সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক
গুম প্রতিরোধ বিলের আলোচনাও বর্জন বিরোধী দলের
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল এবং মানবাধিকার কমিশন বিল পাশের প্রক্রিয়া বর্জন করেছে বিরোধী দল। জাতীয় সংসদে রোববার অনুষ্ঠিত আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে মানবাধিকার বিলসংক্রান্ত আলোচনা বর্জন করেন বিরোধী দলের দুই সদস্য। যদিও ওই বৈঠকে সম্পত্তি হস্তান্তর বিলের আলোচনায় অংশ নেন তারা। এদিন বিকালে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির আলোচনা থেকেও ওয়াকআউট করেন বিরোধী দলের সদস্যরা। তাদের অভিযোগ-বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংস্থা ও সুধীজনদের মতামত উপেক্ষা করে সরকার একতরফাভাবে এ দুটি বিল পাশ করতে যাচ্ছে।
জাতীয় সংসদে বৃহস্পতিবার বিল দুটি পেশ করা হয়। তখন সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল। সর্বশেষ আলোচনাও বর্জন করল। পরে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে স্পিকারের কাছে একটি চিঠি দেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় দলের মুখপাত্র মো. নাজিবুর রহমান বলেন, বিল দুটো পাশের প্রক্রিয়ার কোনো পর্যায়েই বিরোধী দল থাকবে না। বিল দুটো পাশ জাতির সঙ্গে সরকারের প্রতারণা। আমরা এর অংশ হব না।
নাজিবুর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মানবাধিকারসংক্রান্ত আইন সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আইনটি আরও শক্তিশালী করার কথা থাকলেও যে বিল সংসদে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক কনভেনশনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আগের আইন শক্তিশালী করার পরিবর্তে প্রস্তাবিত বিলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দুর্বল করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এমনকি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির স্বাধীনভাবে মতামত দেওয়ার সুযোগও সীমিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, বিলটি সংসদে তোলার আগে স্থায়ী কমিটির হাত-পা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, মাত্র ২ দিনের মধ্যে বিলের প্রতিবেদন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এতে কমিটির সদস্যদের স্বাধীনভাবে মতামত দেওয়ার সুযোগ থাকছে না। তিনি বলেন, সংসদীয় কমিটিকে রাবার স্ট্যাম্পের মতো করে ফেলা হয়েছে। আমরা থাকতে পারছি না, আমরা বৈঠক বর্জন করতে বাধ্য হয়েছি।
২০০৯ সালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন করা হয়। পরে অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন সংশোধন করে নতুনভাবে অধ্যাদেশ জারি করে। সেটি সংসদে রহিত করে ২০০৯ সালের আইন বহাল করা হয়। এখন নতুন করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০২৬ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী। দুই কর্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়। দুই দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার বাধ্যবাধকতাকে হাত-পা বেঁধে দেওয়ার মতো বলে মনে করছে বিরোধী দল। অপরদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের অধ্যাদেশটি সংসদে উত্থাপন না করায় সেটি অকার্যকর হয়ে যায়। সরকার নতুন আইন করতে যাচ্ছে। তবে গুমের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দিয়ে তদন্ত করা ও মানবাধিকার কমিশনকে এ তদন্ত করার এখতিয়ার না দেওয়াসহ কয়েকটি বিষয়ে বিরোধী দলের আপত্তি রয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরাও এর সমালোচনা করছেন।
এদিকে সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল ও ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলের ওপর বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বিলগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনা করে সংশোধিত আকারে সংসদে পাশের জন্য বৈঠকে সুপারিশ করা হয়।
কমিটির সভাপতি মুহাম্মদ নওশাদ জমিরের সভাপতিত্বে বৈঠকে অংশ নেন কমিটির সদস্য ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, এমরান আহমদ চৌধুরী, সাকিলা ফারজানা, মো. মনজুরুল ইসলাম, মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান এবং আল ফারুক আব্দুল লতীফ।
একইদিন বিকালে জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক হয়। বৈঠকে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ পরীক্ষাপূর্বক রিপোর্ট প্রদানসংক্রান্ত বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। আলোচনা শেষে বিলটি সংসদে প্রেরণের সিদ্ধান্ত হয়। তবে বিলসংক্রান্ত আলোচনা থেকে ওয়াকআউট করেন বিরোধী দলের দুজন সংসদ-সদস্য। কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে বৈঠকে অংশ নেন কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, হুইপ রকিবুল ইসলাম, হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু ও শিরীন সুলতানা। পরে সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈঠক থেকে কমিটির সদস্য মো. নূরুল ইসলাম এবং মো. আব্দুল বাতেন ওয়াকআউট করেন। এ বিষয়ে কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন বৈঠকে বলেন, ‘কমিটির সদস্য হিসাবে কোনো সংশোধনী বা মতামত থাকলে তা সভায় উপস্থাপন করা, পরামর্শ দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে বিরোধিতা করার সুযোগ রয়েছে। এটিই কমিটির সদস্যদের দায়িত্ব। তবে সভা থেকে ওয়াকআউট করা সংসদীয় রীতিনীতির মধ্যে পড়ে না।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে বলা হয়েছে যে, গত ৬ মাসে দেশে কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেনি। একই সময়ে মব তৈরির চেষ্টা চললেও কোনো রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটেনি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেনি বলেও সভায় জানানো হয়। মিরাজ শেখের অপহরণের দায় সরকারের ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও বৈঠকে আলোচনা হয়। এ ধরনের দোষারোপের রাজনীতি বা ‘ব্লেম গেম’ পরিহার করা উচিত বলে সভায় মত প্রকাশ করা হয়।
