প্রথম ধাপে বুড়িগঙ্গা তুরাগ ও ধলেশ্বরীতে অভিযান
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঢাকার চারপাশের পাঁচ নদী দূষণমুক্ত ও পানিপ্রবাহ বাড়াতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। স্বল্প মেয়াদে নদীতে বর্জ্য ফেলার উৎসমুখ বন্ধ করা হবে। প্রথমেই তুরাগ, বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরীতে অভিযান চালনো হবে। পরের ধাপে বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীতে। আর এসব অভিযান হবে সমন্বিত। এর আওতায় দূষণকারী কারখানা, ডকইয়ার্ড, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার তালিকা হালনাগাদ করে সেগুলোয় নিয়মিত অভিযান চালানো হবে। দায়ী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে আইনানুগ ব্যবস্থা।
লঞ্চসহ যেসব জলযান চলাচল করে, সেগুলোও এর আওতায় আনা হবে। নদীপথে নিয়মিত টহল দেওয়া হবে। এসব কাজ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে মনিটরিং করা হবে। এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় সেল গঠন করা হয়েছে। এই সেলের সমন্বয় করবে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। এসব কাজের ইন এইড টু সিভিল পাওয়ারের আওতায় নৌবাহিনীকে মাঠে নামানো হবে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানা যায়, ঢাকার চারপাশের নদী নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ পর্যন্ত কয়েক দফায় বৈঠক করেছেন। দিয়েছেন নানা নির্দেশনা। তিনি চারপাশের নদীর অবস্থা নিজ চোখে দেখতে যাওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন। এছাড়াও ঢাকার যানজট কমাতে ইনার সার্কুলার রিং রোডের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও সংস্থাগুলোর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা নড়েচড়ে বসেছেন। ওইসব সরকারি সংস্থাও বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিচ্ছে। এছাড়া ঢাকার চারপাশের নদীর অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর কার্যক্রম পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তার ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবরা পরিদর্শন করেছেন।
জানতে চাইলে নৌপরিবহণ সচিব জাকারিয়া যুগান্তরকে বলেন, নদীগুলোর দূষণ বন্ধ করতে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশনা দিয়েছেন। বুড়িগঙ্গা-তুরাগ থেকে কাজ শুরু হবে। পাশাপাশি ঢাকার চারপাশের নদীতে যাত্রীবাহী ও পর্যটকবাহী নৌযান চালানোর জন্য বলা হয়েছে। আমরা বেসরকারি নৌযান মালিকদের উৎসাহিত করছি। তারা রাজি না হলে আমরা সরকারি নৌযান দিয়ে যাত্রী পরিবহণ শুরু করব। তিনি বলেন, প্রতি ২০ মিনিট পর নিয়মিত ট্রিপ হলে যাত্রী আকর্ষণ তৈরি হবে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলোয় অংশ নেওয়া একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঢাকার চারপাশে বৃত্তাকার ১১০ কিলোমিটার নৌপথ রয়েছে। নদী রয়েছে পাঁচটি। এসব নদী গাজীপুর, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জকে যুক্ত করেছে। একটি নদীর দূষণ বা প্রবাহ সংকট দেখা দিলে তা অন্য নদীগুলোর পানি, নাব্য ও পরিবেশকে প্রভাবিত করে। এজন্য প্রথমে তুরাগ, বুড়িগঙ্গা ও পরে ধলেশ্বর নদীতে অভিযান চালানো হবে। তারা জানান, তুরাগ নদীতে তুলনামূলক কম দূষণ ও দখলদার রয়েছে। এ নদীতে অভিযান শুরু করলে এর প্রভাব অন্য এলাকাগুলোয়ও ছড়িয়ে পড়বে। এতে কাজ করা সহজ হবে বলে ওইসব বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। ইতোমধ্যে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। তাদেরও দূষণ বন্ধে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ইটিপি বসানোসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, নদীদূষণে ৫৫ শতাংশের জন্য দায়ী শিল্পবর্জ্য, রং ও ভারী ধাতু। জৈব বর্জ্য, রোগজীবাণু, এমোনিয়া ও নদীর তলদেশে জমে থাকা বিষাক্ত বর্জ্য থেকে দূষণ হয় আরও ২৫ শতাংশ। এ পর্যন্ত ৪২৪টি দূষণের উৎসমুখ চিহ্নিত করা হয়েছে। এ তালিকা হালনাগাদ করারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ওইসব বৈঠকে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা জানান, এসব উৎসমুখ বন্ধ করতে পারলে দূষণ ৮০ শতাংশ কমে আসবে। এ লক্ষ্যেই শুরুতেই নদীর দূষণ বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দূষণ বন্ধ না হলে ড্রেজিং করেও লাভ হবে না। দূষণ বন্ধের কার্যক্রম পরিচালনা ও মনিটরিং করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে একটি কেন্দ্রীয় সেল এবং বিভিন্ন সংস্থাকে যুক্ত করে তিনটি পৃথক সাব-কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কেন্দ্রীয় সেলের সমন্বয় করবে বাংলাদেশ নৌবাহিনী।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এসব নদীর সঙ্গে সংযুক্ত খাল ও ড্রেনের তালিকা করা হয়েছে। নদীদূষণের সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠান ঢাকা ওয়াসা, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনও যুক্ত। এছাড়া বেশ কয়েকটি পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও নদীদূষণ হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রশাসক ও জনপ্রতিনিদেরও এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা হচ্ছে। জানা যায়, সরকার মধ্য মেয়াদে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের খাল ও ড্রেনের বর্জ্য অপসারণ শুরু করবে। এসব খাল ও ড্রেনের প্রয়োজনীয় সংস্কার করে পানিপ্রবাহ বাড়াবে। এসব খাল ও ড্রেনের পানি যাতে পরিশোধিত আকারে নদীতে প্রবাহিত হয়, সেজন্য পরিকল্পনা নিয়েছে। আর দীর্ঘ মেয়াদে ঢাকার চারপাশের নদীতে জমে থাকা বর্জ্য অপসারণ ও খনন করতে চায় সরকার। এজন্য প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করতে বলা হয়েছে। চলমান প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
ঢাকার চারপাশের নদীতে যাত্রী ও পর্যটক পরিবহণ : জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ১ জুলাই সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বৃত্তাকার নৌপথে যাত্রী ও পর্যটক পরিবহণে নৌযান নামানোর সিদ্ধান্ত হয়। ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সোমবার নৌমন্ত্রণালয়ে বৈঠক করেন নৌসচিব জাকারিয়া। বৈঠকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ করপোরেশনকে ছয় মাসের মধ্যে ১০-১২ জন পরিবহণ করতে এমন ছোট আকারের ১২টি নৌযান বানানোর জন্য বলা হয়েছে। ওইসব নৌযান গাবতলী থেকে সদরঘাট হয়ে পোস্তগোলা পর্যন্ত প্রতি ২০-৩০ মিনিট পরপর ছেড়ে যাবে। তবে এসব নৌযান নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য সরকার থেকে বরাদ্দ চেয়েছেন বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তারা। তারা বলেছেন, বর্তমানে বিআইডব্লিউটিসি একটি লোকসানি প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আর ভর্তুকি দেওয়া সম্ভব হবে না। তবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি সংস্থার কর্মকর্তারা।
এদিকে ওই বৈঠকে এমকে শিপিং লাইন নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যাত্রী ও ক্রুজ জাহাজ নামানোর প্রস্তাব দিয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাছুম খান বৈঠকে তিন ধরনের নৌযান নামানোর প্রস্তাব দেন। তবে এসব নৌযানে যাত্রী ওঠানামা করার জন্য পৃথক টার্মিনালের ব্যবস্থা করার শর্ত দেন। টার্মিনাল অপারেট করবে ওই প্রতিষ্ঠান। তাদের অন্য শর্তগুলো হচ্ছে, যাত্রী প্রবেশে টার্মিনাল থেকে ফি আদায় করা যাবে না। টার্মিনালের জন্য জমি দিতে হবে। সেখানে নিজেদের অর্থায়নে ঘাট ও বিশ্রামাগার তৈরি করবে। জানতে চাইলে এমকে শিপিং লাইনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাছুম খান যুগান্তরকে বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাবনা দিয়েছি। এ বিষয়ে বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

