দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি
শপথ নিলেন মির্জা ফখরুল
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বঙ্গভবনে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে শপথ পাঠ করাচ্ছেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল -পিআইডি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ নিলেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার কিছু পরে বঙ্গভবনের দরবার হলে তাকে শপথবাক্য পাঠ করান জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হলেন। আগামী ৫ বছর মেয়াদে তিনি এ পদে আসীন থাকবেন।
শপথ গ্রহণের সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম। এ সময় অতিথির সারিতে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান, বর্তমান মন্ত্রিসভার সদস্য, বিদেশি কূটনীতিক, সংসদ-সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধান এবং বেসামরিক ও সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি।
নতুন রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানিয়ে শুভেচ্ছা বার্তা দিয়েছেন প্রতিবেশী দেশ ভারতের প্রেসিডেন্ট দ্রৌপদী মুর্মু, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারিসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান। এক শুভেচ্ছা বার্তায় দ্রৌপদী মুর্মু জানান, বাংলাদেশের জনগণের সেবায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দীর্ঘ জীবন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা একটি সফল মেয়াদের সূচনা করবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ-সদস্যদের ভোটাভুটির মাধ্যমে প্রবীণ এই রাজনীতিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। গতকাল রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বঙ্গভবনে পৌঁছলে তাকে বঙ্গভবনের সামরিক সচিব এবং অন্য সচিবরা অক্টাগনে অভ্যর্থনা জানান এবং ভিভিআইপি-১ আসনে নিয়ে যান। পরে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভ্যর্থনা জানান।
রাষ্ট্রীয় আচার ও রীতি অনুযায়ী, শপথ অনুষ্ঠান শুরুর আগে বঙ্গভবনের দরবার হলে রাষ্ট্রপতি প্রবেশ করার সময় উচ্চস্বরে আগমন বার্তা দেওয়া হয়। এর সঙ্গে সঙ্গে অর্কেস্ট্রার ঝংকারে বেজে ওঠে জাতীয় সংগীতের সুর। সে সময় প্রধানমন্ত্রীসহ অতিথিরা জাতীয় সংগীত শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে সম্মান জানান। এরপর অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি রাষ্ট্রপতির কাছে অনুমতি চান। অনুমতি পাওয়ার পর পবিত্র কুরআন থেকে তিলওয়াত হয়। পরে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে শপথ পড়ান ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। রাষ্ট্রপতি হিসাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শপথ নেওয়ার পর শপথ বইয়ে সই করেন। এরপর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ নতুন রাষ্ট্রপতিকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান এবং নতুন রাষ্ট্রপতির জন্য তিনি তার মাঝখানের চেয়ার ছেড়ে দিয়ে পাশের চেয়ারে বসেন। আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল মঞ্চ ছেড়ে অতিথিদের সারিতে বসেন। তখন রাষ্ট্রপতির দুই পাশের চেয়ারও সরিয়ে নেওয়া হয়। এখান থেকেই রাষ্ট্রপতির চেয়ারে আসীন হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দায়িত্ব নেওয়ার পরই নতুন রাষ্ট্রপতি চারজন মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রীকে শপথ বাক্য পাঠ করান। এর মাধ্যমেই রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠান শেষ হয়। এরপর সবাইকে আপ্যায়ন পর্বে অংশ নেওয়ার অনুরোধ জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
শপথ অনুষ্ঠানের শুরুতে দরবার হলের প্রথম সারিতে বসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, তার সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম, প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর সহধর্মিণী সৈয়দা শর্মিলা রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে জাইমা রহমান। নতুন রাষ্ট্রপতির পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ, ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ, বড় মেয়ের স্বামী ফাহাম আব্দুস সালাম, মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই মির্জা ফয়সাল আমিন ও মির্জা ইকবাল আমিনও ছিলেন।
প্রথম সারিতে অন্যদের মধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সমাজকল্যাণমন্ত্রী এজেডএম জাহিদ হোসেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খানকেও দেখা গেছে।
অতিথিদের সারিতে ছিলেন-সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বিমানবাহিনী প্রধান হাসান মাহমুদ খাঁন ও নৌবাহিনী প্রধান খোন্দকার মিজবাহ উল আজীম। এছাড়াও ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সেলিমা রহমান, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ প্রমুখ। রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে বঙ্গভবনের আশপাশে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
তৃণমূল থেকে রাজনীতি করে আসা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নির্বাচিত হওয়ার আগে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিবের দায়িত্বেও ছিলেন। বিএনপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়ার আগে সিভিল সার্ভিসের শিক্ষা ক্যাডারের সদস্য হিসাবে অর্থনীতিতে শিক্ষকতা করেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারি দায়িত্বও পালন করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব গ্রহণের সময়টিই ছিল দলটির ইতিহাসের এক কঠিন সময়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনে ব্যাপক দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখে পড়েন বিএনপির নেতাকর্মীরা। মহাসচিব হওয়ার আগে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোর বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। প্রথমে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং পরে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন। দীর্ঘদিন দলের অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সহসভাপতি ও পরে সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
বঙ্গভবনে নতুন রাষ্ট্রপতি উঠবেন রোববার : নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রোববার বঙ্গভবনে উঠবেন বলে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় জানিয়েছে। এদিন সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে মিন্টো রোডের সরকারি বাসভবন থেকে তিনি বঙ্গভবনের উদ্দেশে রওয়ানা করবেন। বঙ্গভবনের ২ নম্বর গেইটে পৌঁছানোর পর তাকে নিয়ে পুলিশের একটি সুসজ্জিত দল ‘গার্ড অব অনার’ মঞ্চে নিয়ে যাবে। সেখানে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের একটি চৌকস দল তাকে গার্ড অব অনার দেবে। এ পর্ব শেষে তিনি বঙ্গভবনে তার কার্যালয়ে যাবেন।
রাষ্ট্রপতি কার্যালয় আরও জানায়, শনিবার সকাল সাড়ে ৯টায় জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে যাবেন নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সেখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করার পর তাকে তিন বাহিনীর পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার দেওয়া হবে। শ্রদ্ধা জানানোর পর তিনি মিন্টো রোডের বাসায় ফিরবেন। সেখান থেকে তিনি তার গুলশানের বাসভবনে যেতে পারেন।
জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত : বঙ্গভবনে যাওয়ার আগেই বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেছেন নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শুক্রবার রাজধানীর বেইলি রোডের স্টাফ কোয়ার্টার জামে মসজিদে জুমার নামাজ পড়েন তিনি। এরপর ১টা ৪৬ মিনিটে যান শেরেবাংলা নগরে জিয়া উদ্যানে জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার কবর প্রাঙ্গণে। সেখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে সুরা ফাতেহা পাঠ করেন এবং মোনাজাত করেন। এ সময় বিএনপির সংসদ-সদস্য কামরুজ্জামান রতন ও রাষ্ট্রপতির সহকারী একান্ত সচিব ইউনুস আলী উপস্থিত ছিলেন। এ সময় কবর প্রাঙ্গণের চারপাশে নিরাপত্তা বেষ্টনির বাইরে দলের নেতাকর্মী-সমর্থকরা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান।
