১৭ বছরের ‘জঞ্জাল’ পাড়ি দিতে হিমশিম বিএনপি
তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিচ্ছেন তারেক রহমান। ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় -ফাইল ফটো
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ফ্যাসিবাদী আমলের জমে থাকা ‘জঞ্জাল’। ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠান, সংকটে থাকা অর্থনীতি, প্রশাসনের নানা স্তরে অনিয়ম আর জনজীবনের পাহাড়সম প্রত্যাশা। এর সঙ্গে গত ১৭ বছরের ক্ষত। দেড় বছরের রাজনৈতিক টানাপোড়েন। নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণের চাপ। সব মিলিয়ে ক্ষমতায় আসার ছয় মাসেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি ক্ষমতাসীন বিএনপি। পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় এলেও উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জঞ্জাল সরাতেই এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। একদিকে ঘোষিত ৩১ দফার ভিত্তিতে রাষ্ট্রসংস্কার ও পুনর্গঠনের কাজ, অন্যদিকে দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনে গতি ফেরানোর চাপ-প্রতিটি ক্ষেত্রেই সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে হচ্ছে বিএনপিকে।
অবশ্য রাজনীতিকরা বলছেন-গণ-অভ্যুত্থানের পরপর দেশে নির্বাচন হলে, তখন নির্বাচিত সরকারকে জঞ্জাল দূর করতে বেগ পেতে হতো না। কারণ হিসাবে তারা মনে করেন, গণ-অভ্যুত্থান পরপর সংকটগুলো অনেকাংশে দৃশ্যমান ছিল। ফলে ক্ষতগুলো শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া যেত। অন্তর্বর্তীকালীন একটা অস্থিরতা কাজ করেছে। যে কারণে সরকারের বিভিন্ন জায়গায় সংকটগুলো আরও বেশি প্রকট হয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ফের নতুন করে রাষ্ট্রসংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছে। মধ্যবর্তী দেড় বছর ও ১৭ বছরের ক্ষত পূরণে সরকারকে মাত্রাতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হচ্ছে।
সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য যুগান্তরকে বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছরের জঞ্জাল এত অল্প সময়ে দূর করা সম্ভব নয়। প্রশাসন, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি, প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জমে থাকা সংকট পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। বিতাড়িত সরকার দেশের প্রতিটি সেক্টর ভঙ্গুর অবস্থায় রেখে গেছে। রাষ্ট্রের ভেঙে পড়া কাঠামো মেরামতের চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিয়েছে বিএনপি। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে গত ছয় মাসে দৃশ্যমান প্রত্যাশিত উদ্যোগ ও অগ্রগতি হয়েছে।
তবে ১৭ বছরের জঞ্জাল দূর করতে সরকার হিমশিম খাচ্ছে-এমনটা মানতে নারাজ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। তিনি যুগান্তরকে বলেন, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন। তাই সরকারের হিমশিম খাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
রিজভী জানান, অতীত ফ্যাসিবাদী আমলের বিভিন্ন অপকর্ম, ব্যাংক লুটপাট, অর্থ পাচার ও অনাচারের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি ও আইনি পদক্ষেপ অব্যাহত রয়েছে। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে কেউ আর আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারবে না। কোনো ব্যক্তি যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, সে যে বেপরোয়া কিছু করতে পারে না এবং নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে মনে করতে পারে না-বর্তমান সরকারের এসব পদক্ষেপই তার সুস্পষ্ট প্রমাণ।
সরকারি দলের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র বলছে, ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল প্রশাসনকে কার্যকর করা। দীর্ঘদিনের দলীয়করণ, পদোন্নতি ও পদায়ন নিয়ে বিতর্ক, কর্মকর্তাদের মধ্যে আস্থার সংকট এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি, সব মিলিয়ে প্রশাসনকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাতে সময় লাগছে।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। প্রশাসনে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তবে কাঙ্ক্ষিত গতি এখনো পুরোপুরি ফেরেনি। বিশেষ করে মাঠ প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ তৈরি এবং সরকারি সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়াকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসাবে দেখা হচ্ছে।
বিএনপি ও সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, প্রশাসনকে জবাবদিহির মধ্যে এনে দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানো না গেলে অন্য কোনো সংস্কারই স্থায়ী ফল দেবে না। তাই প্রশাসনিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
দলের ভেতরে-বাইরে আলোচনা আছে, অর্থনীতির ক্ষেত্রেও এখনো পুরোপুরি স্বস্তি ফেরেনি। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণের পাহাড়, অর্থ পাচার এবং রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির প্রভাব কাটেনি। এর সঙ্গে রয়েছে মূল্যস্ফীতির চাপ।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখাই সরকারের অন্যতম বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও সব ক্ষেত্রে এর সুফল এখনো মানুষের কাছে পুরোপুরি পৌঁছেনি। কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়ানোও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
অনেকেই বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও সরকারের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখল এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ এখনো রয়েছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে থাকা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের বলয় ভাঙাও বড় চ্যালেঞ্জ।
বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিনের একটি ব্যবস্থাকে রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার কাজ চলছে।
অন্যদিকে সরকারের ওপর রয়েছে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপ। ক্ষমতায় আসার আগে দেওয়া নানা প্রতিশ্রুতির মধ্যে রাষ্ট্রসংস্কার, সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের বিষয় রয়েছে। জনগণের প্রত্যাশা দ্রুত বাস্তবায়নের দিকে। ফলে সময় যত গড়াচ্ছে, সরকারের ওপর চাপও তত বাড়ছে বলেও মনে করেন কেউ কেউ। এছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অস্থিরতা কাটানো সম্ভব হয়নি, যা জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে।
বিএনপির নেতারা অবশ্য বলছেন, সরকার মাত্র যাত্রা শুরু করেছে। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সংকটের বোঝা অনেক ভারী। সেই বোঝা নামিয়ে রাষ্ট্রকে নতুন পথে নেওয়াই এখন তাদের লক্ষ্য। তবে জনগণ অপেক্ষা করতে কতটা প্রস্তুত, সেটিই একটি বড় প্রশ্ন। সব মিলিয়ে ছয় মাসে সরকারের অর্জন যেমন আছে, তেমনি রয়েছে সীমাবদ্ধতাও। সামনে তাই শুধু জঞ্জাল পরিষ্কারের কাজ নয়; রাষ্ট্রকে কার্যকর ও জনবান্ধব করে তোলার কঠিন পরীক্ষাও।
অতীত আমলের জমে থাকা জঞ্জাল ও বিদ্যমান বিভিন্ন পরিস্থিতি নিয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক যুগান্তরকে বলেন, ৫ বছরের নির্বাচিত সরকার; অন্তত এক-দেড় বছর অতিবাহিত না হলে সরকারের সামগ্রিক কাজের চূড়ান্ত মূল্যায়ন সম্ভব নয়। তবে জঞ্জাল দূর করে দেশকে সঠিক পথে ফেরাতে সরকারের পক্ষ থেকে আন্তরিক উদ্যোগ ও চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন এখনো হয়নি। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও জবরদখলের মতো সমস্যাগুলো এখনো অব্যাহত আছে। শুধু পুরোনো অপরাধীদের জায়গায় নতুন চেহারার লোকজন এসে এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করছে। জনজীবনে এখনো স্বস্তি আসেনি; বেকারত্ব, জীবন-জীবিকার সংকট এবং বিনিয়োগে মন্দাভাব বজায় রয়েছে।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল যুগান্তরকে বলেন, আওয়ামী ফ্যাসিস্টরা হিমালয়সম সংকট রেখে গেছে। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সচিবালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো বিগত ফ্যাসিবাদী আমলের সহযোগীরা গোপনে রয়ে গেছে। একটি কার্যকর টিম গঠন করে এই প্রশাসনিক জঞ্জাল পরিষ্কার করতে কিছুটা সময় লাগছে। তিনি বলেন, সরকার সেই আবর্জনা পরিষ্কার করেই রাষ্ট্রকে কার্যকর করার চেষ্টা করছে। তবে দীর্ঘদিনের ক্ষত সারিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাতে সময় প্রয়োজন। সরকার অতীতের জঞ্জাল সরিয়ে রাষ্ট্রকে খুব দ্রুতই ট্র্যাকে ফেরাবে বলেও প্রত্যাশা আলালের।

