাসন করতে পারেন, শাস্তি দিতে পারেন এবং সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারেন। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঠিক সেই ভূমিকাটাই পালন করেছেন। ৫ আগস্টের পর অনেক বড় বড় নেতাকে শোকজ করা হয়েছে, দল ও অঙ্গসংগঠনগুলোর অনেক নেতাকে অব্যাহতি দেওয়া বা বহিষ্কার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে নানা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে প্রথমদিকে যে বেপরোয়া আচরণ ছিল, সেটি এখন আর নেই। জনগণও দেখছে যে, বিএনপিতে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কেউ যুক্ত হলে তাকে বিচারের ও সাংগঠনিক ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হয়। এটি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

যুগান্তর : প্রায় ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকে বিএনপি আন্দোলন করেছে। ক্ষমতায় এসে সেই বিএনপি কি বদলে যাচ্ছে?

রিজভী : নিশ্চয়ই বদলাবে না। তৃণমূলের যেসব নেতাকর্মী নানাভাবে অত্যাচারিত ও উৎপীড়িত হয়েছেন, দল প্রতিনিয়ত তাদের মূল্যায়ন করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। এ ব্যাপারে নিশ্চিত থাকুন যে, নেতাকর্মীরা কোনো ধরনের অভাববোধ করবেন না। বিগত আন্দোলনের সময় তাদের ওপর নেতৃত্বের যে ছায়া ছিল-যেমন চেয়ারম্যান স্কাইপির মাধ্যমে তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত যোগাযোগ রাখতেন; কেউ ফ্যাসিবাদের আক্রমণের শিকার হলে তিনি দ্রুত কেন্দ্র থেকে প্রতিনিধি পাঠাতেন; কোনো নারী নির্যাতিত হলে (তিনি বিএনপির সমর্থক না হলেও) কিংবা দুর্যোগ-দুর্বিপাকে পড়লে তারেক রহমানের পক্ষ থেকে সহানুভূতি ও সহযোগিতা পাঠানো হতো। এই কাজগুলো তখন থেকেই অব্যাহত আছে এবং এখনো চলছে। এগুলো দেখাশোনা করার জন্য তিনি একটি সংগঠনও গঠন করেছিলেন ‘আমরা বিএনপি পরিবার’।

যুগান্তর : বিএনপিতে ‘হাইব্রিড ও সুবিধাবাদী’দের প্রবেশ নিয়ে অনেক নেতাকর্মীর অভিযোগ আছে। এদের চিহ্নিত করতে কোনো ব্যবস্থা নেবেন কি?

রিজভী : দলের নেতাকর্মীরাই তাদের চিহ্নিত করবেন। একটি দল যখন দীর্ঘ সংগ্রামের পর ক্ষমতায় আসে, তখন সেখানে হাইব্রিডদের ভিড় জমে। তারা যাতে সুবিধা নিতে না পারে, সেজন্য আমাদের ত্যাগী নেতাকর্মী; যারা আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছেন ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন; তারা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে ব্যবস্থা নেবেন। দল বা সংগঠন শক্তিশালী করার অর্থ হলো সমাজের ভালো ও সুনামধারী মানুষ, যারা বিএনপিকে সমর্থন করলেও সক্রিয় রাজনীতি করেন না, তাদের দলে আনা। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। তবে হাইব্রিডরা এসে দলের নাম ভাঙিয়ে যাতে কোনো অনৈতিক কাজে জড়াতে না পারে, সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। দল এ ব্যাপারে সতর্ক।

যুগান্তর : অনেকের অভিযোগ ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন হচ্ছে না। এই অভিযোগ কতটুকু সত্য?

রিজভী : আমি মনে করি এটি সত্য নয়। দলের চেয়ারম্যান বিভিন্নভাবে যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করছেন। সম্প্রতি বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের অন্তত ১২ জন নেতাকে বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যারা প্রত্যেকেই মাঠের নেতা। জেলা বা বিভাগীয় শহরের আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতেও দলের যোগ্য নেতাদের মূল্যায়ন করা হয়েছে।

যুগান্তর : বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আপনার সমন্বয়ের ধরন কেমন?

রিজভী : তার সঙ্গে আগেও নানাভাবে কাজ করেছি। তিনি যখন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন, তখনো করেছি। পরে তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হওয়ার পর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবেই কাজ করেছি। পল্টন অফিস থেকে স্কাইপ সংযোগ শুরু হওয়ার পর তার নির্দেশনা ও অফিশিয়াল কাজ- যেমন সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া, পদায়ন বা মনোনীত করা, সবকিছুই একসঙ্গে মিলে করেছি। আন্দোলন-সংগ্রামের যে নির্দেশাবলি তিনি দিতেন (যেমন সর্বশেষ জুলাই বিপ্লবের সময় আমি গ্রেফতার হওয়ার আগ পর্যন্ত যত ভার্চুয়াল প্রেস কনফারেন্স করেছি), অধিকাংশই তার নির্দেশে করেছি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের আন্দোলন, ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ বা ‘বাংলা ব্লকেড’-এর মতো কর্মসূচিগুলোতে দলকে যুক্ত রাখা ও সমর্থন দেওয়ার বার্তাগুলো আমি তার পক্ষ থেকেই পৌঁছে দিয়েছি। তাই আগেও যেমন ছিল, এখনো তেমনই থাকবে। পার্টির চেয়ারম্যানের নির্দেশাবলি যাতে যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়, আমি সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে তা করে যাব।

যুগান্তর : দল ও সরকার কি আলাদা সত্তা হিসাবে কাজ করবে, নাকি সরকার পরিচালনায় দলীয় সিদ্ধান্তের প্রভাব থাকবে?

রিজভী : এটি একটি বিমূর্ত বিষয়। কারণ দল নির্বাচিত হয়েই সরকার গঠন করেছে। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপদেষ্টা আমরা প্রত্যেকেই দলের লোক। তাই দলের লোক হিসাবে তারা সরকারে কাজ করার পাশাপাশি দলের দায়িত্বও পালন করবেন, এতে কোনো জটিলতা নেই। তবে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের মতো কিছু পদ, যেগুলোতে সার্বক্ষণিক সময় দিতে হয়, সেগুলো সরকারি দায়িত্বের বাইরে স্বাধীন থাকাই ভালো। এতে পার্টি চেয়ারম্যানের কাজ পরিচালনা করতে সুবিধা হয়।

যুগান্তর : বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল কী হতে পারে?

রিজভী : বিএনপি একটি গণভিত্তিক রাজনৈতিক দল। বিএনপির অগ্রাধিকারমূলক কৌশলই হলো জনসমর্থন ধরে রাখা ও নতুন জনসমর্থন অর্জন করা। আমি মনে করি, বিএনপি সরকার সঠিক কৌশল নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে।

যুগান্তর : বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল কবে হবে?

রিজভী : দিনক্ষণ এখনো ঠিক হয়নি। দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিদ্ধান্ত নিয়ে জানাবে। তবে এটুকু বলতে পারি, খুব শিগগিরই হবে।

যুগান্তর : নেতাকর্মীদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?

রিজভী : নেতাকর্মীদের উদ্দেশে একটাই বার্তা-কে কী পেলাম বা পেলাম না, তা মুখ্য নয়; দলটি যেন জনগণের কাছে জনপ্রিয় থাকে। সবার সঙ্গে ভালো আচরণ করতে হবে। কেউ যেন বলতে না পারে যে আমরা জমিদখল বা চাঁদাবাজি করছি। নেতাকর্মীরা নিজেদের আচরণ সেভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন এবং মনে রাখবেন, তারা প্রত্যেকেই সরকারের এক-একজন প্রতিনিধি। যতক্ষণ আমরা সঠিক আইনের শাসন দিতে পারব, ততক্ষণই সরকারের গ্রহণযোগ্যতা থাকবে। অন্যায়কারী যত বড় নেতাই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনা নিশ্চিত করা হবে।

যুগান্তর : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

রিজভী : যুগান্তর ও তার পাঠকদেরও বিএনপির পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .