কণ্টকাকীর্ণ পথে আশার আলো
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের প্রথম ৬ মাস পূর্ণ হলো আজ। এই সময়ে নির্বাচনি প্রচারণার সুনির্দিষ্ট আশ্বাস ও ‘রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কার’ কতটা বাস্তবায়ন হলো তা নিয়ে মানুষের কৌতূহল রয়েছে। পাশাপাশি আর কতটা বাকি রয়েছে সেটি জানার বিষয়ে আগ্রহ রয়েছে দেশের জনগণের। এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দপ্তরের পারফরম্যান্সের রিপোর্ট পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে সরকার সংশ্লিষ্টরা গত ৬ মাসের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডকে সন্তোষজনক হিসাবে দেখছেন। তারা বলছেন, দেশের ভঙ্গুর অবকাঠামোর ওপর দায়িত্ব নিয়ে ‘নতুন বাংলাদেশ’ নির্মাণে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে।
সরকারের ১৮০ দিনের পথচলায় সামনে এসেছে নানা উদ্যোগ ও কর্মসূচির চিত্র। সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, প্রবাসীকল্যাণ, পরিবেশ, ক্রীড়া, নাগরিক সেবা এবং বিশ্বপরিসরে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করতে নেওয়া হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। একই সঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলার মতো বড় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাস্তব অগ্রগতি নিয়েও চলছে হিসাব-নিকাশ।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দাবি, সরকার প্রধান তারেক রহমানের গতিশীল নেতৃত্বে ন্যায়পরায়ণতা, নিখাদ জবাবদিহি, মানবিক মূল্যবোধ ও দূরদর্শী টেকসই উন্নয়নকে হাতিয়ার করে এক নতুন বাংলাদেশের ভিত রচিত হচ্ছে। নির্বাচনের আগে বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফার ভিত্তিতে রাষ্ট্রকাঠামোকে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনি ওয়াদা বাস্তবায়ন করার জন্য ৬ মাসের প্রতিটি কার্যদিবসকে সরকার কাজে লাগিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য রুহুল কবির রিজভীর মতে, ‘নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছেন এবং নিজেই তা তদারকি করছেন। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও হেলথ কার্ডসহ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, খাল খনন, বৃক্ষরোপণ এবং বন্ধ কলকারখানা চালুর উদ্যোগ দ্রুত এগোচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক কিছু বাস্তবায়নও হয়েছে।
যুগান্তরকে তিনি বলেন, গত ৬ মাসে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়েছে এবং রাজনৈতিক কারণে সাংবাদিক হয়রানির কোনো নজির নেই। বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করছে। একই সঙ্গে স্থানীয় নির্বাচনেও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রিজভী আহমেদের দাবি, এসব পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে সরকারের সামাজিক উন্নয়ন, আইনের শাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার স্পষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার শতভাগ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে। প্রথম ৬ মাসে আশানুরূপ সাফল্য অর্জিত হয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এবং তার কার্যালয়ের মুখপাত্র আবু আব্দুল্লাহ এম ছালেহ (ছালেহ শিবলী) যুগান্তরকে বলেন, সরকারের প্রথম ৬ মাসের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার দিন থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ ও বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফার ভিত্তিতে কাজ করেছেন। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ধরে ধরে বাস্তবায়ন করছেন।
সরকার সংশ্লিষ্টদের দাবি, নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই কাজ শুরু হয়েছে। শপথ নেওয়ার প্রথম ২০ দিনের মধ্যেই মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি চালু করা হয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ৬ মাসে কোনো সরকারের পুরো ইশতেহার বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এই সময়ের মূল্যায়নে দেখতে হবে-কোন প্রতিশ্রুতিতে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে, কোনটি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে এবং কোনগুলো এখনো পরিকল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ তা বিশ্লেষণ করে।
সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য যুগান্তরকে বলেন, সরকারের প্রথম ৬ মাসের সব খতিয়ান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। তিনি এসব পর্যালোচনা করছেন। একই সঙ্গে কোনো মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর পারফরম্যান্সের রিপোর্ট ‘এক্স-রে’ আকারে দেখছেন সরকারপ্রধান। ৬ মাসের পারফরম্যান্স রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে আগামী দিনের যাত্রা আরও বেশি বেগবান হবে বলেও মনে করেন ওই মন্ত্রী।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত বলছে, সরকারের প্রথম ৬ মাসের অন্যতম বড় ফোকাস ছিল সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণ। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ‘ফ্যামিলি কার্ড’। পরীক্ষামূলকভাবে এর আওতায় এসেছে ৭১ হাজারের বেশি পরিবার। পরিবারের নারী প্রধানের অ্যাকাউন্টে প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা দেওয়া হচ্ছে। কিশোরগঞ্জ থেকে আজ (১৬ আগস্ট) আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ শুরু হবে।
এদিকে কৃষকদের জন্য চালু করা হয়েছে ‘কৃষক কার্ড’। সরকারের দাবি, প্রথম ৬ মাসে ২০ হাজারের বেশি কৃষক পরিবার এর আওতায় এসেছে। কৃষি উপকরণ কেনার জন্য কার্ডধারীরা আড়াই হাজার টাকা করে পাচ্ছেন। এ ছাড়া নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ কৃষক পরিবার সরাসরি উপকৃত হবে বলে জানিয়েছে সরকার।
এছাড়া পরিবেশ ও কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেকটি বড় প্রতিশ্রুতি ছিল খাল পুনঃখনন। ৫ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্য নিয়েছে বিএনপি। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, প্রথম ৬ মাসেই ৬২টি জেলায় প্রায় এক হাজার কিলোমিটার খাল খনন সম্পন্ন হয়েছে।
এদিকে, ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের প্রতিশ্রুতিও ছিল নির্বাচনি ইশতেহারে। প্রথম ১৮০ দিনে আড়াই কোটির বেশি গাছ লাগানোর দাবি করেছে বিএনপি সরকার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইতোমধ্যেই বাস্তবায়নের পথে।
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে শিক্ষায় জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলা হলেও প্রথম অর্থবছরে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২ শতাংশ। পাশাপাশি চালু করা হয়েছে স্মার্ট ক্লাসরুম ও নতুন পাঠ্যক্রম। স্বাস্থ্য খাতে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষাসহ একাধিক সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় প্রধানদের সম্মানি দেওয়ার প্রতিশ্রুতির অংশ হিসাবে পাইলট প্রকল্পে সাড়ে চার হাজার ইমাম, সাড়ে চার হাজার মুয়াজ্জিন, চার হাজার খাদেম ও ৬০০ পুরোহিতসহ প্রায় ১৪ হাজার ব্যক্তি নিয়মিত ভাতা পাচ্ছেন। হজযাত্রা সহজ করতে চালু করা হয়েছে মোবাইল অ্যাপ এবং ঘোষণা করা হয়েছে আন্তর্জাতিক হজ প্যাকেজ। ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর আওতায় সারা দেশে খেলাধুলার আয়োজন করা হয়েছে। ওয়ার্ডভিত্তিক খেলার মাঠ তৈরির পাশাপাশি তা দখলমুক্ত করার কাজ শুরু হয়েছে। সিটি করপোরেশন এলাকায় ১০২টি খেলার মাঠের তালিকা তৈরি করা হয়েছে।
নারীদের ক্ষমতায়নের পাশাপাশি প্রবাসীদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর কাজ এগোচ্ছে, যার মাধ্যমে তারা ১০ ধরনের বিশেষ সুবিধা পাবেন। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর উদ্যোগের পাশাপাশি ওয়ান-স্টপ সাপোর্ট সেন্টার চালু করা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হতাহতদের জন্য আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শহীদ পরিবারকে সঞ্চয়পত্র ও মাসিক ভাতা দেওয়ার পাশাপাশি ক্যাটাগরিভিত্তিক ভাতা, পরিবারের সদস্যদের চাকরি ও আইনি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি উদ্বোধন করা হয়েছে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’।
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলে প্রায় এক লাখ এবং মীরসরাই শিল্পাঞ্চলে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের কাজ এগিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার।
পরীক্ষামূলকভাবে চারটি ট্রেনে স্টারলিংকভিত্তিক ফ্রি ওয়াইফাই সেবা চালু হয়েছে। বিমানবন্দরে হয়রানি কমাতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুনরায় চালু হয়েছে ঢাকা-নারিতা রুট। এছাড়া বগুড়ায় আন্তর্জাতিকমানের বিমানবন্দর নির্মাণ এবং ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে ১৩টি আন্তর্জাতিক ‘অ্যাসেট রিকভারি’ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ইস্যুতে সরকারের মূল্যায়ন বলছে, অস্থিতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনসম্মত ও দৃঢ় আইন প্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধ কমানো এবং জননিরাপত্তা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিশু রামিসা হত্যা মামলার রায় ১৯ দিনে এবং মেহেরপুরের শিশু ধর্ষণ মামলার রায় ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় ডেথ রেফারেন্স ও আপিল অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির পর মাত্র এক মাসে ১০টি রায় ঘোষণা করা হয়েছে। তনু হত্যা এবং শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে ফেরত আনার প্রক্রিয়া চলছে।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির ভিত্তিতে সমতা ও পারস্পরিক স্বার্থের ওপর নির্ভর করে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করা হচ্ছে। গত ২৪ থেকে ২৬ জুন ২০২৬ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারি চীন সফর বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় উন্নীত করেছে। এই সফরে বাণিজ্য, অবকাঠামো ও কৌশলগত সহযোগিতা বৃদ্ধিতে ২০টিরও বেশি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।
সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের খতিয়ান বলছে, প্রতিশ্রুতির বেশ কিছু কর্মসূচি ইতোমধ্যে মাঠে এসেছে। আবার কিছু রয়েছে পরীক্ষামূলক বা প্রাথমিক পর্যায়ে। তবে মূল চ্যালেঞ্জ হলো-ঘোষণা ও বাস্তবায়নের ব্যবধান কমানো। ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ডের সুফল সঠিকভাবে পৌঁছানো, খাল খনন ও বৃক্ষরোপণের স্থায়িত্ব এবং ঘোষিত কর্মসংস্থান বাস্তবে রূপ দেওয়াই হবে সরকারের পারফরম্যান্সের মূল মাপকাঠি।

